ধর্ষণের মতো বলাৎকারের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তোলা উচিৎ
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
‘১৫ বছরের কিশোরের বিরুদ্ধে দুই বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ’, ‘শিশু বলাৎকার: মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার’, ‘সিরাজগঞ্জে শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকার: মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার’, ‘কোরআন চালান দিয়ে পাগল করার ভয় দেখিয়ে প্রতি রাতেই শিশুদের বলাৎকার’, ‘সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে প্রতিরাতেই মাদ্রাসা শিশুদের বলাৎকার করতো শিক্ষক’, ‘চেতনানাশক খাইয়ে ১৫ দিন ধরে বলাৎকার, মাদ্রাসাশিক্ষক আটক’ ‘হত্যার ভয় দেখিয়ে বলাৎকার, শিক্ষক আটক।’ এগুলো হলো গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা নিউজের শিরোনাম। গত কয়েক মাস ধরেই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এই ধরণের শিরোনাম বা খবরের সংখ্যা। বস্তুত: বেড়েছে দেশে ছেলে শিশু বা কিশোরকে বলাৎকারের ঘটনা। এই খবরগুলো যতটা না হৃদয়বিদারক তার চেয়ে মর্মান্তিক হলো এই ঘটনাগুলোর ধরণ। অর্থাৎ, বলাৎকার বলতে শুধু যে বলাৎকারের শিকার হচ্ছে তা নয়। সেই সাথে হচ্ছে বিভৎস নির্যাতনেরও শিকার। উপরের শিরোনামগুলো পড়লেই সেটা আঁচ করা যায়। কেউ তো আবার রুটিন করেই এসব করছেন।
২০ অক্টোবর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত খবর— “ছাত্রদের বলাৎকারের (ধর্ষণ) ভয়ানক নেশা তার। এই বিকৃত নেশায় এমনই আচ্ছন্ন ছিল এই ব্যক্তি, দুবাই থেকে ফিরে শিশুদের মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরে হোস্টেল সুপার হয়ে যায়। এরপর কোমলমতি ছাত্রদের নির্যাতনের মাধ্যমে বাধ্য করতো তার ইচ্ছা পূরণ করতে। আর কবে কোন ছাত্রকে বলাৎকার করবে সেজন্য রুটিন বানিয়ে ছিল মাদ্রাসা শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিন (৩৫)। আদালতে এসব তথ্য স্বীকার করেছে নাছির নিজেই। বলাৎকারের শিকার একাধিক ছাত্রের পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।”
দেশ যখন ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, সেই সময়েও এই ঘটনাগুলো অহরহ ঘটেই যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন বাড়ছে ছেলে শিশু বা কিশোরকে বলাৎকারের ঘটনা? কেউ তা নিয়ে তেমন কথাও বলছে না। বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আন্দোলনের মুখে দেশে শেষ পর্যন্ত ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ আইন পাশ করা হয়েছে। কিন্তু বলাৎকারের বিষয়টি নিয়ে গড়ে ওঠেনি জনমত।
এদিকে আরও একটি বিষয় রয়েছে, তা হলো নারী ধর্ষণের ঘটনাগুলো যত দ্রুত সামনে আসে ছেলে বলাৎকারের গুলো ততটা সামনে আসে না। কারণ, এ নিয়ে অনেকে মুখ খোলে না। কারণ, আমাদের সমাজ এই ২০২০ সালে এসেও মনে করে পুরুষকে ধর্ষণ করা যায় না; পুরুষকে যৌন হয়রানি করা যায় না; পুরুষকে যৌন নির্যাতন করা যায় না। অনেককে এই বিষয়টি বিশ্বাস করানোও যায় না। এখন কথা হলো, এই যে মাদ্রাসার ছেলেশিশুরা অকথ্য যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সেই সব ধর্ষকের বিচার চাওয়ার উপায় কী তবে? মাদ্রাসাগুলোতেই কেন এই ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেশি, সেটা নিয়েও ভাববার প্রয়োজন আছে বোধ করি। আর হঠাৎ করেই বা কেন এ ঘটনাগুলো বাড়ছে? এর পেছনে বিশেষ কোন জনগোষ্ঠি জড়িত কিনা, সেটাও গুরুত্বের সাথে ভাববার প্রয়োজন আছে।
এদিকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং ধর্ষণকারী ও নারী নির্যাতনকারীদের শাস্তি চেয়ে আন্দোলনে নামলেও বলাৎকারের শাস্তি চেয়ে কখনই শাহবাগে বা অন্য কোথাও বড় ব্যানারে আন্দোলনে নামেনি কেউ।
যদিও সম্প্রতি এক সভায় ‘ভাস্কর্য বিরোধী’ ইস্যুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘ভাস্কর্য নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, আগে নিজেদের চরিত্র ঠিক করেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় যেভাবে শিশু বলাৎকার হচ্ছে, আগে সেটি বন্ধ করেন’।
‘ভাস্কর্য নিয়ে কথা না বলে মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ নিয়ে সোচ্চার হতে’ হেফাজতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরীও।
কিন্তু সেই অর্থে জনমত গড়ে তোলা বা আন্দোলন করার জন্য এগিয়ে আসেনি কেউ। অথচ নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো বলাৎকারও কোনো অংশে ‘কম গর্হিত বা অমানবিক’ কাজ নয়।
‘বলাৎকার’ এক ধরণের বিকৃত রুচি ও মানসিকতার কাজ। সেটা মানসিক রোগ কিংবা এর পেছনে যে কারণ বা ব্যাখ্যাই থাকুক না কেন— ধর্ষণের মতো এটির বিরুদ্ধেও জনমত তৈরি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই। সেই সাথে দরকার এ অপরাধের শাস্তি বিধানে যুগোপযোগী ও কার্যকর আইন প্রনয়ণ করা এবং সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা। আর এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার এখনই সময়। এখনই দরকার ‘বলাৎকার’ রুখে দেয়ার।

