প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব: অনন্য হাসান আরিফ

প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব: অনন্য হাসান আরিফ

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫

আর দরাজ কণ্ঠে শোনা যাবে না তার আবৃত্তি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে তার সরব উপস্থিতি আর চোখে পড়বে না। প্রায় চার মাস জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন বাংলাদেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ। এদেশের প্রায় সকল শিল্পীর সঙ্গে যার এক দারুণ আত্মার বন্ধন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা রাখা এই বরেণ্য শিল্পীকে নিয়ে লিখেছেন মিলন গাজী

প্রয়াত হাসান আরিফ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মধ্যমণি ছিলেন। তিনি শুধু একজন ভাল আবৃত্তিকারই ছিলেন না, ছিলেন চিন্তাশীল ও ভাল মননের অধিকারী এক ব্যক্তিত্ব। দেশপ্রেমেও ছিলেন অগ্রণীদের তালিকায়। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতেও তার অবস্থান ছিল সম্মুখ সারিতেই। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান ছিল তার। মানবতা বা মানব সেবাতেও স্থাপন করেছেন অনন্য নজির। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ তার মরণোত্তর দেহ দান। তিনি গবেষণার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার দেহ দান করে গেছেন। সংস্কৃতিজন হাসান আরিফের এই প্রয়াণে শোকে স্তব্ধ পুরো সংস্কৃতি অঙ্গন। এমন সৃষ্টিশীল প্রাণের চলে যাওয়ায় ব্যথিত ঘনিষ্ঠজনরা।


হাসান আরিফের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত হাসান আরিফ
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আবৃত্তি শিল্পী হাসান আরিফের মরদেহে শ্রদ্ধা জানিয়েছে সর্বস্তরের জনগণসহ বিশিষ্টজনরা। শনিবার (২ এপ্রিল) বেলা ১১ টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হলে সেখানে পর্যায়ক্রমে তারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এসময় উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ও নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

পরে দুপুর ১টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে জাতীয় পতাকা শোভিত শোকযাত্রাসহ হাসান আরিফের মরদেহ নেয়া হয় ঢাকা বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজা শেষে তার ইচ্ছা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগকে মরদেহ দান করা হয়।

মানবকল্যাণে দেহ দান করে গেছেন বরেণ্য এই আবৃত্তিশিল্পী
মৃত্যুর পর কবরকে শেষ ঠিকানা হিসেবে বেছে না নিয়ে মানবকল্যাণে দেহ দান করে গেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের হাসান আরিফ। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী এই আবৃত্তিশিল্পীর মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করে দেয়া হবে গবেষণার জন্য। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু গণমাধ্যমকে জানান, হাসান আরিফ মরণোত্তর দেহদান করে গেছেন।

শনিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে দেহ দানের প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে প্রয়াত এ শিল্পীর দেহ গ্রহণ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, হাসান আরিফ জীবিত থাকা অবস্থায় দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন। মৃত্যুর পরও তার দেহের মাধ্যমে দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি করব। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যে সেবা দেবেন তা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তার এ অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

ভবিষ্যতেও এ মহৎ কাজে যারা আগ্রহী হবেন তাদেরকে এ বিষয়ে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করবেন বলেও জানান উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

এ সময় হাসান আরিফের বোন রাবেয়া রওশন তুলি বলেন, আমি বোন হিসেবে, আইনগতভাবে অনেক বছর ধরে তার দায়িত্বপ্রাপ্ত। ওর দেহ সঠিকভাবে, সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে সবাই সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমি ও আমার পরিবার কৃতজ্ঞ।

মা রওশন আরা’র সাথে হাসান আরিফ

বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিক, উদারমনা সমাজকর্মীকে হারিয়েছে দেশ
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফের মৃত্যুতে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রয়াত হাসান আরিফ দেশের গণতান্ত্রিক, রাজনীতিকে অগ্রসর করা ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিবেদিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশবাসী একজন বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিক, উদারমনা সমাজকর্মীকে হারালো।

এতে আরও জানানো হয়, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হাসান আরিফ সামনের কাতারে থেকে অংশ নেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। বিবৃতিতে সাক্ষর করেন: নাজমুল হক প্রধান, মোস্তফা ফারুক, নুর আহমেদ বকুল, শফি আহমেদ, বজলুর রশিদ ফিরোজ, আখতার সোবহান মাশরুর, আমিনুল ইসলাম, মনসুরুল হাই সোহন, সুজাউদ্দিন জাফর, বেলাল চৌধুরী, মুখলেছউদ্দিন শাহীন, রাজু আহমেদ, সিরাজুমমূনীর , হারুন মাহমুদ, রেজাউল করিম শিল্পী, সালেহ আহমেদ, জায়েদ ইকবাল খান, কামাল হোসেন বাদল, বদরুল আলম প্রমুখ।

শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত হাসান আরিফ

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রেখেছিলেন সক্রিয় ভূমিকা
হাসান আরিফের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদসহ অনেকে। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, হাসান আরিফের চলে যাওয়া বাংলা আবৃত্তি জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সারা জীবন মানবতার জয়গান গেয়েছেন
হাসান আরিফ সারা জীবন মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি। হাসান আরিফের মৃত্যুতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবার্তায় শিক্ষামন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। শোকবার্তায় আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফের মৃত্যুতে শিক্ষামন্ত্রী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এই গুণী শিল্পী দেশমাতৃকার প্রয়োজনে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে অসংখ্য গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সারা জীবন মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করেছেন। মন্ত্রী শোকবার্তায় হাসান আরিফের কর্মময় জীবনের কথা স্মরণ করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

আবৃত্তি জগত এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল
বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি। শুক্রবার এক শোকবার্তায় প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, হাসান আরিফের মৃত্যুতে দেশ আবৃত্তি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, পথনাটক পরিষদ, গ্রাম থিয়েটার, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’, ঢাকা থিয়েটার, নাট্যদল বটতলা, কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, অনুস্বর, সাহিত্য একাডেমি-ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতেও তার অবস্থান ছিল সম্মুখ সারিতেই
আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন মাতিয়ে রেখেছিলেন হাসান আরিফ। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। নিজে আবৃত্তি করেন এবং সাংগঠনিক প্রশিক্ষণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতেও তার অবস্থান ছিল সম্মুখ সারিতেই। সেই চেনা মুখ, সেই চেনা কণ্ঠস্বর চিরতরে থেমে গেল।

আশির দশকে শুরু আবৃত্তি চর্চা
১৯৬৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার সাহেব বাড়িতে জন্ম নেওয়া হাসান আরিফ আবৃত্তি চর্চায় যুক্ত হন আশির দশকে। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। দেশে আবৃত্তিচর্চার বুনিয়াদ গঠন এবং প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতে হাসান আরিফের ছিলেন সক্রিয়।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading