তেল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি

তেল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি

মো. সাইফুল ইসলাম । মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:১৫

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে হঠাৎ করেই সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে রিফাইনারি কোম্পানিগুলো। ফলে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তেলের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সর্বশেষ বাজার দর অনুযায়ী প্রতি লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা দরে। এর আগে, লিটার প্রতি দাম ছিল ১১০-১৫ টাকার মধ্যে। বিগত দেড় মাসে তেলের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার অপেক্ষায়।

সম্প্রতি পরিস্থিতি বিবেচনায় সব রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভোজ্যতেলের আমদানি ও রিফাইনের পরিমাণ জানতে চেয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, সব রিফাইনারি কোম্পানির কাছে ভোজ্যতেল বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা গত তিন মাসে কী পরিমাণ আমদানি করেছে, কত পরিমাণ পরিশোধন করেছে, তা কাস্টমস পেপারসহ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া তারা কত পরিমাণের ডিও/এসও দিয়েছে, কত ডেলিভারি করেছে এবং কত মজুত আছে, সেটাও জানতে চেয়েছি।

এদিকে সারাদেশের বাজারে চলছে তেলের হাহাকার। অনেক যায়গায় নেই তেল। কোথাও থাকলেও বিক্রেতারা পাচ্ছেন না। আবার কোথাও বিতরণ প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় কর্মীরা করছেন টালবাহানা। বিগত কিছু দিনের সংবাদপত্রে উঠে আসা সংবাদগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে এমন চিত্র। তেল নিয়ে যখন দেশের এই অবস্থা তখন দায়সারা ভাবেই কথা বলে চলছে বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো।

গত বুধবার (২ মার্চ) গণমাধ্যমে ‘কুয়াকাটায় তেল সংকটে বন্ধ হচ্ছে খাবার হোটেল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন বলা হয়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় হঠাৎ সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু জায়গায় অল্প পরিমাণে পাওয়া গেলেও সব জায়গায় মিলছে না। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে।

হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান এরকম অবস্থা চলতে থাকলে তারা হোটেল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। এতে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন কুয়াকাটার ব্যবসায়ীরা। কুয়াকাটার মুদি দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দু-একটি দোকানে স্বল্প পরিমাণ সয়াবিন তেল রয়েছে। তবে বেশিরভাগ দোকানে সয়াবিন তেল নেই। তখন দোকানিরা জানায় গত ১০ দিন ধরে কোনো কোম্পানি সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে না।

এছাড়া বরিশালের বাজারেও দেখা দিয়েছে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট। বেশ কিছুদিন ধরে বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো চাহিদামতো সরবরাহ না করায় সয়াবিন তেলের এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছেন। ব্যবসায়ীরা জানায়, তেলের চাহিদা জানিয়ে সরবরাহের জন্য ভোজ্যতেল কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হয়েছে। তবে তারা সরবরাহ করছেন না।

এমতাবস্থায়, সয়াবিন তেল বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধি পেতেছে অভিনব ফাঁদ। অন্য পন্য না নিলে তারা দিচ্ছে না তেল। হুমায়ুন কবির নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘চুক্তিমতো একটি কোম্পানির তেলের সঙ্গে মরিচের গুঁড়ার প্যাকেট নিতে হয়েছে। আরেকটি কোম্পানির তেলের সঙ্গে বাধ্যতামূলক চা পাতার প্যাকেট নিতে হয়েছে।’

বরিশাল নগরীর পুরান বাজারের ভোজ্যতেলের কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০ লিটার খোলা সয়াবিন তেলের ব্যারেলের দাম এক সপ্তাহ আগে ছিল ২৮ হাজার টাকা। এখন তা ৩৩ হাজার টাকা। এরপরও কোম্পানিকে অগ্রিম টাকা পাঠিয়েও তারা চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, গাজীপুরে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। শহরের জয়দেবপুর বাজার ও নগরীর চান্দনা চৌরাস্তা বাজারে বিভিন্ন দোকানে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল। বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খোলা সয়াবিন তেল অনেক বিক্রেতা ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।

এমতাবস্থায়, সাশ্রয়ী দামে তেল নিতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের পেছনে ছুটছে মানুষ। এখন সেই লাইন আগের থেকে হয়েছে দীর্ঘ। পণ্য পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। টিসিবির ট্রাকের পেছনে সিরিয়াল তৈরির শুরুতে সংখ্যা দাঁড়ায় দেড়শোর বেশি। এরপর কিছু সময় যেতেই সেখানে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ উপস্থিত হয়। অথচ বরাদ্দের তেল দেওয়া সম্ভব সর্বোচ্চ আড়াইশো জনকে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading