‘আমাকে একা রেখে নানাবাড়ি যাও, তুমি মরবে’
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১৩ নভেম্বর ২০১৯ । আপডেট ১৫:৪২
পিয়ারা বেগম তার বাবার বাড়ি যাওয়ার সময় ছোট ছেলে অপু (১০) মায়ের সঙ্গে যেতে বায়না ধরে। কিন্তু মা পিয়ারা বেগম তাকে অনেক বুঝিয়ে বাড়িতে রেখে যান।
যাওয়ার সময় ছেলে মাকে বলেছিল- ‘আমাকে একা রেখে নানাবাড়ি যাও, তুমি মরবে’ কিন্তু কে জানত শিশুর এ কথাই বাস্তবে রূপ নেবে। মা পিয়ারা বেগমও জানত না ছোট ছেলের বায়নাকে বুঝিয়ে এটিই তার শেষ যাওয়া। বাড়িতে তিনি ফিরেছেন, তবে সাদা কাপড়ে কফিনবন্দি হয়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত পিয়ারার মরদেহ মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে চুনারুঘাট উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের ছয়শ্রী গ্রামের বাড়িতে আনা হয়।
এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পিয়ারা বেগমের ছোট সন্তান অপু মায়ের নিথর দেহের ওপর লুটিয়ে পড়ে। সে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
অপু গাদ্দিশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। মাকে হারিয়ে সে এখন অনেকটাই আশ্রয়হীন।
অপু বিলাপ করে বলে, আম্মা আমার পটেটো কই। তুমি না বলছিলে- আমার জন্য পটেটো নিয়ে আসবে। অপুকে কেউই সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না।
নিহত পিয়ারার আত্মীয়রা বলেন, মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি যাওয়ার জন্য অপু খুব করে কান্না করছিল। সামনে পরীক্ষা থাকায় মা তাকে সঙ্গে করে বেড়াতে নিতে চাননি।
এদিকে বুধবার সকাল ১০টায় এভাবেই গ্রামবাসী কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত পিয়ারা বেগমের জানাজা শেষে তাকে দাফন করেছে।
সোমবার রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় বাবার বাড়িতে যাওয়ার সময় কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যান হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ছয়শ্রী গ্রামের দিনমজুর আবদুছ ছালামের স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৪৫)।
জানা যায়, উপজেলার ছয়শ্রী গ্রামের দিনমজুর আবদুছ ছালামের স্ত্রী পিয়ারা খাতুনের বাবার বাড়ি নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার রশিদপুর গ্রামে। দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠেন রাত সাড়ে ১২টার দিকে। বি.বাড়িয়ার মন্দবাগ স্টেশনে ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে পিয়ারা প্রাণ হারান।
স্বজনরা পিয়ারার মরদেহ শনাক্ত করে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে চুনারুঘাট উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের ছয়শ্রী গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে ১০ এবং হাসপাতালে নেয়ার পর ছয়জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন ৭৪ জন। সোমবার রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের লুপলাইনের মুখে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশীথার মধ্যে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এ দুর্ঘটনার জন্য তূর্ণা নিশীথার চালক (লোকোমাস্টার) তাসের উদ্দিন ও সহকারী অপু দেকে দায়ী করে বরখাস্ত করা হয়।
মন্দবাগ রেলস্টেশনের মাস্টার জাকির হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আউটার ও হোম সিগন্যালে লালবাতি (সতর্ক সংকেত) দেয়া ছিল। কিন্তু তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করে ঢুকেপড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

