পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘প্যাচরামী’!

পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘প্যাচরামী’!

মোহাম্মদ শিহাব, উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ । আপডেট ১৭:১০

পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি নিয়ে গতবছর দেশবাসী ব্যবসায়ী নামধারী মাফিয়াচক্রের তেলেসমাতি কাণ্ড দেখেছেন। ২০/২৫ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ৩০০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। যদিও প্রান্তিক বা খুচরা দোকানীরা অতি-মুনাফা লাভের সুযোগ খুব কমই পেয়েছেন। কিন্তু ভোক্তাদের কথা বেশি শুনতে হয়েছে খুচরা ব্যবসায়ীদেরকেই। বছর ঘুরতে না ঘুরতে মাফিয়াচক্র সুযোগ বুঝে সক্রিয় হচ্ছে। এরই মধ্যে ‘রিহার্সাল’ শুরু হয়ে গেছে রাজধানীসহ দেশের সব বাজারে। গত আগস্ট মাসের প্রথম দিকেও যে পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সেই পেঁয়াজ কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়ার তথ্য মিলেছে। অর্থাৎ এখন রাজধানীর বাজারে ৭০টাকা পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে ইন্ডিয়াকে।

ইন্ডিয়ায় পেঁয়াজের দাম নাকি বেড়ে গেছে। এ জন্য দেশি মহাজনরাও পেঁয়াজের দাম ইচ্ছে মতো বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। কথা হচ্ছে, ইন্ডিয়ায় দাম বাড়লে সেটা আমদানি করা পেঁয়াজে দাম বাড়বে। কিন্তু দেশি পেঁয়াজে কেন? এই পেঁয়াজ তো ১০/১৫ টাকায় কিনে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাহলে এর দাম এত বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে কোন যক্তিতে? এটা কি ‘প্যাচরামী’ (ফাইসলামি) নয়?

গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে পেঁয়াজের আড়ৎদারদের অতি মুনাফার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালানোর পর ব্যবসায়ীরা আড়ৎ বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি প্রশাসনের উপরও প্রভাব বিস্তার করার নামান্তর বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। কতিপয় অতি-লোভী ব্যবসায়ী শ্রেণির কারণে দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা বাধ্য হচ্ছেন উচ্চমূল্যে পেঁয়াজের মতো নিত্য পণ্য ক্রয় করতে। এর মাধ্যমে মূলত ওই অতি-লোভীরা দ্রুত ফুলে ফেপে কলা গাছ নয়, রীতিমতো তাল গাছ বনে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পেঁয়াজের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ থাকা সত্ত্বেও এই পণ্যটির দাম হু হু করে বাড়িয়ে দিচ্ছেন কতিপয় ব্যসায়ী সিন্ডিকেট। ফলে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাওরান বাজার, মগবাজার, মানিক নগর বাজারসহ প্রায় বাজারেই বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে।

বারাবরের মতো পেঁয়াজের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এক মাস আগে প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ টাকা। এখন সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪০ টাকা। আর একই সময়ে প্রতিকেজি আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। অর্থাৎ এক মাস আগের আমদানি করা যে পেঁয়াজের দাম ছিল ২৫ টাকা কেজি, সেই পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকারও বেশি দরে।

করোনার কারণে অনেকেরই আয় কমে গেছে। এই সময়ে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে বাড়তি চাপ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। রাজধানীর কমলাপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজার দেখার বোধ হয় কেউ নেই। কোরবানির সময়ও ৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনেছি। এখন সেই পেঁয়াজ ৬৬ টাকা কেজি দরে কিনতে হলো।’

গত বছরও সেপ্টেম্বর মাস থেকে ৩০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে তিনশো টাকা ছাড়িয়ে যায়।

রাজধানীর মানিক নগরের সবজি বিক্রেতা আবুল কাসেম বলেন, ‘মোকামে এখন পেঁয়াজের দাম বেশি। সেখান থেকে ৬০ টাকা দরে এনে ৬৫ টাকা দরে খুচরা বিক্রি করছেন তিনি।’ একই বাজারের ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী বলেন, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশেও পেঁয়াজের দাম এখন বাড়তি।’

এদিকে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবিও বলছে, গত এক মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। সংস্থাটির হিসাবে গত এক মাসে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৭২ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে খোলা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে টিসিবি। কিন্তু টিসিবির কম দামের সেই পেঁয়াজ কবে থেকে ভোক্তারা কিনতে পারবেন- সেবিষয়ে সংস্থাটি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের প্যাচরামীও এ মুহূর্তে বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং এই দর বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা হয়তো চলতি বছরের সামনের দিনগুলোতে বেড়েই চলবে!
লেখক: সাংবাদিক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading