বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে চীনা বিশেষজ্ঞরা
উত্তরদক্ষিণ । ২১ জুন ২০২০ । আপডেট : সোমবার ২২ জুন ২০২০ @ ০২:১৪
বাংলাদেশে সফররত চীনের করোনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মুল্যায়ন ও পরামর্শ্মূলক প্রতিবেদন পেশ করবে। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশ কিভাবে আরো ভালভাবে কোভিড ১৯ মহামারী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে সেই বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে ৪টি বিশেষ প্রতিবেদন বাংলাদেশের কাছে পেশ করবে।
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সহায়তার অংশ হিসাবে গত ৮ জুন দুই সপ্তাহের সফরে বাংলাদেশে আসেন ১০ সদস্যের চীনের করোনা বিশেষজ্ঞ দল। দুই সপ্তাহের সফরে চীনা মেডিকেল টিম বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন ও সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
চীনের করোনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের প্রশংসা করেন। তারা এখানকার (বাংলাদেশের) সাধারোন মানুষের মধ্যে জনসচেতনতার অভাবকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
দুই সপ্তাহের সফর শেষে সোমাবার (২২ জুন) চীনা চিকিৎসক দলের বাংলাদেশ ত্যাগের কথা রয়েছে। তারা ইতোমধ্যেই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই তা চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
রবিবার (২১ জুন) ঢাকার চীনা দূতাবাসের মিনিস্টার কাউন্সিলর অ্যান্ড ডেপুটি চিফ অব মিশন (ডিসিএম) হুয়ালং ইয়ান ডিপ্লমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিসিএবি)’র সদস্যদের সাথে এক অনলাইন ব্রিফিংকালে একথা বলেন।
ভার্চুয়াল আয়োজনে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের মিশন উপ-প্রধান হুয়ালং ইয়ান তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন। অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন চিকিৎসক দলের দুই সদস্য শুমিং শিয়ানু ও হাইতাং লিউ।
এই ব্রিফিংয়ের শুরুতে ডিসিএবি সভাপতি আঙ্গুর নাহার মন্টিও বক্তব্য দেন।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস নিয়ে জনসচেতনতা ও চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সফররত চীনা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা। তারা বলেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা যেমন খুবই কম, তেমনই কম নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে।
তারা বাংলাদেশী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের প্রশংসা করেন। সংখ্যায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা এই মহামারী মোকাবেলার লড়াইয়ে কঠোর পরিশ্রম করছেন বলেও মন্তব্য এসেছে চীনা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।
এর আগে বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ডা. শুমিং জিয়ানয়ু তাদের এই সফর সম্পর্কে ব্রিফ করেন। ইয়ান বলেন, চীনা বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন যে চীনের পরিস্থিতি আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কখন এই মহামারীর সংক্রমণ তুঙ্গে উঠবে বা কতদীন ধরে ভাইরাসটি এ দেশে থাকবে তা বলা কঠিন।
ঢাকার ডেপুটি চিফ চাইনিজ মিশন বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এই মহামারী মোকাবেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
চীনে ফেরার আগের দিন শনিবার ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিক্যাব) সদস্যদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন চিকিৎসক দলের সদস্যরা।
বাংলাদেশে সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ইয়ান বলেন, “বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনও চূড়ায় পৌঁছেনি, কবে পৌঁছবে তাও বলা কঠিন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় অবশ্যই পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লকডাউন করত হবে।
“এদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার খুবই অভাব। এটা দেখে চীনা চিকিৎসকদের বিশেষজ্ঞ দল ভীষণ হতাশ।”
বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় ল্যাব নেই। সেজন্য নমুনা ঢাকায় পাঠিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হয়।”
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের স্থায়িত্ব নিয়ে এক প্রশ্নে চীনা এই কর্মকর্তা বলেন, “এই পরিস্থিতি আরও ২-৩ বছর চলবে কি না, সেটা বলার মতো বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনও জানা নেই।”
কঠোর লকডাউনের সুপারিশ আসছে কি না- এ প্রশ্নে চীনের উদাহরণ টেনে ইয়ান বলেন, “অবশ্যই। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে লকডাউন অত্যন্ত কার্যকরী।”
চীনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চিকিৎসক শুমিং শিয়ানু বলেন, “এই সংক্রমণ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেই উহান থেকে শুরু করে একের পর এক দেশের বিভিন্ন শহর ও প্রদেশ লকডাউন করেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এই কারণেই অন্য অনেক দেশের তুলনায় চীনে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা কম।”
তিন উপায়ে ভাইরাস মোকাবেলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “তিনটি উপায়ে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আক্রান্তদের চিকিৎসা, এই ভাইরাসের ট্রান্সমিশন বন্ধ করা এবং যারা আক্রান্ত হননি, তাদের রক্ষা করা।”
ঢাকা ছাড়ার আগে সোমবার চীনা প্রতিনিধি দল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর সুপারিশ তৈরি করে দূতাবাসের মাধ্যমে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এক সপ্তাহের মধ্যেই চারটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সরকারের কাছে পৌঁছানো হবে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বা পুনরায় শুরু করতে দেশের কোন অঞ্চলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেশি, তা চিহ্নিত করতে হবে। কোন কোন ফ্যাক্টরিতে এই রোগ ছড়াতে পারে, তা খুঁজে বের করতে হবে।”
ভাইরাসের টিকা প্রসঙ্গে ইয়ান বলেন, “সুখবর হলো চীনে পাচঁটি কোম্পানি ভ্যাকসিন তৈরি করছে। ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শেষ হলে তা প্রথম পাওয়ার তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থাকবে।”

