দেশি-বিদেশি পাখির মেলা বসে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কাবিলে। সেই দৃশ্য উপভোগ করতে চাইলে যেতে হবে শীত থাকতে থাকতেই।

বাইক্কাবিল ঘুরে এসে সেই অভিজ্ঞতার কথাই জানাচ্ছেন লেখক।

বাস থেকে নেমে বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। বেকায়দা যাকে বলে, ঠিক তাই। রাত তিনটায় শ্রীমঙ্গল চৌমনায় নামিয়ে দিল বাস শ্যামলি।

বাস থেকে নামতেই হু-হু হাওয়ার ঝাঁপটা গায়ে। আর চোখ জুড়ে ছড়ানো অন্ধকার, শীতও বেশ। এমন শীত মনে হচ্ছে হাড়ে গিয়ে লাগছে। যখন ভয় ভয় শুরু হয়, তখনি আলোর ঝলকানি।

একটি মিষ্টির দোকান আর অনেকগুলো সিএনজি অটোরিকশা তারপাশে দাঁড়িয়ে। মিষ্টির দোকানে ঢুকে দেখি এত রাতেও তারা পরোটা ভাজছে। সঙ্গে তাদের চায়ের আইটেম চালু।

একটা পরোটার সঙ্গে এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে এক সিএনজি অটোরিকশা চালকের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেই।

রাধানগর বিশ মিনিটের রাস্তা, ভাড়া ২শ’ টাকা। একবার মনে হল সাজুকে ফোন দেই। পরক্ষণে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে কথা বলি মিষ্টির দোকান মালিকের সঙ্গে।

গভীর রাত হলেও ভয়ের কিছু নেই, অভয় দেন দোকান মালিক। চা পরোটা খেয়ে সেই অভয়ে আমিও চড়ে বসি সিএনজি চালিত অটোরিকশায়। তারপর ঠকঠকে ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে রওনা হই রাধানগরের কাছে সাজু রহমানের হিমাচল রিসোর্টে।

২০ মিনিট পর সিএনজি চালিত অটোরিকশা যেখানে থামল সেটাই হিমাচল রিসোর্ট। রিসোর্টের ম্যানেজার সোহেল, সে রাতে রুম খুলে দিয়ে নিজে ঘুমাতে গেল আমাকে শুভসকাল বলে।

ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। নাস্তা খেলাম কেয়ারটেকার কাম বাবুর্চি রিনাদির হাতের রান্না করা খিচুড়ি দিয়ে। তারপর বের হলাম চা ও রাবারবাগান-সহ শ্রীমঙ্গল শহর দেখতে।

দুপুরের খাবার পানশিতে খেলাম। সঙ্গে এখানকার স্পেশাল চা। মনিপুরি পাড়া হয়ে যখন হিমাচলে ফিরি তখন রাত নয়টা। সেই রাতে সোহেলের আতিথিয়তায় রাতের খাবার সেরে পানশি রেস্টুরেন্টে পরিচয় হওয়া সিএনজি চালক সুকুমারকে বাইক্কাবিল নিয়ে যাওয়ার জন্য সকাল ৭টায় হিমাচলে আসতে বলে ঘুমাতে যাই।

ঘুম ভাঙে সুকুমারের মোবাইল ফোনে। আমরা যখন পথে নামি তখন সকাল আটটা। সেদিন নাস্তা করি পানশি রেস্টুরেন্টে। তারপর হাইওয়ে ধরে ছুটে চলা। 

আমাদের বাহন শহরের পিচ পথ ধরে এগিয়ে চলল। ঘুমে ঢুলো ঢুলো দুই চোখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাতসকালে ভেঙে যাওয়া ঘুম গ্রাস করলো চোখ জোড়াকে। ঘুম জড়তা নিয়ে একসময় অটোরিকশার ঝাঁকুনিতে সজাগ হলাম।

এরইমধ্যে অটোরিকশা পিচের পথ ছেড়ে মেঠোপথ ধরে চলা শুরু করেছে।

বাইরে তাকাতেই চোখ থেকে ঘুম পালালো। রাস্তার দুপাশেই অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। ভাবলাম শিল্পীর চেয়েও অসাধারণ প্রকৃতির নিজ হাতে তৈরি শিল্পকর্ম। কৃষক ক্ষেতে বীজ রোপনে ব্যস্ত। রাখাল ছেলে গরুর পাল নিয়ে মাঠে চলেছে। দুজন মহিলাকেও দেখলাম মাঠের দিকে যেতে। এমন দৃশ্য আমার সোনার বাংলার যেখানে যাই সেখানেই খুঁজে পাই।

