৫০ বছরে বিশ্বসভায় মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ

৫০ বছরে বিশ্বসভায় মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ

গুলজার আযম খান । সোমবার, ১৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫৪

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জন আমাদের জন্য সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার প্রসার, নারী উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় স্বদেশ। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম আদর্শ দেশ হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিয়ে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কৃষি খাতে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য বিশ্ব দরবারে বারবার আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সমগ্র বিশ্বের নিকট প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্র্য দূরীকরণে সাফল্য, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনোমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের ওয়ার্ল্ড লিগ টেবিল ২০২১ রিপোর্টে। রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নয়নের চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১৫ বছর পর বিশ্বের ১৯৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান হবে ২৫তম।

বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নয়নশীল প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি। জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামের শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। রূপকল্প-২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৯ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ফোর জি মোবাইল প্রযুক্তি চালু, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, অনলাইনে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও ভর্তি প্রক্রিয়া, ই-টেন্ডার প্রবর্তন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র, ই-কমার্স প্রভৃতির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব।

পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে দ্বিতীয়, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাল উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে ৯ম, খাদ্যশস্য উৎপাদনে ১০ম। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার, দুস্থ ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান নিশ্চিত করা হয়েছে। শিল্পায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বন্ধ থাকা পাটকল এবং বস্ত্রকল পুনরায় চালু করা হয়েছে। সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অনুসরণ করছে অন্যান্য দেশ। করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক অতিমারিতেও বাংলাদেশকে দাবায়ে রাখা যায়নি। বর্তমান সরকার এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। করোনা মোকাবিলার সক্ষমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ও বিশ্বে ২০তম। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা আজ শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর গণতন্ত্র সূচক-২০২০-এ চার ধাপ অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। ৫ দশমিক ৯৯ স্কোর নিয়ে সূচকে ১৬৫টি দেশ ও দুটি অঞ্চলের মধ্যে ৭৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাংলাদেশকে উত্তরণের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করে। মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সামাজিক সূচকে উন্নতি এবং অর্থনীতির সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে মনে করেছে জাতিসংঘ। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে ইন্ডিয়া, চীন, মালয়েশিয়ার মতো এলডিসি নয় এমন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাবে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে দ্য ইকোনমিস্ট ৬৬টি সবল অর্থনীতির তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজির অনেক সূচক অর্জন করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে বাংলাদেশ। এমডিজি অর্জনের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইন্ডিয়ান অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন তার এক গ্রন্থে লিখেছেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে, এ কথা কেউ ভাবেনি। এ দেশকে কোনো অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়াই উচিত নয়। কারণ, সে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করে উঠতে পারবে না। তিনি আরো বলেছেন, জীবনমানের নানা সুপ্রচলিত মাপকাঠিতে বাংলাদেশ কেবল ভারতের চেয়ে অনেক ভালো করছে না, অনেকটা এগিয়েও গেছে। অনেক সামাজিক সূচক, যেমন : গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, টিকা দেওয়ার মাত্রা, সনাতন প্রজননের হার এবং এমনকি স্কুলশিক্ষার কিছু মাপকাঠিতে বাংলাদেশ ইন্ডিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। সমগ্র বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ গণ্য করছে। উন্নয়ন গবেষকরা আজকের বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’, দক্ষিণ এশিয়ার ‘তেজি ষাঁড়’, অফুরন্ত সম্ভাবনার এক বাংলাদেশসহ নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। বিজয়ের ৫০ বছরে এসে আমরা বিশ্বসভায় অন্য এক মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশকে দেখছি।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading