উন্নত বীমা সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

উন্নত বীমা সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০১ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২০ঃ২০

বীমা থাকার বিভিন্ন সুবিধা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি আধুনিক তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বীমা সংস্থাগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত ও এর পরিসেবা আরো উন্নত করতে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  বীমা কোম্পানীগুলোর মালিক ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বীমার যেকোনও কিছু অর্থাৎ বীমার দাবি নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে বীমা সেবাকে আরো সহজীকরণে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য্য। এটা করলে তবে দুর্নীতি দূর হবে। এর থেকে মানুষ উপকার পাবে। কাজেই সেক্ষেত্রে বীমা খাতটাকেও আপনাদের প্রযুক্তি নির্ভর করতে হবে। রোববার (১ মার্চ) সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বীমা দিবসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পৃথিবীর সবদেশে এটা হয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে আমি মনে করি আমাদের দেশেও পুরো বীমা পদ্ধতিটাকে আপনারা ডিজিটাল সিস্টেমে দাঁড় করাবেন।’ তিনি বলেন, এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমরা উৎক্ষেপণ করেছি, সারাদেশে ব্রড ব্র্যান্ড ইন্টরনেট সার্ভিস চালু করেছি। মোবাইল ফোন সকলের হাতে হাতে। ফোরজি আমরা চালু করেছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলবো বীমাটাকে আপনারা আরো মানুষের কাছে নিয়ে যান। এখন আমাদের গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষ কিন্তু অনেক বেশি সচেতন। কাজেই সেদিকে থেকে আমরা মনে করি তাহলে মানুষের আরো আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের সকল বীমা প্রতিষ্ঠানকে অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসলে বীমা খাতের উন্নয়নের সাথে সাথে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান হবে এবং কেউ ফাঁকি দিতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে বীমার গ্রাহকদেরও আস্থা এবং বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। বীমা খাতের প্রিমিয়ামসহ দেশের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।’

‘এছাড়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বীমা গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণে ‘স্টেট-অব-দি-আর্ট টেকনোলজি’ সম্পন্ন ‘ইউনিফাইড মেসেজিং প্লাটফর্ম’ (ইউএমপি) পদ্ধতি চালু করেছে। যা গ্রাহকদের আস্থা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে বলে আমি বিশ্বাস করি’ একথা উল্লেখ করে এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বীমা খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৫ ব্যক্তির মাঝে ‘বীমা পদক’ বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) ‘বীমা ম্যানুয়েল’ এবং ‘বীমা নির্দেশিকা’ নামক দুইটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। দেশের বীমা খাতের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে অনুষ্ঠানে একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম এবং আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন, বিশিষ্ট ইন্সুরেন্স ব্যক্তিত্ব বেগম ফরিদুর নাহার লাইলি এবং বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) প্রেসিডেন্ট বিএম ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

বীমার উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা পদক্ষেপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং জীবন বীমা কর্পোরেশনকে পেশাদারিত্ব এবং প্রযুক্তিগতভাবে আরও সক্ষম করতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সকল বীমা প্রতিষ্ঠানকে অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় আনা এবং এজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাড়ি যারা ব্যবহার করে তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় গাড়ির ইন্সুরেন্সটা সঠিকভাবে করে নাই। থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স, সামান্য কিছু টাকা দিলেই সার্টিফিকেটটা পেয়ে যায় এবং গাড়ি চালাতে পারে। কিন্তু যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন কিন্তু আর কিছুই পায় না।