গরুর পাল একটু পরপরই পথ আগলে দাঁড়াচ্ছিল। বিষয়টিতে বিরুক্তির চেয়ে মুগ্ধতাই বেশি ছিল। ক্যামেরা হাতে নেমে পড়ছিলাম বার বার। তারপর ফটাফট ছবি তোলা।

এভাবেই এক সময় চলে আসি বাইক্কাবিলে। বিলে ঢোকার আগে টিকিট কাটতে হল। তারপর রং চায়ে চুমুক মেরে হেঁটে চলি করচ বনের ভেতর।

বছরের এ সময় কেমন রুক্ষ্ম প্রকৃতি। গাছগুলো সব ডালপালা ছড়ানো হলেও পাতা শূন্য। তবে এমন পাতার দৈন্যতায়ও বেশ লাগছিল। বরষায় এ জায়গার একটা অপূর্ব আকর্ষণ আছে।

এক বরষায় আমার হাইল হাওর ও এই বাইক্কাবিলে আসার অভিজ্ঞতা আছে। সে সময়ের প্রকৃতি কেমন ছিল ভাবতে ভাবতে বাইক্কাবিলের ওয়াচটাওয়ারের কাছে চলে আসি। তারপর ওয়াচটাওয়ারের একেবারে ওপরে উঠে দুচোখ ভাসিয়ে দিলাম বাইক্কাবিলের বিশাল জলাশয়ে।

বিলের পানি বর্ষাকালের মতো টইটম্বুর না হলেও বাইক্কাবিল বরাবরের মতো মূগ্ধ করে। ঘাটে দুটি নৌকা বাঁধা থাকলেও পানি কম ও পাখির বিরক্তির কারণ হবে ভেবে ওয়াচটাওয়ারেই রয়ে গেলাম।

বায়নোকুলারে পাখি দেখে প্রায় আধা ঘণ্টা কাটিয়ে নিচে নেমে বিলের পাশ ধরে হাঁটা শুরু করলাম।

আমাদের ডানে-বামে, সামনে-পেছনে, উপরে-নিচে পাখি আর পাখি। নিউ পিপি, দল পিপি, ধুপনি বক, ভূতিহাস, ঈগল, ঠেঙ্গি, আর রাজসরালিসহ কত্ত কি! আমরা রোমাঞ্চিত; সে অভূতপূর্ব দৃশ্যে।

বাইক্কাবিল ইতিবৃত্ত

শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বদিকে ২০ মাইল দূরত্বে হাইল হাওড়ের ১০০ হেক্টর জলাশয়ের নাম বাইক্কাবিল। স্থানীয় বড় গাঙ্গিনা জেলে সম্প্রদায় এই বিলের তত্বাবধানে রয়েছে। ২০০৩ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় জলাশয়টিকে একটি স্থায়ী অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে বিলটি মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত।

পাবদা, মেনি, আইড়, রুই, কই, বোয়াল-সহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের রাজত্ব বাইক্কাবিলে। এছাড়া বিশেষ যে কারণে বাইক্কাবিল বিখ্যাত তা হচ্ছে এখানকার পাখি।

ধলাবালি হাঁস এই বিলের স্থায়ী বাসিন্দা। সারা বছরই পাখিপ্রেমিকরা এখানে এলে এই বুনো হাসটির দেখা পাবেন। এখানে প্রায় ৪০ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেজন্যেই বাইক্কাবিল দেশ-বিদেশের পাখি-বিশারদদের কাছে তীর্থস্থান।

তাদের সুবিধার জন্যেই ইউএসএআইডি’য়ের সহায়তায় সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে বাইক্কাবিল নিয়ে একটি বই বের করেছে। এতেই পাওয়া যাবে বাইক্কাবিলের যাবতীয় তথ্য।

বাইক্কাবিল বেড়াবার খুঁটিনাটি

ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে যেতে হবে চায়ের শহর শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল নেমে সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিংবা মাইক্রোতে চেপে বাইক্কাবিল। শুধু বাইক্কাবিল দেখলে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে পারবে। তবে হাতে সময় নিয়ে যাওয়াই ভালো। তাহলে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ পুরো শ্রীমঙ্গল ঘুরে আসা যাবে।

এখানে চা বাগান অসাধারণ। কাছেই ফিনলের চা বাগানে ঘুরে আসতে পারবেন। আবার এক ঘণ্টার দূরত্বে সমশের নগর গিয়ে ডানকান চা বাগানেও ঘুরে আসা যায়। ডানকানদের গলফ ফিল্ড অসাধারণ।

শ্রীমঙ্গল থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা আছে। আছে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল। আবার শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে কমলগঞ্জ টি-রিসোর্ট কিংবা রাধানগরের কাছে রয়েছে বিলাসবহুল গ্রান্ড সুলতান ও হিমাচল রিসোর্ট-সহ চাহিদা মতো সব ধরনের রিসোর্ট।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading