পণ্য পরিবহণে চাঁদাবাজির খেসারত গোনে ক্রেতা

পণ্য পরিবহণে চাঁদাবাজির খেসারত গোনে ক্রেতা

আশিক এনতাজ রবি । বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১০:৩০

নিত্যপণ্য, বিশেষত কৃষিপণ্যের উচ্চমূল্যের রহস্য ভেদ করা গেছে। বস্তুত এক দুষ্টচক্রের কবলে পড়ে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে এবং এতে ঠকছেন উৎপাদনকারী কৃষক ও রাজধানীর খুচরা বাজারের সাধারণ ক্রেতা। এজন্য মূলত দায়ী পণ্য পরিবহণে পথে পথে চাঁদাবাজি। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, রাজশাহীর বানেশ্বর বাজার থেকে রাজধানীর কাওরানবাজার পর্যন্ত পণ্য পরিবহণে ট্রাকভাড়া ১৭ হাজার টাকা। কিন্তু দেখা গেছে, রাজশাহীর আমচত্বর, বেলপুকুরিয়া, নাটোর বাইপাস, এলেঙ্গা বাইপাস, টাঙ্গাইল বাইপাস, কাওরানবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।

বলা বাহুল্য, এই বাড়তি টাকার চাপ শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে হচ্ছে ভোক্তা শ্রেণিকে। ওদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এগুলো হচ্ছে-স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুতদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, বেপারি, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার ইত্যাদি। প্রতিটি ধাপেই পণ্যের মূল্য বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নামে-বেনামে চাঁদাবাজি। মহাসড়কে, টার্মিনালে, ফেরিঘাটে, নগরীর প্রবেশপথে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

সড়ক-মহাসড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক নানামুখী চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপণ্য ও তরিতরকারির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনসহ সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও দৃশ্যত কোনো সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। দামের এই পাগলা ঘোড়ার কবলে পড়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে নিমেষেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ, ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি, অব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি পণ্য হাতবদলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোগ্যপণ্যের বাজার দিন দিন অস্থির হয়ে উঠছে। এদিকে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। গতকাল বাণিজ্য সংগঠন বিল নিয়ে আলোচনার সময় তোপের মুখে পড়েন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বাজার নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্যরা। বিরোধীদলীয় সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এর মাসুল দিচ্ছে জনগণ।

ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, বিভিন্ন ফেরিঘাট, ওজন স্টেশন, বাজার কমিটি, পরিবহন সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়ন, ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, এমনকি থানাপুলিশের নামেও তোলা হচ্ছে চাঁদার টাকা। এই ১০ খাতে চাঁদাবাজির ফলে কৃষকের জমি থেকে উঠে আসার পর জায়গায় জায়গায় হাতবদল হতে হতে ক্রেতার কাছে পৌঁছতেই ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি ক্রেতাদের ওপর। সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে সেখানকার ব্যবসায়ী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলেও এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

কারওয়ানবাজারে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও চালক জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে আসার পর গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তায় মালামাল রেখে বিক্রি করলেও প্রতি বস্তার জন্য লাইনম্যানকে দিতে হয় ১০ টাকা করে। হাজার হাজার বস্তা থেকে কয়েক ঘণ্টায়ই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা। ট্রাক থামলে পুলিশ-নেতাদের নামে ১০০-১৫০ টাকা এবং বস্তাপ্রতি ১০ টাকা চাঁদা তোলেন লাইনম্যান খ্যাত ফজলুল হক, ফরমা মিজান, রনি, হামিদ, মিঠু, বিল্লাল হোসেন, আব্বাস, খোকন ও জাহাঙ্গীর। এদের এক একটি গ্রুপে চাঁদা তোলার কাজে নিয়োজিত আছেন আরও ৩ থেকে ৪ জন জুনিয়র লাইনম্যান। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মদদপুষ্ট হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে চাঁদা তুললেও তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান না ব্যবসায়ী-চালকরা।

পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি নিয়মিত ঘটনা হলেও বর্তমান সময়ে তা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। অথচ হাইওয়ে পুলিশ এই সত্য মানতে চাইছে না। আসলে এটাই সত্য যে, নানা ধরনের চাঁদাবাজের তালিকায় পুলিশের একাংশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ নিজেই যদি চাঁদা আদায় করে, তাহলে অন্য চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেবে কীভাবে? আমাদের শেষ কথা হলো, উৎপাদক অর্থাৎ কৃষক সমাজকে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পেতে হবে যেমন, তেমনি রাজধানীর সাধারণ ভোক্তা শ্রেণিও যাতে যৌক্তিক মূল্যে তা ক্রয় করতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী বা চাঁদাবাজদের কারণে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়বে, এটা হতে পারে ন। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আমরা।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading