আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী পুরুষ
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ৩ জানুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১১:০৫
হুমায়ূন আহমেদের ছিলেন একজন বাংলাদেশী স্বনামধন্য এবং কিংবদন্তীতুল্য সাহিত্যিক, লেখক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র রচয়িতা। লেখার জাদুতে যেমন আলোড়ন তুলেছেন, তেমনি সৃজনশীলতার সব শাখাতেই পাঠক ও দর্শকদের নিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় লেখক তিনি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক।
হুমায়ুনের বেড়ে উঠা
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন আহমেদ। তার ডাক নাম ছিল কাজল। বাবার রাখা প্রথম নাম শামসুর রহমান হলেও পরে তার বাবা ছেলের নাম বদলে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা গৃহিণী। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার অন্য দুই ভাইও বরেণ্য ও প্রতিভাবান। কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল তার ছোট ভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।
শিক্ষাজীবন ও তারুণ্য
হুমায়ূন আহমেদের পিতা একজন সরকারি চাকরিজীবী হওয়াতে পরিবারের সাথে তাকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে থাকতে এবং পড়াশোনা করতে হয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সংস্কৃতিমনস্ক একজন তরুণ। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় সিলেটের কিশোরী মোহন পাঠশালায়। পরে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ড থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। এখান থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রী লাভ করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
১৯৭২ সালে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ পাঠকমহলে এতটাই নন্দিত হয়েছিল যে এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে৷ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, গীতিকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক- প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন তিনি। তবে মুদ্রার ওপিঠ ও দেখেছেন তিনি। যুদ্ধে বাবা মারা যাওয়ার পর দারুণ অর্থ কষ্টে দিন কেটেছে তার পরিবারের। পড়ালেখা শেষ করার পর ছিল না চাকরি। বাবার পেনশনের টাকায় সব ভাইবোনের পড়াশুনার ও সংসারের খরচ চলছি না। প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকেও বিক্রি হচ্ছিল না তেমন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। তখন থেকেই ভাগ্য ফিরিতে শুরু করে হুমায়ূনের। কিছুদিন পর থেকেই বই লেখার রয়্যালিটি ও অগ্রিম টাকা আসতে শুরু করে। আর্থিক দুরবস্থায় শেষমেশ প্রাপ্তির সেই মুহূর্ত নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘বেতনের ডবল টাকা নিয়ে বাসায় ফিরেছি। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এই টাকার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই। এই টাকা অন্য কারোর।’
উল্লেখযোগ্য সাহিত্য
রসবোধ আর অলৌকিকতার মিশেলে বাংলা কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ৷ তাঁর সৃষ্টি হিমু, মিছির আলী, বাকের ভাই চরিত্রগুলো পেয়েছে ‘অমরত্ব’৷
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংখ্যা তিনশ’রও বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের এই অধ্যাপক নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, গৌরিপুর জংশন, নৃপতি, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, জোছনা ও জননীর গল্প, এমন ঝড় তোলার মতো উপন্যাস উপহার দিয়েছেন আমাদের।
টিভি নাটকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে
১৯৮০-১৯৯০ এর দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ধারাবাহিক এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রচনা শুরু করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে তার প্রথম টিভি কাহিনীচিত্র ‘প্রথম প্রহর’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার শুরু হলে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
তার টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলোর মধ্যে এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়, আজ রবিবার, নিমফুল, তারা তিনজন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, সবুজ সাথী, উড়ে যায় বকপঙ্খী, এই মেঘ এই রৌদ্র এখনও ইউটিউবে খুঁবে বেড়ান অনেকেই। খেলা, অচিন বৃক্ষ, খাদক, একি কাণ্ড, একদিন হঠাৎ, অন্যভূবন।
চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে শৈল্পিক নৈপুণ্য
হুমায়ূনের উপন্যাসের নাট্যরূপ ধারাবাহিকভাবে টেলিভিশনে প্রচারিত হলে সেখানেও দর্শকদের সাড়া। হুমায়ূন যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তা দেখতেও শহর ভেঙে পড়ে। হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত ও ঘেটুপুত্র কমলা সবগুলোই ছিল দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসা সফল।
চলচ্চিত্র বা নাটকের জন্য হুমায়ূন আহমেদ গান লিখেছেন, আবার তাতে সুরও দিয়েছেন, তা সমাদৃত হয়েছে। যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো, চাঁদনী পসরে কে, ও আমার উড়াল পঙ্খীরে, এক যে ছিল সোনার কন্যা, আমার ভাঙ্গা ঘরে ভাঙ্গা বেড়া ভাঙ্গা চালার ফাঁকে, চাঁদনী পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন।
ক্যানসারের কাছে হার মানা
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির বেলভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছা অনুযায়ী গাজীপুরে তার গড়া নুহাশ পল্লীতে তাকে কবর দেয়া হয়, এখানে হুমায়ূন আহমেদের একটি আবক্ষ মূর্তিও রয়েছে। হুমায়ূন আজো বেঁচে আছেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে হৃদয়ে।
ইউডি/ অনিক

