জেলহত্যা দিবসের স্মরণ সভায় প্রধানমন্ত্রী : বাংলার মাটিতে খুনিদের ঠাঁই নেই
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৪ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:০৮
উত্তরদক্ষিণ: জাতির পিতা এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় স্বাধীনতা বিরোধীদের অভিযুক্ত করে বলেছেন, বাংলার মাটিতে রাজাকার, খুনি এবং তাদের দোসরদের কোনও ঠাঁই হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজাকার, খুনি, আলবদর, আল শামসসহ ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের খুনিদের যারা দোসর, খুনিদের মদদদাতা তাদের কারো স্থান বাংলার মাটিতে ভবিষ্যতেও কোনদিন হবে না, ইনশাল্লাহ।’ গতকাল রবিবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় সভাপতির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে, এই দেশ যেন আবারো ও খুনিদের রাজত্ব না হয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারা যেন অব্যাহত থাকে। গণতান্ত্রিক ধারা যেন অব্যাহত থাকে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ থাকাকালীন তার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন তারই ঘনিষ্ঠ সহচর এবং জাতীয় চারনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান।

১৯৭৫ এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতের আঁঁধারে বঙ্গবন্ধুর খুনিরাই তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তখন অনেকে ভেবেছে পরিবারকে নিঃশেষ করার জন্যই এ হত্যাকাণ্ড। কিন্তু ৩ নভেম্বর যখন জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করা হলো তখন বাংলার মানুষ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিল এটা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের কাজ। কারণ তারা একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপকার ও ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আজকে বাংলাদেশ সমগ্রবিশ্বে উন্নয়নের একটা বিস্ময়। সেই সম্মান এবং মর্যাদাটা বাংলাদেশ আজকে পেয়েছে।’ এই সম্মান ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়ায় তার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে আমরা একদিন গড়ে তুলবো, ইনশাল্লাহ।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে: চলমান সন্ত্রাস এবং দুর্নীতি ও মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় পূণর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অভিযান সেটা অব্যাহত থাকবে।’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্মরণ সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য প্রদান করেন এবং স্মরণ সভাটি পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপপ্রচার সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম। স্মরণ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এবং অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানকও বক্তৃতা করেন। এছাড়াও স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন- বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক, লেখক ও সাংবাদিক আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আনোয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সভাপতি অ্যাডভোকেট রহমত উল্লাহ এমপি এবং দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদ এবং দেশ মাতৃকার সকল গণআন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
জাতীয় ৪ নেতার হত্যার ষড়যন্ত্রে ওতপ্রতভাবে ‘জিয়া জড়িত ছিল’
উত্তরদক্ষিণ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্ত্র নিয়ে ঢোকা যায় না। কিন্তু, তারা অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিল। গণভবন থেকে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই যেন ঢুকতে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, জিয়া (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান) এই ষড়যন্ত্রের সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িত ছিল বলেই মোস্তাক যখন রাষ্ট্রপতি হলো, নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়েই জিয়াউর রহমানকে বানালো সেনাপ্রধান। কাজেই মোস্তাকের পতনের সাথে সাথে জিয়ার হাতে সমস্ত ক্ষমতা চলে আসলো। গতকাল রবিবার জেলহত্যা দিবসের স্মরণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতা হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করা, খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করাসহ বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জিয়ার কারফিউ দিয়ে দেশ শাসনের নামে চলা দুঃশাসনের বিভিন্ন ঘটনাবলীও এ সময় তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ সারাজীবন বঞ্চিত থাকবে, ক্ষুধার্ত থাকবে, অবহেলিত থাকবে, সেটাই চেয়েছিল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী এসময় ক্ষোভের সঙ্গে বিএনপি’র রাজনীতি নেতাদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তুলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, যারা বিএনপি করেন তাদের কোনও মেরুদণ্ড আছে কিনা- সেটাই আমার সন্দেহ। তারা শুধু মায়াকান্না কাঁদে।’ বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘একটা দল যার চেয়ারপার্সন (খালেদা জিয়া) এতিমের অর্থ আত্মসাত্ করে জেলে আবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যাকে করলো (তারেক রহমান), সে আরেক সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং পলাতক।’
মোশতাকের নির্দেশে হত্যাকাণ্ড
উত্তরদক্ষিণ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্ত্র নিয়ে ঢোকা যায় না। কিন্তু, তারা অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিল। বঙ্গভবন থেকে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই যেন ঢুকতে দেওয়া হয়।’ জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গতকাল রবিবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এই সভার আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনুমতি ছাড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করা যায় না। তাই বাধা দেওয়া হয় সেনাদের। তখন বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন যায়, খুনি মোশতাক (তত্কালীন রাষ্ট্রপতি) টেলিফোনে নির্দেশ দেয়। এরা যখন অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে যায়, তখনও বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন বঙ্গভবন থেকে বলা হয়েছিল, আলোচনা করতে যাচ্ছে। যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই ঢুকতে দেওয়া হোক।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মোশতাকের পতন যখনই অনিবার্য হয়ে পড়লো, সাথে-সাথে ওই খুনিদেরকে একটি প্লেনে করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। প্রথমে তারা তাদেরকে ব্যাংককে নিয়ে যায়।
সেখানে বসে তাদেরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তাদের ভিসার ব্যবস্থা করে কোন দেশে যাবে সেটাও ঠিক করে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেটাও কিন্তু ইতিহাসে আছে।’ এর আগে রোবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতের আঁঁধারে বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র নির্মমভাবে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে হত্যা করে। যারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করে জাতির জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন।
পলাতক খুনিদের খোঁজ রাখছে সরকার
উত্তরদক্ষিণ : জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকারে এসে যুদ্ধাপরাধী, জেলহত্যার বিচারের রায় কার্যকর করেছে আওয়ামী লীগ। তবে জেলহত্যায় এখনও যে সব খুনি বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে আছে, তাদেরও খোঁজখবর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রোববার (৩ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে জেলহত্যা দিবসের আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা বারবার ক্ষমতায় এসেছি বলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তাদের ফাঁসির রায় আমরা কার্যকর করতে পেরেছি। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার করে তার রায়ও কার্যকর করতে পেরেছি। ৩ নভেম্বরের জেলহত্যার বিচার হয়েছে এবং এখনও যে কয়টা খুনি এখানে সেখানে পালিয়ে আছে তাদেরও খোঁজ খবর করা হচ্ছে। সরকারপ্রধান বলেন, ‘যারা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর জেল হত্যার খুনিদের দোসর, খুনিদের মদদদাতা- তাদের স্থান বাংলার মাটিতে ভবিষ্যতেও কোনোদিন হবে না। তাদের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে।’ আওয়ামী লীগ সরকার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোসহ সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে জাতির পিতা যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য বাংলাদেশ আজকে সারাবিশ্বে এতো দ্রুত উন্নয়নের বিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধাপরাধী, খুনি এদের সাজা হয়েছে, বিচার হয়েছে। এদের যারা দোসর বা ষড়যন্ত্রকারী, আজ যদি তাদের বিচার করে যেতে না পারি তাহলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম তাদের বিচার করবে।
ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। ষড়যন্ত্রকারীরাও একসময় ধরা পড়বে। তাদের এই রহস্য উদঘাটন অবশ্যই হবে। কেউ না কেউ এটা করবেই। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর নাম যখন দেশ থেকে মুছে ফেলেছিল, তখন তারা ভেবেছিল আর কোনওদিন এই নাম ফিরে আসবে না। কিন্তু তা হয়নি। ২১ বছর পর আবার ফিরে এসেছে। আবারও সময় আসবে আমাদের। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছে, জীবন দিয়েছে, যাদের রক্তের বিনিময়ে মহান আত্মত্যাগে এই স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা কখনও ব্যর্থ হতে পারে না, ব্যর্থ হয় নাই। ভবিষ্যতেও আর ব্যর্থ হবে না।

