মাস্কেই সমাধান, জনগণকে বোঝাবে কে?
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস নীতিমালা’ চালু করলেও এখনও অনেকে মাস্ক ব্যবহার করছেন না। যেহেতু মাস্ক ব্যবহার করোনাভাইরাস সংক্রমণ হ্রাস করার মূল রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে, এখন দরকার কার্যকর ও সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে মাস্ক ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝানো।
দেশে নভেম্বরে, সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস নীতিমালা’ কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে, সেটা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও নিতে দেখা গেছে। করা হয়েছে জেল-জরিমানাও। কিন্তু ফলাফল?…
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য হাজার হাজার মানুষ জাতীয় সমাধিসৌধসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়েছিল। মাস্ক পরা মানুষের চেয়ে সেসব জায়গাগুলোতে মাস্ক না পরা মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। অনেকের আবার মাস্ক থাকে ব্যাগে, পকেটে কিংবা থুঁতনিতে ঝোলানো। এভাবে রাখলে মাস্ক যে কোনো কাজে আসে না, সেটাই বা তাদের বোঝাবে কে?
করোনাভাইরাসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেক কম। বয়স্ক ও যাদের শরীরে অন্য সমস্যা নেই তারা ছাড়া বেশিরভাগ মানুষই দেশে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে। যে কারণে এ ভাইরাসের প্রতি মানুষের ভয়ও হ্রাস পাচ্ছে। তাই বলে সংক্রমণ তো একেবারে থেমে নেই। কারণ, জনগণের মধ্যে ষোলআনা সচেতনতা নেই।
মানুষ যে সচেতন না, সেটাই বা বলি কীভাবে! মানুষ অনেক কিছুই জানে-বোঝে… অথচ এই ‘জানা-বোঝা’ লোকেদের মধ্যেই মাস্ক পরতে বেশি অনীহা। কেউ একজন হয়তো ইমিউনিটির জোর বা কোনোভাবে করোনাযুদ্ধে জিতে যাচ্ছে। তাই বলে সে যদি মাস্ক পরতে অনীহা দেখায়, গুরুত্ব না দেয় তাতে অন্যদের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা দেখবে কে?
অনেকের যুক্তি রয়েছে যে দীর্ঘসময় ধরে মাস্ক পরা অস্বস্তিকর। কারণ এটি ব্যবহার করলে ত্বক জ্বালা করে এবং শ্বাস প্রশ্বাসে ব্যঘাত ঘটায়, অক্সিজেনের ঘাটতিসহ আরও কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে।
আবার অনেকে মাস্ক পরেন না কারণ তাদের এটি নিয়মিত কেনার সামর্থ নেই। সেটা আলাদা কথা। তবে মানুষ ঘরে বসেই মাস্ক তৈরি করতে পারে এবং পরিষ্কারের পর তা পুনরায় ব্যবহারের বিষয়টি অনেকেই জানেন না।
সুতরাং, এখানে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে একটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। দরকার জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে মাস্ক পরা সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা মুজাহেরুল হক-এর ভাষ্যে- ‘আমাদের সঠিক সময়ে মানুষকে সঠিক বার্তা দেয়া দরকার। তবে আমরা করোনার মহামারির প্রথম থেকেই তা করতে ব্যর্থ হয়েছি। যখন আমাদের লকডাউন কার্যকর করার কথা ছিল, তখন আমরা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনগণকে এখানে-সেখানে যেতে এমনকি সমুদ্র সৈকতেও জড়ো হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘সবাইকে সাথে নিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করার জন্য ডব্লিউএইচও একটি সুপারিশ করেছে। ‘জনগণের সম্পৃক্ততার অভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রচেষ্টাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।’
এদিকে ভ্যাকসিন এখনো সোনার কাঠি রুপোর কাঠির মতো অনেকটা রুপকথার গল্প হয়ে আছে। দেশে এই ভ্যাকসিন কবে আসবে, কবে থেকে দেয়া শুরু হবে, কে আগে কে পরে পাবে সেটা একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এ অবস্থায় যখন বারবার বলা হচ্ছে- মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা, তখন আমরা এ ব্যপারে অনীহা দেখাচ্ছি। শীতও চলে এসেছে, সম্ভাবনা রয়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির, এর মধ্যে শুধু করোনা নয় দূষিত বায়ুর প্রকোপ থেকে বাঁচতেও মাস্ক পরা প্রয়োজন সেটা কেন আমরা বুঝছি না?
এত আইন কানুন, ভ্রাম্যমাণ আদালত, জেল-জরিমানা- চোখের সামনে বিভিন্ন দেশে করোনায় আক্রান্ত-মৃত্যুহার বৃদ্ধির খবর দেখছি, তারপরও যদি এ ব্যপারে আমরা নিজ থেকে সচেতন না হই, তাহলে আমাদের আর বোঝাবে কে? ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’

