আমরা কি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম?

আমরা কি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম?

কবিরুল বাশার । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমদিকে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের সাথে বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রয়েছে। দিনে দিনে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির ফলে তলিয়ে যাওয়া অঞ্চল থেকে ২০৫০ সাল নাগাদ ৩ কোটি মানুষ গৃহহীন হতে পারে। বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক অনেক বেশি।

বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনই এমন যে, কোথাও কোথাও ভূ-ভাগ যথেষ্ট ঢালু। ভূ-তাত্ত্বিকভাবে, দেশটি থেকে উত্তর দিকে রয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পার্বত্যাঞ্চল, যেখান থেকে বরফগলা পানির প্রবাহে সৃষ্ট বড় বড় নদী (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ইত্যাদি) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবহমান এবং নদীগুলো গিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। বর্ষাকালে নদীবাহিত পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে নদী উপচে পানি লোকালয়ে পৌঁছে যায় এবং দেশটি এভাবে প্রায় প্রতি বছরই বন্যায় আক্রান্ত হয়।

বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের মৌসুম এবং ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং অসময়ে বৃষ্টিপাত কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের শস্য এবং ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে খরায় আক্রান্ত হবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, এর মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকই বেশি। এরকম খরায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে আলাদা আলাদা উপাত্ত পাওয়া যায়। কারো মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সালে নাগাদ খরায় উদ্বাস্তু হবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ সমুদ্রতীরের বেশ কয়েকটি দেশে সামনের দিনে মিঠা পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় অনেক এলাকায় দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির অভাব। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে এই অভাব প্রকট। অন্যদিকে লোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলীয় এলাকায় দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। এই সমস্যা উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর এবং কুমিল্লা পর্যন্ত উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়েছে এবং আরও উত্তরে বিস্তৃত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এরকম অকস্মাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের প্রায় ৮ শতাংশেরও বেশি নিম্নাঞ্চল ও প্লাবনভূমি আংশিক এবং/অথবা স্থায়ীভাবে জলমগ্ন হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ ইতিমধ্যেই পানির উচ্চতাজনিত কারণে লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষেরা খাপ খাওয়াতে না পেরে সুন্দরবনে নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকে সুন্দরবনের গাছ কেটে বিক্রি করছে। দরিদ্র ও বিপন্ন এসব মানুষকে থামানোর জন্য আইন প্রয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তন্মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্‌ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। স্থলভাগে ঘূর্ণিবায়ু বা ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডোর আঘাত এখন প্রায় নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসের পর গবাদিপশুর শুকনা খাদ্যের আকালে পড়ে অনেক পরিবার।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষতির বিবেচনা করে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অভিযোজন খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করা উচিত। আর এই বরাদ্দ আদায়ের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত ভাবে কাজ করা প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও গবেষক

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading