স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান: বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক ক্রিকেটার

স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান: বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক ক্রিকেটার

গাজী কাইয়ুম । শুক্রবার, ২৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:২৭

ক্রিকেট জগতের বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসাবে স্বীকৃত প্রবাদপুরুষ স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান। খেলেছেন মাত্র ৫২ টেস্ট, ব্যাট হাতে নেমেছেন ৮০ বার। কিন্তু এই ৮০ ইনিংসেই কালজয়ী এক মহাকাব্য লিখে ফেলেছিলেন তিনি। ঊনবিংশ শতাব্দীর ক্রিকেটারদের মধ্যে নিজের ক্যারিয়ার দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে আছেন স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান। স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন গাজী কাইয়ুম

নিউ সাউথ ওয়েলসের নতুন সূর্য: ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান ১৯০৮ সালের ২৭শে আগস্ট নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্ড্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জর্জ ও এমিলি ব্র্যাডম্যানের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বড় ভাই ভিক্টর এবং তিন বড় বোন ইসলেট, লিলিয়ান ও এলিজাবেথ মে। পিতা ও মাতা দুই দিক থেকেই তিনি ইংরেজ বংশোদ্ভূত। তার পিতামহ চার্লস অ্যান্ড্রু ব্র্যাডম্যান সাফোকের উইদার্সফিল্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।

বয়ে বেরিয়েছেন সন্তানদের হারানোর ক্ষত: ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন। জেসি মার্থা মেঞ্জিস নাম্নী এক রমণীর পাণিগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালে জেসি’র মৃত্যু পূর্ব-পর্যন্ত ৬৫ বছর সাংসারিক জীবন অতিবাহিত করেন। বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর গুণগান গেয়েছেন তিনি। একবার তিনি বলেছিলেন, জেসি’র সহযোগিতা ছাড়া আমি কখনো এ অর্জনগুলোর সন্ধান পেতাম না। এ দম্পতির তিন সন্তান ছিল। কিন্তু, তাদের পারিবারিক জীবন শান্তিময় ছিল না। তাদের প্রথম সন্তান কিশোর অবস্থায় ১৯৩৬ সালে মৃত্যুবরণ করে। দ্বিতীয় সন্তান জন ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করলেও পোলিও ভাইরাস সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। তৃতীয় সন্তান শার্লি ১৯৪১ সালে জন্মগ্রহণ করলেও জন্মকালীন সেরিব্রাল পালসি রোগে আক্রান্ত।

ক্রিকেটে পদার্পণ ও রেকর্ডের শুরু: ১৯৩০ সালের টেস্টে ক্রিকেট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া দল দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৬৬ রানে গুটিয়ে যায় ও ৬৭৫ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়। ব্র্যাডম্যান সেই ম্যাচে ১৮ ও ১ রান করার পর দল নির্বাচকমণ্ডলী তাকে বাদ দেয় ও পরের টেস্টে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে রাখে। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে আবারো খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন ব্র্যাডম্যান। সেই ম্যাচে ৭৯ ও ১১২ রানের ইনিংস খেলে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। অবশ্য অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত পরের টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার আর্চি জ্যাকসন তার অভিষেক টেস্টে ১৬৪ রান তুলে তার এ রেকর্ড ভঙ্গ করেন। এটিই তার খেলোয়াড়ী জীবনের একমাত্র রান আউটের ঘটনা ঘটেছিলো চতুর্থ ম্যাচে। ঐ খেলায় অস্ট্রেলিয়া দল মাত্র ১২ রানের ব্যবধানে হেরে যায়। ঐ মৌসুমে ব্র্যাডম্যান ৯৩.৮৮ গড়ে ১,৬৯০ রান তুলেছিলেন। ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ৩৩৪ রান করেন। টেস্ট খেলোয়াড় হিসেবে অবসর গ্রহণের প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড তাকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত অস্ট্রেলীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

অমর কীর্তি পারফেক্ট রান মেশিন: টার্মটা সম্ভবত ব্র্যাডম্যানের সাথেই যায়। এমন সব কীর্তি জানার পর ব্র্যাডম্যানের ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ তকমার উপযুক্ততা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান প্রথম টেস্ট খেলেই দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। এখন ভাবতেও অবাক লাগে যে, স্বয়ং ব্র্যাডম্যানও পারফর্মেন্সের জন্য কোনো সময় বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু সব ক্রিকেটারকেই ভালো ও খারাপ দিন দুইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এতে তার ট্যালেন্ট বা কৃতিত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায় না। ১৯২৮ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্র্যাডম্যানের টেস্ট ক্রিকেট কেরিয়ারে মোট ৫২ টি টেস্টে অংশগ্রহণ করে সর্বমোট ৫৯৯৬ রান সংগ্রহ করেছিলেন । ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪ ছিল, যা সেরা অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার: খেলোয়াড়ী জীবন থেকে অবসর নেবার পর পরবর্তী তিন দশক প্রশাসক, দল নির্বাচক ও লেখক হিসেবে আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। খেলার জগৎ থেকে দূরে থাকা সত্ত্বেও তার মতামত বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেতো ও তার মর্যাদা জাতীয় পর্যায়ের সমতুল্য ছিল। টেস্ট খেলোয়াড় হিসেবে অবসর গ্রহণের প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড তাকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত অস্ট্রেলীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ডাকটিকিট ও মুদ্রায় ব্র্যাডম্যানের প্রতিচিত্র উপস্থাপন করা হয়। জীবিত অবস্থাতেই তার জীবনের সবগুলো দিক জাদুঘরে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৭ আগস্ট রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান মিন্ট কর্তৃপক্ষ তার প্রতিকৃতিসহ ৫ ডলার মূল্যমানের স্বর্ণমুদ্রা প্রকাশ করে। ২০০৯ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে তাকে মরণোত্তর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে অর্জন করলেন সম্মানসুচক ‘নাইটহুড’। উইজডেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের পুরস্কারটি একাই দশবার এবং গ্যারি সোবার্স আটবার লাভ করেছিলেন। এছাড়া, অন্য কোন খেলোয়াড়ই তিনবারের বেশি লাভ করতে পারেননি। ২০০০ সালে শতাব্দীর সেরা অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ড দলে তাকে অধিনায়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান

২২ গজের বাইরে তার কীর্তি: ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান ক্রিকেট খেলার উপর কয়েকটি বই লিখেছেন, যার মধ্যে তার আত্মজীবনী ‘ক্রিকেট হতে বিদায়’ ‘আর্ট অর ক্রিকেট’ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন । ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান নির্জনে থাকতে ভালোবাসেন। সঙ্গীত প্রিয় ছিলেন তিনি। তিনি খুব সুন্দর পিয়ানো বাজাতে পারতেন। পিয়ানো বাজিয়ে তার অবসর সময় কাটাতেন। ১৯৩০ সালে ‘এভরিডে ইজ আ রেইনবো ডে ফর মি’ নামে একটি গান কম্পোজ করে রেকর্ড করেছিলেন। এছাড়া পিয়ানোবাদক হিসেবেও ‘অ্যান ওল্ড ফ্যাশনড লকেট’ এবং ‘আওয়ার বাংলো অব ড্রিমস’ নামে তার দুইটা গান আছে।

মৃত্যু: ২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের দেহাবসান ঘটে।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading