মারাত্মক হুমকির মুখে বাংলাদেশ: জাতিসংঘ, দুর্যোগ ঝুঁকিতে প্রায় ২ কোটি শিশু
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১২ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:০৫
জলবায়ুসংক্রান্ত ঝুঁকির কবলে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব তথা বিশ্ববাসীও। তবে তুলনামূলক বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ুর কারণে মারাত্মক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ঝুঁকিতে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি শিশু। ঝুঁকি মোকাবিলায় সোচ্চার হতে হবে বিশ্ববাসীকে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ ঝুঁকির সম্মুখীন। এই প্রতিবেদনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে বাস করা শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র জ্য জ্যাক সিমন বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙনের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু বড় শহরগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে তারা সেখানে সব ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।’ ওই প্রতিবেদনে দুর্যোগ ঝুঁকির কারণ স্পষ্টভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক পারিপার্শ্বিকতার সম্পর্ক রয়েছে ওতপ্রোতভাবেই। অনেকটা রিসাইকেলের মতো; দৃশ্যমান নয়, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণই হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, যা মূলত মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল। আর সেই কর্মকাণ্ডের নজির হচ্ছে, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করা; বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো অতিমাত্রায় সিএফসি গ্যাস, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নির্গমন করছে যুগ যুগ ধরেই। এসব বিষাক্ত গ্যাস বিভিন্নভাবেই নির্গমন করছে তারা। দেখা গেছে, তার মধ্যে শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ ও খনিজ জ্বালানির ব্যবহারই প্রধান। এ ছাড়া নির্বিচারে বন উজাড় ও নদীশাসন জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটাতে সহায়তা করছে। বন উজাড় ও নদীশাসনের জন্য শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলো দায়ী নয়, দায়ী দরিদ্র কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোও। তবে বেশির ভাগই দায়ী হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিমাত্রার কার্বন নিঃসরণ; যাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজোন গ্যাসের স্তর ক্ষয়ে যাচ্ছেও দ্রুত। উল্লেখ্য, ওজোনস্তর হচ্ছে পৃথিবীর জন্য একধরনের ফিল্টার। এই ফিল্টারে ছেঁকে সূর্যের প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে বিশুদ্ধ করে পৃথিবীর জন্য ১০ থেকে ৪২ (কম-বেশি হতে পারে) ডিগ্রি সেলসিয়াস পাঠায়। এটি ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর জন্য সহনীয় তাপমাত্রা পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে ওজোনস্তর। এর সঙ্গে অতিবেগুনি তেজস্ক্রিয় রশ্মি চলে আসছে ভূপৃষ্ঠে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রোগব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়ে টিকতে না পেরে অবলুপ্তি হচ্ছে বিশেষ কিছু প্রাণিকুল।
ভৌগোলিক অবস্থানই ঝুঁকিতে
ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বের নিচু এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; যা তাৎক্ষণিক মালুম করা যাচ্ছে না। তবে ক্ষতির পরিমাণ ২০৫০ সাল নাগাদ দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা আরও জানিয়েছেন, ওই সময়ের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে প্রায় এক মিটারের মতো, তাতে বাংলাদেশ চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে না পারলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে এবং বরফ গলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বৃদ্ধি পাবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
আইপিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে। দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে গৃহহীন হবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। এসবের ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদন, সুপেয় পানির সংকট দেখা দিবে, বাড়বে নিত্য নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অসুখ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে ঘরহারা মানুষের সংখ্যা। ফলাফল হিসেবে ইতোমধ্যে শহরাঞ্চলে বস্তিবাসীর সংখ্যাও বেড়েছে। বেড়েছে বজ্রপাতের পরিমাণও।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বদিচ্ছা না থাকায় জলবায়ু বিপর্যয় ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন নিঃসরণের হার না কমে বরং বাড়ছে। ২০১৮ সালে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হার ২ শতাংশ বেড়ে তিন হাজার ৭০০ কোটি টনের রেকর্ড ছুঁয়েছে। আবার শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী যুগে উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারের কারণে গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে আটকা পড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতার মাত্রাকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
যেসব জেলায় ঝুঁকি বেশি
জাতিসংঘের ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বিশটি জেলার শিশুরা সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সামুদ্রিক ঝড়, আকস্মিক বন্যা, খরার মতো দুর্যোগের শিকার হতে পারে এসব জেলা। এর মধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বেশি। ঝুঁকিতে থাকা ২০টি জেলা হলো- কক্সবাজার, রাজশাহী, হবিগঞ্জ, নোয়াখালী, নেত্রকোনা, বাগেরহাট, যশোর, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদুপর, খুলনা, সাতক্ষীরা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও সুনামগঞ্জ। এসব জেলায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৮২৯ শিশু এ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবে। এ ছাড়া ৫ বছরের নিচে ঝুঁকিতে আছে ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬৭ শিশু। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এক কোটি ২০ লক্ষ শিশু। যাদের বসবাস বাংলাদেশে নদী উপকূলে। তাদের ক্ষেত্রে নদী ভাঙন একটি নিয়মিত ব্যাপার। আর নিয়মিত সাইক্লোনের ঝুঁকিতে রয়েছে ৪৫ লাখের মতো শিশু, যারা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে। তাদের মধ্যে রয়েছে বহু রোহিঙ্গা শিশু। যারা খুব দুর্বল আবাসন ব্যবস্থায় বসবাস করছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উপকূলীয় অঞ্চলের জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, বন্যা এবং নদী ভাঙনের কারণে অনেক মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। মোট শিশুদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের কারণে বিপদাপন্ন অবস্থায় আছে বলে জানাচ্ছেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের মুখপাত্র জ্য জ্যাক সিমন৷ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৪৫ লাখ শিশু ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে৷ আর বাঁশ ও প্লাস্টিকের ভঙ্গুর আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শিশু৷ অন্যদিকে ৩০ লাখ শিশু এমন অবস্থায় বসবাস করছে, যেখানে প্রতিনিয়ত খরার মুখোমুখি হতে হয়।

এ বিষয়ে বন্য প্রাণীবিষয়ক কলামিস্ট আলম শাইন বলেছেন, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের গবেষণার ফলে বিশ্ববাসী সচেতন হওয়ার যথেষ্ট সুযোগও পাচ্ছে। যদি সেই সুযোগ কাজে লাগানো না যায়, তাহলে পৃথিবীতে বাস করা আমাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং বেঁচে থাকতে হলে আমাদের পরিবেশ বা জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্যগুলো উপলব্ধি করতে হবে। খনিজ জ্বালানির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে হবে; বিশেষ করে সৌরশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। প্রচুর বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। ওজোন স্তরের নিচে প্রচুর কার্বন জমেছে, সেগুলোকে নিঃশেষ করতে হলে গাছ লাগানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। একমাত্র গাছই পারে এই বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে নিতে। সুতরাং সমগ্র বিশ্বের মানুষকে সচেতন হতে হবে এখনই। একযোগে গাছ লাগাতে হবে বিশ্ববাসীকে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশটা আমার নয়; এই চিন্তা পরিহার করতে হবে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত দেশগুলোকে। বিষয়টি মাথায় নিয়ে সবাইকে পরিবেশ আন্দোলনে যোগ দিতে হবে। সোচ্চার হতে হবে বিশ্ববাসীকে; তবেই যদি নিস্তার মেলে।

যদি এমন হতো যে এ বছরই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, সামনের বছরগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে; তাহলেও একটা ভরসা ছিল। কিন্তু সে ধরনের আশায় গুড়েবালি। কারণ কার্বন নিঃসরণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলছে। তাতে মেরু অঞ্চলের বরফের চাঁই গলছে দ্রুতগতিতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে হচ্ছে, শুধু যে বরফগলা পানিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা কিন্তু নয়; বিজ্ঞানের সূত্র বলছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির আয়তনও বৃদ্ধি পায়। যেমন ফুটন্ত পানির উচ্চতা স্বাভাবিক পানির চেয়ে খানিকটা বেশি হয়। তদ্রূপ সমুদ্রের পানিও উষ্ণতার কারণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। সুতরাং আমরা বলতে পারি বরফগলা পানি এবং উষ্ণ পানির প্রবাহে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়তই। ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চলগুলো।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে তার একটি বক্তব্যও স্থান পেয়েছেল। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবেশগত ঝুঁকিকে আরো খারাপ করছে জলবায়ু পরিবর্তন। অভিভাবকরা তাদের শিশুদেরকে ঠিকমতো বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা দিতে পারছেন না। জলবায়ু পরিবর্তন শিশুর বেঁচে থাকা ও উন্নতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের উদ্যোগকেও বাধাগ্রস্ত করছে।”
বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং অ্যাকশন প্ল্যানের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করেছে। ওই পরিকল্পনায় দরিদ্রতম এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকাদের চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষেত্রগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিশুপুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশনের মত বিষয়গুলো নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন৷
ইউডি/অনিক

