অতুলপ্রসাদ সেন: সঙ্গীতাঙ্গনে নিজস্ব সত্ত্বার প্রবর্তক
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:১৭
| রবীন্দ্রনাথ তাকে ভালবাসতেন খুব। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ গড়েছিলেন খামখেয়ালী সভা। সদস্য ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল, মহারাজা জগদীন্দ্রনারায়ণ রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লোকেন্দ্রনাথ পালিতসহ আরও অনেকে। অতুলপ্রসাদ সর্বকনিষ্ঠ সভ্য। |
বাংলার সঙ্গীতের জগতে অতুলপ্রসাদ সেন এক বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী। গায়ক ও গীতিকার রূপেও তার খ্যাতি ছিল অনেক বেশি। বাংলার সঙ্গীতের জগতে রামপ্রসাদ, নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এদের সঙ্গে অতুল প্রসাদের নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও স্মরণীয়। লখনউয়ের মুকুটহীন সম্রাট, বাংলা গায়ক ও গীতিকার ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম
অতুলপ্রসাদ সেন কে ছিলেন?: অতুলপ্রসাদ সেন ছিলেন ব্রিটিশ উপমহাদেশের ঊনবিংশ শতাব্দীতে আবির্ভুত একজন বিশিষ্ট বাঙালি গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। তিনি একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতবিদও ছিলেন। তার রচিত গানগুলির মূল উপজীব্য বিষয় ছিল দেশপ্রেম, ভক্তি ও প্রেম। তার জীবনের দুঃখ ও যন্ত্রণাগুলি তার গানের ভাষায় বাঙ্ময় মূর্তি ধারণ করেছিল; “বেদনা অতুলপ্রসাদের গানের প্রধান অবলম্বন”।
অতুলপ্রসাদ সেনের জন্ম: অতুলপ্রসাদ সেন বাংলা গানের জগতে এক বিশেষ রীতির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি যে সব গানে সুর দিয়েছেন তা অতুলপ্রসাদী সুর নামে সুখ্যাত। ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন অতুলপ্রসাদ সেন। তার পিতার নাম ছিল রামপ্রসাদ সেন। তাদের আদি নিবাস ছিল ফরিদপুরের মগরায়।
শৈশবকাল ও শিক্ষাজীবন: বাল্যবয়সে পিতৃহীন হয়ে মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের স্নেহে যত্নে প্রতিপালিত হন। ভগবদভক্ত কালীনারায়ণ ভক্তিগীতি রচনা করে সুখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি নিজেও ছিলেন সুকণ্ঠ গায়ক। তার সকল গুণই দৌহিত্রের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল এবং পরে সার্থকতা লাভ করেছিল। অতুলপ্রসাদ ১৮৯০ খ্রিঃ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে কিছুকাল কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যান।
অতুলপ্রসাদ সেনের কর্মজীবন: ১৮৯৪ সালে বিলেত থেকে ফিরে এসে প্রথমে কিছুকাল কলকাতায় ও পরে রংপুরে আইন ব্যবসায় শুরু করেন। যৌবনে লখনোবাসী হন এবং সেখানেই আইন ব্যবসায় প্রচুর অর্থউপার্জন করেন ও লখনো এর শ্রেষ্ঠ আইনজীবী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আউদবার অ্যাসোসিয়েশন ও আউদবার কাউন্সিলের সভাপতি হয়েছিলেন। পেশাগত সাফল্য লাভের সুযোগে অতুলপ্রসাদ লখনো নগরের সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন এবং নানাভাবে সমাজের উপকার সাধন করেন। তার গৃহই হয়ে উঠেছিল নগরীর সারস্বত মন্ডলীর মিলনকেন্দ্র।
উপার্জনের বেশিরভাগ অর্থই তিনি ব্যয় করতেন স্থানীয় জনসাধারণের সেবার কাজে। পরবর্তীকালে নিজের বইয়ের স্বত্ব ও বাসভবনটি সমাজসেবী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দান করেন। জীবিতকালেই তিনি এরূপ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে নগরবাসী তার গুণ ও প্রতিভার সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি জানিয়েছিল তার নামে তার বাসস্থানের রাস্তাটির নামকরন করে। জীবিতকালে এরূপ সম্মান লাভ বিরল ঘটনা।
