সুদৃঢ় হোক সম্প্রীতির বন্ধন
আসাদ এফ রহমান । শুক্রবার, ৬ মে ২০২২ । আপডেট ১১:৩৫
সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে প্রীতিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে মানুষে মিল-মহব্বত। জাতি-গোষ্ঠীতে সংহতি ও সুসম্পর্ক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ বাংলাদেশে কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে সম্প্রীতির ওপর আঘাত আসবে তা কখনো কোনোদিন প্রকৃত ধার্মিক বাঙালি মেনে নেয়নি এবং নেবেও না। বাঙালির যে আবহমান কালের সংস্কৃতির ধারা তাতে প্রত্যেক ধর্মের মানুষের সহাবস্থান বিশ্বে অতুলনীয়। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মকে যেভাবে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করে তেমনি অন্য ধর্মকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। বাঙালির আচরণের এ এক বৈশিষ্ট্য। এটাই প্রকৃত ধার্মিকের লক্ষণ। এদেশে যখন মসজিদে আজান হয় বা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নামাজ পড়েন অন্য ধর্মের লোকরা তাদের মন্দিরের সাউন্ড বন্ধ করে দেয়, যাতে মুসল্লিদের নামাজের কোনো বিঘ্ন না ঘটে। আবার ইসলাম ধর্মের লোকরাও অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে। এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সেটা অন্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে কিনা জানা নেই। এটাই আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্র।
কোনো ধর্মই মানুষের অকল্যাণের কথা বলে না৷ পৃথিবীর সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে৷ তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কেউ যাতে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে৷ দেশের প্রতিটি মানুষকে যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় তাহলেও দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে৷ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সব রকমের রাজনৈতিক উস্কানি বন্ধ করতে হবে৷ আমরা যেন এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের পেছনে কখনো না লাগি৷ সবাই সবার ধর্মকে সম্মান করি৷
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে৷ শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে৷ এছাড়া দেশের প্রতিটি মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে একসঙ্গে কাজ করলে অসাম্প্রদায়িক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব৷ এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে৷ আরেকটি বিষয় হলো, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সকল ধর্মের সবাই মিলে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে৷ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে দেশের সর্বত্র সকল ধর্মের উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ সবাই যেন সবার ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশ নিতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ এছাড়া সবাই মিলে একটি দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারলে সাম্প্রদায়িকতাও দেশ থেকে দূর হবে৷ মানবতার কবি, অসাম্প্রদায়িক কবি কাজী নজরুল ইসলাম যিনি জাতি ধর্ম, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাইতো তিনি লিখেছেন, গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান।’ তিনি লিখেছিলেন ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
আমাদের এই দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ, এখানে কোনোরূপ সন্ত্রাস ও জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত কোনো অপশক্তির স্থান নেই। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্তই আমরা লক্ষ্য করে আসছি। আমরা আশা করব এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠি সবার মাঝে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন থাকবে অটুট-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ধর্মান্ধতার আবরণ থেকে বেরিয়ে প্রকৃত ধার্মিক হয়ে মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন করার জন্য সবার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। ধার্মিকতার চেতনায় গড়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। নিপাত যাক সাম্প্রদায়িকতা।
ইউডি/সুস্মিত