সরকারপ্রধান বলেন, কারো গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে সে যে টাকা পেতে পারে বা ইন্স্যুরেন্সের টাকায় গাড়ি মেরামত করাতে পারে, সে বিষয়টা মানুষকে আরো ব্যাপকভাবে জানানো দরকার। প্রধানমন্ত্রী তার নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ‘কেউ যদি আপনাকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে তাহলে তার ইন্সুরেন্স থেকেই আপনার জরিমানার টাকা পাওয়া দরকার। যদিও এই সিষ্টেমটা আমাদের দেশে এখনও শক্তিশালীভাবে গড়ে উঠে নাই। আমি মনে করি এটা গড়ে ওঠা দরকার।’ তিনি বীমা কেম্পানী কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘বীমা করলে মানুষ যে সুবিধাগুলো পাবে সেগুলো মানুষের কাছে আরো ব্যাপভাবে প্রচারের প্রয়োজন রয়েছে।’

বর্তমান সরকারের উদ্যোগে কৃষকদের জন্য কৃষি বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, রেল যাত্রীদের জন্য বীমা এমনকি ভবনের জন্য বীমা করার উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের লেখাপড়া চালানো এবং সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিতের জন্য শিশুর জন্মের পরপরই তাদের নামে একটি করে বীমা এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্যও বীমা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বীমা মালিকদের প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা’ চালুর বিষয়টি তার সরকার পরিকল্পনায় রেখেছে। তিনি এ সময় স্বাধীনতার পর পাটের গুদামে ঘন ঘন আগ্নিকান্ডের উদাহরণ টেনে বীমার টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য একে ‘এক ধরনের ষড়যন্ত্র’ ছিল মর্মে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার সরকার গঠনের পর ঘন ঘন গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লাগার বিষয়টিকেও ‘ক্ষেত্র বিশেষে এই একই কারণে সৃষ্ট’ বলেও উল্লেখ করেন।

সরকারের প্রধান নির্বাহী শেখ হাসিনা বলেন, আমি তদন্ত শুরু করলাম এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে লাগালাম যে কেন, কিভাবে কিসের জন্য অগ্নিকান্ড ঘটছে বা ফেইক কি না, সে সময় কিছু কিছু ঘটনা ধরাও পড়লো। আর কিছু কিছু লোককে আমি নিজেই ধরে ফেললাম। তিনি আরো বলেন, ‘আমি নাম বলতে চাই না। কিন্তু আমার যেহেতু বলার অধিকার আছে, তাই বললাম।’

বীমা কোম্পানীর উদ্দেশ্যে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আপনাদের যারা পর্যবেক্ষক হবেন বা ঘটনার ইন্সপেকশনে যারা যাবেন, তাদেরকে ভালো ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং সৎ লোক হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা বীমার ক্ষেত্রে প্রিমিয়ামটা যাতে সঠিকভাবে দেয় সেটাও যেমন প্রয়োজন, বীমার টাকা যেন পায় এবং সঠিকভাবে পায় সেটা নিশ্চিত করাটাও জরুরি। যতটুকু ক্ষতি ততটুকুই যেন ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। ফাঁকি দিয়ে নেয়ার প্রবণতাটাও দূর করতে হবে।’

বীমা করে অর্থ উপার্জনটা এক সময় মধ্যবিত্ত এবং চাকরি প্রত্যাশীদের ভােলো উপার্জনের একটি পথ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা এখন আর তেমনভাবে নেই। আমি মনে করি এটা আবার ফিরে আসা উচিত।

বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় দেশের বেকার সমস্যা অনেকাংশেই লাঘব হয়েছে উল্লেখ করে

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘বীমা কোম্পানীর মালিক যারা রয়েছেন, তারা যদি এজেন্ট হিসেবে কাজ দেন তাহলে অনেক যুবক এবং বিশেষ করে মেয়েরা কাজ করতে পারে। ফলে কর্মংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্ব দূর হবে।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতা দেশের বীমা শিল্পের উন্নয়নে যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৭৩ সালে একটি স্বায়ত্বশাসিত বীমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা। জাতির পিতা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন উল্লেখ করে জাতির পিতার কন্যা বলেন, এই বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে পহেলা মার্চ। কাজেই মুজিববর্ষে আমি সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এটুকু বলবো- আসুন সকলে মিলে সে প্রত্যয় ব্যক্ত করি যে, বাংলাদেশকে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করবো।’

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading