অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
রহমান কবির চৌধুরী । শনিবার, ১৪ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৩৫
বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান আর ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিশেষভাবে সুখ্যাতি অর্জন করেছে সুন্দরবন। আমাদের উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষিত রেখে চলেছে, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা হতে বার বার দেশেকে রক্ষা করে চলা আমাদের এই অনন্য অসাধারণ সুন্দরবন অনবদ্য ও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রেখে চলেছে। সুন্দরবন কেবল মাত্র সৌন্দর্যের অধিকারী তা নয় এই বন সম্পদে পূর্ণতা পেয়েছে। বিশ্বের দেশে দেশে সুন্দরবনের অবস্থান এবং পরিচিতির শেষ নেই।
সুন্দরবন জাতীয় অহংকারের নাম। বিশ্বের এ বৃহত্তম বন প্রায় প্রতি বছর দেশকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব থেকে অনেকাংশে রক্ষা করে। সংরক্ষিত এ বনে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামের বাঘকুলের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর প্রজাতি। চিত্রল হরিণের সৌন্দর্যও দুনিয়ার সব হরিণকুলের সেরা। কিন্তু এ বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের দায়হীন মনোভাব বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ২৫ বছর ধরে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের পর সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর শুমারি হয়নি। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে। পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চোরা শিকারি, কাঠ পাচারকারী ও আগুন দস্যুদের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এ বনের প্রাণ-প্রকৃতি। নদী-খালে বিষ দিয়ে জেলেরা মাছ ধরায় মাছের পাশাপাশি প্রায়বিলুপ্ত ইরাবতীসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন জলজপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। দুই যুগের বেশি সময় ধরে বন্যপ্রাণী বাড়ছে নাকি কমছে তা-ও অজানা বন বিভাগের। অথচ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার জন্য হালনাগাদ সংখ্যা ও অবস্থা জানা যে খুবই জরুরি এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের। অথচ বন বিভাগ জানে না সুন্দরবনে কত বন্যপ্রাণী রয়েছে। এ ম্যানগ্রোভ বন নিয়ে কর্তৃপক্ষ সময়োপযোগী ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এক প্রজাতির বনমহিষ, দুই প্রজাতির গন্ডার, দুই প্রজাতির হরিণ, মিঠাপানি প্রজাতির কুমির, চিতাবাঘ ও চার প্রজাতির পাখি। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে বাঙালির গর্ব থাকলেও তার অস্তিত্ব বিপন্নপ্রায়। কিছু লোভী মানুষের কারণে বাঘের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে। গত ২১ বছরে অন্তত ৩৮টি বাঘের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। সুন্দরবন রক্ষায় এখন থেকেই সরকারকে সজাগ হতে হবে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে বেতন-ভাতা ভোগ করাকেই শুধু নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে না ভাবেন তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
সুন্দরবন থাকার কারণে আমরা সৌভাগ্যবান। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সুন্দরবনকে আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। কখনো উন্নয়নের নামে, আবার কখনো ব্যক্তি বা মুষ্টিমেয় দলগত স্বার্থের কারণে। জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবও মানুষের সৃষ্ট নানা কারণে সুন্দরবনে গাছপালা ও প্রাণিকুল হুমকির মুখে। অজ্ঞতা ও অবহেলা এবং সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলোর লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে অনেক গাছপালা ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। বারবার আগুন লেগে বনের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। এই আগুনের তীব্র তাপ পুড়ে যাওয়া এলাকার বাইরেরও বিস্তৃত এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে, বিপন্ন করে প্রাণিকুলকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু মানবসৃষ্ট দুর্যোগগুলো থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভকে সুরক্ষিত রাখার জন্য মনুষ্য সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
সুন্দরবন একদিকে যেমন বাংলাদেশের গর্ব অন্যদিকে বিশ্ব ঐতিহ্য বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশও বটে। গত ১২ বছরে এখানে অন্তত আগুন লেগেছে ১৪ বার, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৪৫ একর বনাঞ্চল। স্থানীয়ভাবে মাঠপর্যায়ে এর কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। চক্রটি শুকনো মৌসুমে বনে আগুন লাগিয়ে প্রশস্ত করে মাছ চাষের পথ। এর পাশাপাশি বনের জায়গা দখল করাও আরেকটি উদ্দেশ্য। কয়েক বছর ধরে এই অপকর্ম চলে এলেও এতদিন বন বিভাগ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি চোরাশিকারিদের বিষটোপ দিয়ে বা ফাঁদ পেতে বাঘ ও হরিণ শিকার তো চলছেই। তাই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। মানুষের হাতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন বিপন্ন হচ্ছে দিন দিন। ফলে হুমকির সম্মুখীন ব্যাঘ্র প্রজাতিসহ জীববৈচিত্র্য। সেই প্রেক্ষাপটে বাঘের সুরক্ষাসহ এর খাদ্যশৃঙ্খল চিতল হরিণ, বুনো শুয়োর ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক।
ইউডি/সুস্মিত