অতুলপ্রসাদ সেনের সঙ্গীত রচনা: সঙ্গীত জগতে অতুলপ্রসাদের নিজস্ব একটি রীতি সৃষ্টি করেছিলেন। এই সঙ্গীত ছিল অতুলপ্রসাদের জীবনে একটি প্রাণের আরাম। তিনি যে সকল গান রচনা করেছিলেন, তার সুর দানও তিনি নিজেই করেছিলেন। বাংলার বাউল ও কীর্তনের সুরের সঙ্গে হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের সুর ও ঢঙ মিশিয়ে তিনি নিজস্ব সঙ্গীতরীতির প্রবর্তন করেছিলেন। যা সুপরিচিত অতুলপ্রসাদী সঙ্গীতরীতি নামে প্রসিদ্ধ। অতুলপ্রসাদের রচিত গানগুলিকে প্রধানতঃ তিনভাগে বিভক্ত করা যায়। তা হল স্বদেশী সঙ্গীত, ভক্তিগীতি ও প্রেমের গান।
তার স্বদেশী সঙ্গীতগুলি স্বদেশী আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। জাতীয় চেতনা জাগরণে তার উঠ গো ভারতলক্ষী, বল বল বল সবে শতবীণাবেণুরবে’, ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ–মরি বাঙলা ভাষা, তোমারি যতনে তোমারি উদ্যানে, আমার হাত ধরে তুমি, কে আবার বাজায় বাঁশি, বধু এমন বাদলে তুমি কোথা প্রভৃতি গানগুলির অবদান অপরিসীম। সারাজীবনে প্রায় দুশত গান রচনা করেন। তার গানগুলি সংগৃহীত হয় কয়েকটি গান ও গীতিগুঞ্জ সংকলনে। সমস্ত গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন কাকলি নামের গ্রন্থমালায়।
খানিক যুক্ত ছিলেন রাজনীতিতেও: প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন সংগঠকদের মধ্যে অতুল প্রসাদ ছিলেন অন্যতম প্রধান। সম্মেলনের মুখপত্র উত্তরা’র তিনি ছিলেন অন্যতম সম্পাদক। সম্মেলনের কানপুর ও গোরখপুর অধিবেশনে তিনি সভাপতি হয়েছিলেন। কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গেও তিনি এককালে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি লিবারেল পন্থী হন।
ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অসুখী: তার দাম্পত্যজীবন দীর্ণ ছিল যন্ত্রণায়। স্ত্রী হেমকুসুম লখনউতেই দীর্ঘকাল আলাদা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। অতুলপ্রসাদ তার মা হেমন্তশশীকে নিজের কাছে এনে রাখতে চান, রেখেওছেন, তাতে হেমকুসুমের রাগ। অতুলপ্রসাদ সবার এত কাছে কাছে থাকেন, তার কাছে থাকেন না, তাই অভিমান। অথচ দু’জনের মধ্যেই ভালবাসার পূর্ণপাত্র। এমনও হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা, হেমকুসুম হাসিমুখে এসে নিজে হাতে সমস্ত আয়োজন করেছেন। অনুষ্ঠান-শেষে ফিরে গিয়েছেন অভিমানী ভাড়া বাড়িতেই, অতুলপ্রসাদের ঘরে নয়। সুশিক্ষিতা হেমকুসুমের গলায় বিচ্ছেদকালে ঠাঁই পেত অতুলপ্রসাদেরই গান। অতুলপ্রসাদও বহু বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন চোখের জলে, গান লিখে-গেয়ে।
অতুলপ্রসাদ সেনের মৃত্যু: বাংলা সঙ্গীত জগতের অন্যতম স্মরণীয় প্রতিভা ১৯৩৪ সালের ২৬ শে আগষ্ট পরলোক গমন করেন। বাংলা সঙ্গীত জগতে তার এক অসাধারণ প্রতিভা ছিল। তার অন্যতম দেশাত্মবোধক গানের কিছু অংশ হল: হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর, হও উন্নত শির, নাহি ভয়। ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান, হও সবে আগুয়ান, সাথে আছেন ভগবান, হবে জয়। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান, দেখিয়া ভারতে মহাজাতির উত্থান, জগজন মানিবে বিস্ময়। জগজন মানিবে বিস্ময়।

