বিপর্যয়ে কাগজশিল্প: আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকুন

বিপর্যয়ে কাগজশিল্প: আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকুন

ফারজানা ইসলাম জুঁই । মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৮

গত দুই দশকে বাংলাদেশের কাগজশিল্পের বিকাশ অহংকার করার মতো। বাংলাদেশের কাগজ দুনিয়ার অনেক উন্নত দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কাগজ রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রশংসিত হচ্ছে। অথচ কাগজশিল্পের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার বদলে কর্তৃপক্ষীয় ভুল ও অনুদার নীতি বিকাশমান এ শিল্পের জন্য সংকট তৈরি করছে। চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি এ শিল্পের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে কয়েক বছর ধরে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আঘাত হানছে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে দেশি মিলগুলো থেকে সংগ্রহের বদলে বিনাশুল্কে কাগজ আমদানির উদ্যোগ।

স্বার্থান্বেষী মহলের অসাধু কর্মকান্ড, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, অবৈধভাবে আমদানি ও বাজারজাতকরণে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ কাগজশিল্প এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। একটি কুচক্রী মহল পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের নামে দেশি মিল থেকে কাগজ সংগ্রহ না করে বিনাশুল্কে আমদানির আত্মঘাতী উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বিপিএমএর আশঙ্কা হলো দেশের স্বার্থবিরোধী এ উদ্যোগ সফল হলে কাগজশিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। বিগত দিনে পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের জন্য দেশি মিলগুলো গুণগত মানসম্পন্ন কাগজ সরবরাহ করে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাগজশিল্প আমদানি-বিকল্প, রপ্তানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। প্রতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিবি ৮০ হাজার টন কাগজ ও ৪০ কোটি মুদ্রিত বই কিনে থাকে। বিপিএমএ সদস্যরা ২০ বছর ধরে এনসিটিবির চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন কাগজ সঠিক মূল্যে যথাসময়ে সরবরাহ করে আসছে। বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। সরকার প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের জন্য বিনাশুল্কে কাগজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও, একইভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করা হতে পারে। এতে রাজস্ব ক্ষতি আরও বাড়বে। কাগজশিল্প অসম প্রতিযোগিতায় ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে।

দেশে ৪০ জিএসএমের ওপরে সকল প্রকার লেখা ও ছাপার কাগজ আমদানিতে বর্তমান শুল্ক-কর কাঠামো বহাল রাখতে বলেছে বিপিএমএ। সংগঠনটি বলেছে, বিনাশুল্কে কাগজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয় ও আমদানি হওয়া কাগজের মধ্যে তীব্র বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাগজ আমদানি করে খোলাবাজরে বিক্রি করা হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। তাই কাগজ আমদানির বিদ্যমান শুল্ক ও কর কাঠামো বহাল রাখা প্রয়োজন।

থারমাল কোটিং স্লারি, থারমাল পেপার উৎপাদনের প্রধান কেমিক্যালস হওয়ায় আমদানি পর্যায়ে সিডি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে বিপিএমএ। সংগঠনটি বলেছে, দেশি কাগজ মিলসমূহে বর্তমানে আমদানি-বিকল্প পণ্য থারমাল পেপার উৎপাদন হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন যাবৎ আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। বাজারে থারমাল পেপারের প্রচুর চাহিদা থাকায় এবং সরকারের উদার শিল্পনীতির সুযোগে এসব পণ্য প্রচুর পরিমাণে আমদানি হচ্ছে এবং বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে। আমদানি হওয়া থারমাল পেপারের চেয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানও ভালো। এ ছাড়া এ উন্নতমানের কাগজ তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে।

পেপার কাপ, প্লেট ও বোল দেশেই উৎপাদিত হওয়ায় আমদানি পর্যায়ে ট্যারিফ ভ্যালু প্রতি কেজি দেড় ডলার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে বিপিএমএ। সংগঠনটি এ প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, বর্তমানে আমদানি-বিকল্প পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত ডিসপোজিবল পণ্য হিসেবে পেপার কাপ, প্লেট ও বোল উৎপাদন হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন যাবৎ আমদানি করে চাহিদা মেটানো হতো। বর্তমান বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারী অবস্থায় দেশের বাজারে পেপার কাপ, প্লেট ও বোলের প্রচুর চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব পণ্য প্রচুর আমদানি হচ্ছে। ফলে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও হচ্ছে। অথচ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানও ভালো।

কাগজশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিপিএমএর তথ্যানুযায়ী দেশে এখন ছোট-বড় মিলে ১০৬টি কাগজ উৎপাদনকারী শিল্প রয়েছে। যেগুলোর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ লাখ টন; যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় ২ দশমিক ৫০ গুণ বেশি। এক দশক আগেও যেখানে আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হতো, সেখানে বর্তমানে সব ধরনের কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য উৎপাদনে দেশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশের কাগজ মিলগুলো দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে তাদের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করছে। দেশে এককভাবে কাগজের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

প্রতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিবি ৮০ হাজার টন কাগজ ও ৪০ কোটি মুদ্রিত বই কিনে থাকে। বিপিএমএ সদস্যরা ২০ বছর ধরে এনসিটিবির চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন কাগজ সঠিক মূল্যে যথাসময়ে সরবরাহ করে আসছে। কিন্তু এ বছর দেশি কাগজের বদলে বিনাশুল্কে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির পাঁয়তারা কাগজশিল্পের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানকেও করছে প্রশ্নবিদ্ধ। এমনিতেই বন্ডেড ওয়্যার হাউস সুবিধার অপব্যবহারে এ শিল্পে নাভিশ্বাস সৃষ্টি করছে। পাঠ্যবই ছাপাতে বিদেশ থেকে আমদানি হলে তা কাগজশিল্পের কফিনে পেরেক মারার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে; যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য হওয়া উচিত নয়।

লেখকঃ অনলাইন বিশ্লেষক।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading