করোনা বেকারদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে

করোনা বেকারদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে

সাদেকুল ইসলাম শাওন । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:২৪

করোনা দেখা দেয়ার আগে যারা ফেরত টিকিট নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন কিংবা করোনা শুরু হলে যাদের কর্মক্ষেত্র বন্ধ হয়েছিল তারা সবাই দেশে এসে আটকে পড়েছেন। কিন্তু এখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলেও দেশে ফিরে আসা প্রবাসীরা যেতে পারছেন না তাদের কর্মস্থলে। বৈশ্বিক করোনায় দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে অচলাবস্থা কাটছে না। দিন যত যাচ্ছে ক্রমেই বাড়ছে সংকট। গ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছেন কিন্তু সমস্যা নিরসনের কোনো লক্ষণ নেই। করোনাকে সঙ্গী করেই জীবন-জীবিকার জন্য যুদ্ধ করছে মানুষ।

২০২৩ সাল পর্যন্ত কাজের বাজারে করোনার প্রভাব থাকবে। কাজ হারাবেন আরো বহু মানুষ। কমবে কর্মসংস্থান। বাড়বে দারিদ্র্য। বুধবার এমনই এক রিপোর্ট পেশ করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন। গোটা পৃথিবীর যে চিত্র তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে তা যথেষ্ট আশঙ্কার কারণ। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে করোনার প্রকোপ মহামারীতে রূপ নেয়। তখন থেকেই কাজের বাজারে মন্দা শুরু হয়েছিল। ইউরোপ, অ্যামেরিকা সহ গোটা পৃথিবীতেই মানুষ কাজ হারাতে শুরু করেন। বিশেষত যারা দিন মজুরের কাজ করেন, তারা সবার আগে কাজ হারান। বেসরকারি ক্ষেত্রে এবং কর্পোরেট সেক্টরেও বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের যেখানে কাজ হারিয়েছিলেন ১৮৭ মিলিয়ন মানুষ, সেখানে ২০২২ সালে ২০৫ মিলিয়ন মানুষ কাজ হারাবেন। ২০২০ এবং ২০২১ সালে সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি।

এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বহু শিল্পকারখানা। মানুষের ভোগবিলাসের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই শিল্পের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন শিল্পমালিকরা। কেননা বাজারে আগের মতো আর চাহিদা নেই। একমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্যসব বেচাকেনা ঠেকেছে তলানিতে। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন অনেক শিল্প মালিকও। আর কর্মীদের মধ্যে বেড়েছে হতাশা। কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকলেও চাকরি হারানোর আতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। আবার সারাদেশের অধিকাংশ জেলা বন্যাকবলিত হওয়ায় নিত্যপণ্যের বাজারেও চলছে দর বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। যার প্রভাব পড়ছে ক্রেতাসাধারণের ওপর। পাশাপাশি সংকুচিত হয়ে আসছে বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগও। প্রবাসীরাও ফেরত আসছেন প্রতিনিয়ত। পূর্বে দেশে আসা প্রবাসীদের কর্মক্ষেত্রে ফিরতে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ফলে দেশের সংকুচিত হয়ে আসা কর্মক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সংকট। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, করোনায় বাংলাদেশের প্রতি চারজনে একজন বেকারত্বের শিকার হচ্ছেন।

একইভাবে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও পিপিআরসির হিসাবেও নতুন করে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন করোনার আঘাতে। বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি সংস্থা, ব্যাংক-বীমা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগও চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে নতুন চাকরির সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে চাকরিচ্যুতি করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এতে বেকারত্ব বাড়ার সঙ্গে বিরূপ প্রভাব পড়ছে সব ক্ষেত্রে। শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত দুই শ্রেণির চাকরিজীবীরাই বাধ্য হচ্ছেন ঢাকা ছাড়তে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উচ্চশিক্ষিত হয়ে বের হচ্ছেন, সে পরিমাণ কর্মক্ষেত্র নেই। ফলে উচ্চশিক্ষিতের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে এসএসসি পাস বা এর নিচে থাকা জনগোষ্ঠী শ্রমিক হিসেবে বা কারিগরি বিভিন্ন খাতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। কোভিড-১৯-পরবর্তী দুনিয়া কেমন হবে তা হয়তো এখনই বলা যাবে না। তবে এটা বলা যায়, কোভিড-১৯-এর কারণে কর্মবাজারে যে প্রভাব পড়েছে এর রেশ টানতে হবে বহুদিন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ একটু বেশিই। কেননা আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে সম্পদের পরিমাণ খুব কম। ফলে কাজের সুযোগই সীমিত। পাশাপাশি যারা দেশের বাইরে কর্মরত ছিলেন তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন এটাও একটা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। বেকার সমস্যা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে এ সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে।

সরকারের উচিত স্বল্পশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিবিন্যাস করে পৃথক পরিকল্পনা করা। দেশের ভেতরের বেকারদের কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের যেমন ভাবা উচিত, তেমনি সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দলে দলে ফিরে এসেছেন জীবন বাঁচাতে, তারাও এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। সব মিলিয়ে আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ইউরোপসহ সৌদি, মিসর, জর্ডান, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বসা। সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় এ সংকটের সুরাহা হতে পারে বলে আমাদের ধারণা। সরকার জরুরিভাবে এসব প্রবাসীর কর্মসংস্থান ফেরাতে ব্যবস্থা নিলে, সংকট পুরোপুরি নিরসন না হলেও কাজের বাজার প্রশস্ত হতে পারে বলে আমাদের ধারণা।

লেখক: বেসরকারি চাকুরীজীবী

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading