সত্যজিৎ রায়: উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের অগ্রদূত

সত্যজিৎ রায়: উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের অগ্রদূত

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:২২

সত্যজিৎ রায় শুধুমাত্র একজন আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি শুধু দেশের নয়, বহু আন্তর্জাতিক শ্রেষ্ঠ পুরস্কারগুলো অর্জন করেন একাধিকবার। এক হিসাবে জানা যায়, ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ২৮টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন, যা বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আর কারো পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সু-সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোর তার “দ্য রিভার” ছবি নির্মাণের জন্য কলকাতায় এসে সত্যজিৎকে তার সহকারী হিসাবে নিয়োগ দেন। অনেকে মনে করেন, বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সত্যজিতের জীবনে জঁ রেনোর ভুমিকাই ছিলো অন্যতম। তার কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন সিনেমা নির্মাণের সঠিক কৌশল।

সত্যজিৎ রায় কে ছিলেন?: সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক এবং লেখক। পথের পাঁচালী, অপরাজিত (১৯৫৬) ও অপুর সংসার (১৯৫৯) এই তিনটি একত্রে অপু ত্রয়ী নামে পরিচিত এবং এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ী সত্যজিতের জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বহুল স্বীকৃত।

বনেদি পরিবারে জন্ম ও শৈশব: ১৯২১ সালের ২রা মে ময়মনসিংহের মসুয়ার জমিদার বংশে সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের জন্ম। তার পিতা বাংলা শিশু সাহিত্যে খেয়ালরসের স্রষ্টা সুকুমার রায়, মাতা সুপ্রভাদেবী। এই বংশেরই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন শিশু সাহিত্যিক, সংগীত, চিত্রশিল্পী ও যন্ত্রকুশলী। সত্যজিৎ ছিলেন তারই পৌত্র। তার যখন আড়াই বছর বয়স তখন তিনি পিতৃহারা হন, মাতা সুপ্রভাদেবীর সঙ্গে সত্যজিৎ ছয় বছর বয়স থেকে মামার বাড়িতে থাকেন। মায়ের কাছেই প্রাথমিক পড়াশুনা।

সত্যজিৎ রায়ের শিক্ষাজীবন: দশ বছর বয়সে বালিগঞ্জ হাইস্কুলে ফিথ ক্লাসে অর্থাৎ এখনকার মতে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৩৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বি.এ পাশ করেন। বাবা এবং ঠাকুরদার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই শিল্প সাহিত্যের প্রতিভা লাভ করেছিলেন সত্যজিৎ। ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসেবে ব্রহ্মসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ইন্ডিয়ান মার্গসঙ্গীতের প্রতিও অনুরাগ জন্মেছিল।
চিত্রশিল্পের চর্চা ছিল বাল্যবয়স থেকেই। বি.এ পাশ করার পর শিল্প শিক্ষার জন্য ভর্তি হন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে। কিন্তু আধুনিকমনা সত্যজিতের পক্ষে এখানকার পরিবেশ মনঃপুত না হওয়ায় শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই কলকাতায় চলে আসেন।

সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন: ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন কোম্পানি ডিজে কিমার সংস্থায় জুনিয়র ভিসুয়ালাইজার হিসেবে যোগ দেন। এই সময়েই তিনি সিগনেট প্রেস প্রকাশন সংস্থার বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা শুরু করেন। ছোটদের পত্রিকা মৌচাকেও তার প্রথম আঁকা অলঙ্করন প্রকাশিত হয়। অক্ষরলিপিতেও এই সময় তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে অক্ষরলিপিতে রোমান টাইপ সিরিজ তার বিশেষ অবদান বলে স্বীকৃত হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের আর্ট ডিরেক্টারের পদে উন্নীত হন। তার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীর সাফল্যের পর ১৯৫৬ সালে এই চাকরিতে ইস্তফা দেন।

তার অমর সৃষ্টি পথের পাঁচালী: সত্যজিৎ রায় পরিচালিত পথের পাঁচালীর প্রথম প্রদর্শনী হয় নিউইয়র্কে ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে। কলকাতায় মুক্তি পায় সেই বছরেই ২৬ শে আগস্ট। ছবিটি সেই বছরই রাষ্ট্রপতির স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক পায়। পরে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট এর প্রশংসাপত্র লাভ করে। এরপর ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পথের পাঁচালী বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্রোৎসবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত হয়েছে। তার পরিচালিত প্রায় সবকটি ছবিতেই তার সৃজনশীল প্রতিভার বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে। যা ইন্ডিয়ান অন্য কোন ছবিতে ছিল দুর্লভ।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে: বস্তুতঃ সত্যজিৎ ইন্ডিয়ান চলচ্চিত্রের গোত্রান্তর ঘটিয়েছিলেন। তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবি অপরাজিত, অপুর সংসার, জলসা ঘর, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অভিযান, মহানগর, চারুলতা এবং শেষ দিককার ঘরেবাইরে, গণশত্রু, শাখাপ্রশাখা, আগন্তুক প্রভৃতি। ১৯৭৭ সালে পরিচালনা করেন প্রথম হিন্দি ছবি শতরঞ্জকে খিলাড়ি। তার তৈরি তথ্যচিত্র হল রবীন্দ্রনাথ, সিকিম, সুকুমার রায় প্রভৃতি।

সত্যজিৎ রায়ের গ্রন্থ সমূহ: সাহিত্যের আসরেও গল্পবলার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই সত্যজিৎ প্রশংসা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৯৬০ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সত্যজিৎ রায় তার পিতামহ ও পিতার প্রিয় ‘সন্দেশ’ পত্রিকা নতুন করে প্রকাশ শুরু করেন। সম্পাদনা ও অলঙ্করণের পাশাপাশি নিজেও লেখা শুরু করেন। এভাবেই একে একে সৃষ্টি হয় ফেলুদা, তপশে, জটায়ু, প্রফেসর শঙ্কুর মত বাঙালি শিশু–কিশোরদের প্রিয় কিছু সাহিত্য চরিত্র। ১৯৬৯ সালে বাদশাহী আংটি প্রকাশিত হয়। সেই থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত নয়না রহস্য তার সর্বশেষ বই প্রকাশিত হয়। এছাড়া সোনারকেল্লা, বানর রহস্য, জয়বাবা ফেলুনাথ, গোরস্থানে সাবধান, যত কান্ড কাঠমান্ডুতে, তারিণী খুড়োর কীর্তিকলাপ, দার্জিলিং, জমজমাট প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।

পুরস্কার ও অস্কার জয়: সাহিত্যিক হিসেবে অন্যান্য পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৬৭ সালে প্রফেসর শঙ্কু বছরের শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্য গ্রন্থরূপে একাডেমী পুরস্কার লাভ করে। চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ দেশের ও বিদেশের বহু পুরস্কার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি . লিট উপাধি লাভ করেন। বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম সম্মান এবং ইন্ডিয়া সরকারের ভারতরত্ন উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট সোয়া মিত কলকাতায় এসে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লেজিয় দ’নর স্বর্ণপদক প্রদান করেন। তিনি ১৯৯২ সালে তিনি চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বোচ্চ পুরস্কার অস্কার লাভ করেন।

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু: ১৯৯২ সালের ২৩শে এপ্রিল ৭১ বছর বয়সে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় কলকাতায় পরলোক গমন করেন।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading