ম্যাক্সিম গোর্কি; উনিশ শতকে ঝড় তুলেছিলেন যিনি
সাইফুল অনিক । সোমবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২১ । আপডেট ১১:৪০
বিশ্বসাহিত্যে উনিশ শতকে যে কয়েকজন হাতেগোনা সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে ঝড় তোলেন, ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মাক্সিম গোর্কি ছিলেন একজন সোভিয়েত সাহিত্যক ও লেখক, নাট্যকার, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। তিনি নিজেই তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম হিসেবে ‘গোর্কি’ অর্থাৎ ‘তেতো’ নামকে বেছে নেন। রাশিয়ায় জারের রাজত্বকালে, প্রথাগত রচনার বাইরে গোর্কি তাঁর লেখা— গল্প, উপন্যাস, নাটকে সমাজের নিচুতলার মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার আলেখ্য তুলে ধরেন। তার অনেক বিখ্যাত রচনার মধ্যে ‘মা’ একটি কালজয়ী উপন্যাস। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন।
জন্ম ও বেড়ে উঠা
ম্যাক্সিম গোর্কি ১৮৬৮ সালের ২৮শে মার্চ রাশিয়ার নিঞ্জি নভগরদ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ। তবে তিনি মাক্সিম গোর্কি নামেই প্রসিদ্ধ হয়েছেন। গোর্কির বাবার নাম ছিলো মাক্সিম পেশকভ ও মায়ের নাম ভারিয়া। পিতৃদত্ত নাম মুছে গোর্কি নামেই উত্তরকালে জগৎবিখ্যাত হন। তিনি ৯ বছর বয়সে পিতৃমাতৃহীন হন। বাবা মারা যাবার পর মায়ের সঙ্গে এসে আশ্রয় নিলেন মামার বাড়ি নিজনি নভগরোদ শহরে। তারপরে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হলেন। ইতোমধ্যে মা আরেকজনকে বিয়ে করেছেন। হঠাৎ করে একদিন মা মারা যান। এরপরে গোর্কির নানা আর দায়িত্ব নিতে চান নি। ১৮৮০ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন।
শিক্ষা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গোর্কি। কিন্তু স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। প্রথম কারণ, তার নানা কোনো খরচ দিতে রাজি হননি। দ্বিতীয় কারণ, নানার বাড়িতে পড়াশোনার কোনো পরিবেশই ছিল না বা পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তার কথা কেউ ভাবত না। আর তৃতীয় কারণ হচ্ছে, মামারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ নিয়ে এমন নারকীয় পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিলেন যে কিশোর গোর্কির পক্ষে বাড়িতে তিষ্টানো ছিল খুব কঠিন। ফলে তিনি বখাটেদের সঙ্গে মিশে ঘুরে বেড়ানোর পথটাকেই বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্কুলের বাঁধন ছিন্ন হলেও কোনো এক অজ্ঞেয় কারণে বইয়ের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হয় এবং তিনি নিজে নিজেই লেখাপড়া করতে থাকেন। সম্পূর্ণই স্বশিক্ষিত এক মানুষ বলা যায় গোর্কিকে।
কর্ম ও সাহিত্যজীবনের বিকাশ
১৮৮২ সালে সাহিত্য রচনা শুরু করেন। তিনি দীর্ঘ ৫ বছর ধরে পায়ে হেঁটে সমগ্র রাশিয়া ভ্রমণ করেন। তিনি জেহুদিয়েল কামিদা ছদ্মনামে লিখেছিলেন। ম্যাক্সিম গোর্কীর সর্বপ্রথম রচনা গল্প ‘মাকার চুদ্রা’। সেটি প্রকাশিত হয় তিবিলিসির সংবাদপত্র কাভকাজে। যেখানে বেশিরভাগ সময় ককেশীয় রেলওয়ে কর্মশালার জন্য তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ কাজ করেছিলেন। সাংবাদিক হিসাবে প্রাদেশিক সংবাদপত্রে কাজ করছিলেন।
প্রথাগত রচনার বাইরে গোর্কি তার লেখায় প্রাধান্য দেন সমাজের নিচুশ্রেণীর খেঁটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জীবনের গল্পকে। ১৮৯৮ সালে তার লেখা প্রবন্ধ ও গল্প নিয়ে একটি সংকলন রেখাচিত্র ও কাহিনী প্রকাশিত হয়। ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয় তার সার্থক উপন্যাস ফোমা গর্দিয়েভ। ১৯০০ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত গোর্কির লেখা আরও আশাবাদী হয়ে ওঠে। ১৯০১ সালে বিপ্লবী ছাত্রদের হত্যার করার জন্য প্রতিবাদ জানিয়ে গোর্কি রচনা করলেন ঝোড়ো পাখির গান নামের কবিতা। ১৯০৭ সালে তিনি রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘মা’।
পোভোলজিয়ে দুর্ভিক্ষ
১৯২১ সালের জুলাইয়ে গোর্কি বাইরের বিশ্বের কাছে একটি আবেদন প্রকাশ করে বলেছিলেন, ফসলের উৎপাদন কম হওয়ায় লক্ষ লক্ষ জীবন দুর্ভোগে পতিত হয়েছিল। ১৯২২-২২ সালের রাশিয়ান দুর্ভিক্ষ, যা পোভোলজিয়ে দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। প্রায় আনুমানিক ৫ লক্ষ মানুষ মারা যায়, যা মূলত ভোলগা এবং ইউরাল নদীর অঞ্চলগুলিতে ছিল।
বিপ্লবী গোর্কি
গোর্কির সমস্ত কার্যক্রমে সাহিত্যে ক্রমশই লেনিনের আদর্শের প্রচ্ছন্ন প্রভাব লক্ষণীয় হচ্ছিলো। যোগাযোগ বাড়ছিলো বিপ্লবীদের সাথে। এর কিছুই চোখ এড়ায়নি। গোর্কিকে নির্বাসনে পাঠানো হলো আরজামাস নামের এক ছোট্ট শহরে। আবার সারাদেশ উত্তাল হলো প্রতিবাদে। প্রতিবাদে যোগ দিলেন স্বয়ং তলস্তয়, লেনিনের মতো মহারথীরা। এরই মধ্যে গোর্কি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পাঠানো হলো ক্রিমিয়ার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে হাত দিলেন তার অন্যতম বিখ্যাত নাটক ‘লোয়ার ডেপথ’ রচনার কাজে। ১৯০১ সালে নাটকটি প্রকাশিত হয়। এই নাটকে গোর্কি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এবারে শুধু রাশিয়া নয়, গোর্কির নাম ছড়িয়ে পড়লো গোটা ইউরোপে।
শাসকশ্রেণীর অন্যায়-অত্যাচারের বিরূদ্ধে সবসময়ই সরব ছিলেন গোর্কি। এজন্য তাকে জেলবন্দী হতে হয়েছে বহুবার। জারের অত্যাচারে একসময় আমেরিকায় পাড়ি জমাতে বাধ্য হন তিনি। সেখানেই রচিত হয় তাঁর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস ‘মা’, যার মধ্য দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন বিপ্লব ছাড়া শোষিত শ্রেণীর মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়।
প্রথমদিকে সরকারের রোষানলের ভয়ে বইটি ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তা রাশিয়ান সহ বিশ্বের আরো বহু ভাষায় রূপান্তরিত হয়। এখনও ‘মা’ কে বিশ্বসাহিত্যের সেরা উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘মা’ ছাড়াও গোর্কির লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে তারা তিনজন, আমার ছেলেবেলা, আম্মা ইত্যাদি বেশ বিখ্যাত। গোর্কি শেষজীবনে লেখা শুরু করেন তাঁর আরেক উপন্যাস ‘ক্লিম সামগিনের জীবন’। যদিও এই উপন্যাস তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।
মৃত্যু
১৯৩৬ সালের ১৮ই জুন গোর্কি মারা যান। মৃত্যুর আগের বেশ কিছু সময় তাকে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত রাশিয়া শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। মস্কো রেডিও থেকে ঘোষণা দেওয়া হলো, “মহান রাশিয়ান লেখক, শ্রমিকদের বন্ধু, সাম্যবাদের চিরযোদ্ধা ম্যাক্সিম গোর্কি মারা গেছেন।”
গোর্কির সাহিত্যকর্মের সংখ্যা খুব বেশী নয়। কিন্তু যতটুকু তিনি লিখে রেখে গেছেন তা চিরকাল অসহায়, নিপীড়িত মানুষকে জেগে ওঠার প্রেরণা জোগাবে, ছড়াবে সাম্যবাদের বাণী। কেননা গোর্কি শুধুই একজন সাহিত্যিক নন, বরং তিনি একজন মহৎ মানুষ এবং একজন বিপ্লবী।
ইউডি/ অনিক

