নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা: সচেতনতা এবং সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করা জরুরী

নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা: সচেতনতা এবং সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করা জরুরী

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ১২:০১

দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণের মত জঘন্য ঘটনা। ধর্ষণ ‘কামুক’ মানবসন্তানের সৃষ্ট এক চূড়ান্ত পৈচাশিকতার নাম যা বর্তমানে ব্যপকহারে বেড়েছে। বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলনের মুখে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী এনে অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা ইতোমধ্যে কার্যকর করা সত্ত্বেও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

আমাদের সংবিধানে খুব পরিষ্কার করে লেখা আছে, “নারী এবং পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করবে।” তারপরও আমরা দেখছি, প্রতিনিয়ত নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। যদিও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার বদ্ধপরিকর। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা যে প্রয়োজন, সেটাই হচ্ছে না। আবার এসব ক্ষেত্রে কঠোর আইন থাকলেও, সমস্যা অন্যদিকে থেকেই যায়। হয়রানি বা এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে অনেকে বিব্রত বোধ করেন। অনেকে মুখ খুললেও হয়তো বেশিরভাগ সময় পারিবারিক সাপোর্ট পান না। উল্টে অনেকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নও হন।

‘কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির’ কথাই ধরা যাক। বাসায় গিয়ে কোনো নারী যদি স্বামীকে বিষয়টি জানায়, বেশিরভাগ স্বামীই বলবে, “চাকরি করার দরকার নেই।”

তাছাড়া দেখা যাচ্ছে যে, শিশুদের যৌন হয়রানির ঘটনাগুলোর সবই বাড়ির ভেতরে হয়। শুধু যৌন নির্যাতন নয়, মানসিক নির্যাতনও। আবার আমরা বেশ কিছু উদাহরণ পেয়েছি যে, সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও কিছু করা যাচ্ছে না। যা ঘটার তা ঘটেই যায়।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার হলো- ভিকটিমের প্রতি সহযোগি মনোভাব গড়ে তোলা। সমাজের মানুষের উচিত্ ভিকটিমকে খারাপ চোখে না দেখে, তাকে মানসিক বা অন্য যেকোনো সাপোর্ট দরকার হলে সেটা নিশ্চিত করা। ভিকটিম যাতে নিঃসঙকোচে তার সমস্যা খুলে বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা। এতে সুষ্ঠ কার্যকারণবিশ্লেষণ করাও সহজ হবে। দু্রত ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সম্ভব হবে। এছাড়া আমাদের চারপাশের নারী-শিশুরা যাতে হয়রানি-নির্যাতন-ধর্ষনের শিকার না হয় সেদিকে নিজেদের অবস্থান থেকে প্রতিনিয়ত সতর্ক ও সচেতন দৃষ্টি রাখা দরকার ।

ইউএন উইমেন প্রকাশিত তথ্য মতে, বিশ্বে ৩৫ শতাংশ নারী বা প্রায় প্রতি তিনজনে একজন নারী তার জীবন পরিক্রমায় শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা ঘটে আপনজনের দ্বারা। সহিংসতার স্বীকার ৪০ শতাংশের কম নারী সহায়তা পেয়ে থাকে। বিশ্বে মোট মানব পাচারের ৭২ শতাংশ নারী ও শিশু। তাই নারীর প্রতি সংঘটিত সব ধরনের নির্যাতন ও অপরাধ নির্মূল করার জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশব্যাপী যে হারে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, এ কোন বর্বরতার মধ্যে আমরা বসবাস করছি? কোথাও না কোথাও ঘটে চলেছে ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধও। সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে ডলফিন গলিতে ‘ও লেভেল’-এ পড়ূয়া এক কিশোরীকে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। এ ঘটনায় মেয়েটির বন্ধু দিহানকে আটক করা হয়েছে। এমন ধর্ষণের ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটছে দেশের কোথাও না কোথাও। সব খবর হয়তো গণমাধ্যমে আসছেও না।

নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা নারীর মানবাধিকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ। এই নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে সরকারের সঙ্গে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবেই সবার সম্মিলিত উদ্যোগে আমরা নারী ও শিশুর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতামুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। ধর্ষণ প্রতিরোধে জরুরি অপরাধীর যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করা। দুর্বল ভিকটিমদের পক্ষে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে ব্যক্তি-সংগঠনকে।

প্রকৃতপক্ষে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ কিংবা নারী-শিশু’র প্রতি সহিংসতা এখন সমাজের ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। নারী-শিশুদের জীবনকে নরকময় করে তুলেছে পাশবিক রুচির কিছু মানুষ। যার ফলে বর্তমানে নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েও আতংকগ্রস্থ হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আইনের পাশাপাশি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সচেতনতা জরুরি। সেই সাথে সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করাও দরকার।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading