করোনাবর্জ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি: দরকার সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
সচেতন নাগরিক হিসেবে দিনভর মাস্ক বা করোনা প্রতিরোধক হিসেবে পিপিই পরছি ঠিকই, কিন্তু ব্যবহার শেষে তা কি আমার নিয়ম মেনে জায়গা মতো ফেলছি? উত্তর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘না।’ অন্য সব বাদ দিলাম মাস্কই তো আমরা ব্যবহার শেষে ফেলে রাখছি রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে। এসব করোনা বর্জ্যের হাত ধরে ওঁৎ পেতে থাকার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে প্রাণঘাতী কোভিড-১৯। বাড়ছে অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও।
পিপিই, গ্লাভস ও রোগীর ব্যবহৃত যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে দেখা দিচ্ছে নতুন সংকট। মোকাবিলা করতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চটজলদি আধুনিকায়ন ও সমন্বিত নীতিমালা তো লাগবেই, সাধারণ মানুষের সচেতনতাটাও খুব জরুরি।
করোনাভাইরাস সংক্রমণে পুরো ২০২০ সালজুড়ে সমুদ্রে ফেলা হয়েছে ১৫৬ কোটি পিসের বেশি মাস্ক। এতে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ আর সমুদ্র দূষণ। নষ্ট হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণির বেঁচে থাকার জন্য বাস্তুসংস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে হংকংয়ের একটি সংস্থার করা গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। পলিপ্রপলিন জাতীয় প্লাস্টিকের তৈরি এ মাস্কগুলোর ওজন হবে আনুমানিক সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টন। এগুলো ধ্বংস হতে সময় লাগবে সাড়ে ৪০০ বছর। মাস্কগুলো থেকে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্রের পানিতে মিশে যাবে, সেগুলো খাবারের সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণির দেহেও প্রবেশ করবে। তাদের জীবনচক্র হুমকির মুখে পড়বে।
হংকংয়ের সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওশেন এশিয়ার গবেষণা পরিচালক টেলে ফ্লেপস জানান, যদিও সাড়ে ৪ হাজার ৬০০ টন থেকে ৬ হাজার ২০০ টন প্লাস্টিক সামান্য অংশ, কারণ প্রতি বছর সমুদ্রে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ২০ লাখ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পড়ে। মহামারি থেকে বাঁচতে এই বছরই আনুমানিক ৫ হাজার ২০০ কোটি পিস মাস্ক তৈরি হয়েছে। একবার ব্যবহার উপযোগী মাস্কগুলো প্লাস্টিকের তৈরি হওয়ায় এগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা বেশ কঠিন। কারণ থেকে যায় সংক্রমণের ঝুঁকি। ‘সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণে কোভিড নাইনটিনের প্রভাব’ সংক্রান্ত রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়, এই মাস্কগুলো প্রতি বছর ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ৩০ লাখ টন বর্জ্য সমুদ্রে তৈরি করবে।
সমুদ্রের কথা বাদ দিলাম। স্থলেই তো করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর একটি বড় অংশ মানুষ রাস্তাঘাটে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। অথচ তারা ভাবছে না এসব বর্জ্যের মাধ্যমে পথচারীরাও সংক্রমিত হতে পারেন। নগরবাসী অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গেই তাদের ব্যবহৃত করোনা বর্জ্য রাখছে এবং তা সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করছে।
ওইসব বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কেউ কেউ বাড়িতে আলাদাভাবে এ করোনা বর্জ্য রাখলেও বর্জ্য সংগ্রহকারীরা তা অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গেই পরিবহন ও ডাম্পিং করছে; সঙ্গে রয়েছে হাসপাতালগুলোর বিপুল পরিমাণের চিকিৎসা বর্জ্য। ফলে এসব বর্জ্য থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত, করোনা বর্জ্য মূলত ‘সংক্রামক বর্জ্য’। যদি বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সংগ্রহকারীরও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে।
একবিংশ শতাব্দীর ‘জলবায়ু রক্ষা’, ‘পরিবেশ বাঁচাও’, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কর’, এরূপ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে ‘কোভিড-১৯’ আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ, যেখানে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে জীবন রক্ষায় ‘স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা’ ও পরিবেশ রক্ষায় ‘সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’।
সুতরাং করোনাভাইরাস নির্মূলের কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত মাস্কসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী মানুষকে ব্যবহার করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য মাস্ক বা অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে যেমন উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন সেই সাথে এসবের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনায়ও দরকার ব্যক্তি এবং সামগ্রিক পর্যায়ের সচেতনতা সৃষ্টি করা।
সর্বোস্তরের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, সবার আন্তরিকতা-সহযোগিতা এবং দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নই হতে পারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও করোনা প্রতিরোধে আমাদের সফলতার মূল প্রয়াস। অন্যথায় সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত সামগ্রীই জনজীবনে ডেকে আনবে আরেক মহাবিপদ।

