মেসি-রোনালদোকে ছাপিয়ে: এমবাপে নাম্বার ওয়ান

মেসি-রোনালদোকে ছাপিয়ে: এমবাপে নাম্বার ওয়ান

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৩ মে ২০২২ । আপডেট ১৪:৩৫

ফুটবল বিশ্বে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তারকা কিলিয়ান এমবাপে। পিএসজিতে খেলা এই গোল মেশিনের দলবদল নিয়ে গত সপ্তাহ দুয়েক ধরেই উত্তেজনা ছিলো তুঙ্গে। আলোচনা প্রায় সেরেই নিয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এমবাপে নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি পিএসজিতেই থাকছেন। আর তার আচমকা সিদ্ধান্ত বদলের পেছনে কী কাজ করেছে তা নিয়েই চলছে এখন আলোচনা। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস

শেষ হয়েছে কিলিয়ান এমবাপের সম্ভাব্য দলবদল নিয়ে এক বছর ধরে চলা জল্পনা-কল্পনা, গুঞ্জন আর উড়ো খবরের পালা। আরও একবার ‘প্রিয় ক্লাব’ রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার সব পথ মাড়িয়েও শেষ পর্যন্ত ঘরের ছেলে ঘরেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমবাপেকে নিয়ে পিএসজি ও রিয়াল মাদ্রিদের দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী লড়াইয়ে গত কয়েক সপ্তাহেই পট পরিবর্তন হয়েছে কয়েক দফা। সবশেষে ড়শ শনিবার এর নাটকীয়তা পায় নতুন মাত্রা। দিনের শেষভাগ থেকে ইউরোপের গণমাধ্যমে আসতে শুরু করে এমবাপের সিদ্ধান্ত ‘বদলে যাওয়ার’ খবর। সেটাই আনুষ্ঠানিক রূপ পেল বাংলাদেশ সময় গত শনিবার মাঝরাতে। পিএসজির দেওয়া সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তায় এমবাপে জানালেন, প্যারিসেই থাকছেন তিনি।

পিএসজির সঙ্গেই থাকবেন ২০২৫ সাল পর্যন্ত: ওই ঘোষণার পরপরই লিগ ওয়ানে মৌসুমের শেষ ম্যাচে মেসের বিপক্ষে মাঠে নামে পিএসজি। নিজেদের আঙিনায় ম্যাচটি শুরুর আগে ক্লাব সভাপতি আল খেলাইফি ‘এমবাপে-২০২৫’ লেখা জার্সি হাতে হাসিমুখে জানান প্রিয় খেলোয়াড়ের নতুন চুক্তির খবর।আমি গর্বভরে আপনাদেরকে সুন্দর একটি খবর দিচ্ছি-কিলিয়ান এমবাপে পিএসজির সঙ্গে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নতুন চুক্তিতে সই করেছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক অবশ্য মনস্থির করতে পারছিলেন না। সংবাদমাধ্যমের খবর মতে, রিয়ালের সঙ্গে মৌখিকভাবে সমঝোতায়ও পৌঁছেছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের কাছে এমবাপে কখনোই যে পরিষ্কার ছিলেন না, তার আভাস মেলে কিছুদিন আগে। বলেন, পিএসজিতে থাকবেন নাকি চলে যাবেন, এখন সিদ্ধান্ত নেননি তিনি। তারপরও রিয়াল ছিল আত্মবিশ্বাসী। দলটির পক্ষ থেকে নানা সময়ে এর খেলোয়াড়দের মুখ থেকেও উচ্চারিত হয়েছে সেসব কথা। ২৩ বছর বয়সী সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তারকা ফরোয়ার্ড জানান তার সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, আমি জানাতে চাই যে পিএসজিতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্যই আমি খুব খুশি। আমার বিশ্বাস, এখানে এই ক্লাবে আমি আরও ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠব যে দলটি শীর্ষ পর্যায়ে ভালো করতে মরিয়া। একই সঙ্গে আমি ফ্রান্সে, যে দেশে জšে§ছি, বেড়ে উঠেছি এবং বিকশিত হয়েছি সেখানে খেলা চালিয়ে যেতে পেরেও অনেক খুশি।

পিএসজি লোগো

পিএসজি’র এমবাপেকে ধরে রাখা নিয়ে তদন্ত চায় লা লিগা: নীতির প্রশ্নে বেশ কড়া লা লিগা কর্তৃপক্ষ। নিজেদের লিগে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে সব নিয়ম-কানুন। আশা করে, ইউরোপের অন্য সব লিগ ও ক্লাব তা অনুসরণ করবে। তবে তারা নিশ্চিত, পিএসজি তা করছে না। আর তাই ধরে রাখতে পেরেছে সময়ের সেরা খেলোয়াড়দের একজন কিলিয়ান এমবাপেকে। এই চুক্তিতে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্পেনের শীর্ষ লিগ। তাদের কঠোর অবস্থানের জন্য ক্লাবের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে ধরে রাখতে পারেনি বার্সেলোনা। স্প্যানিশ ক্লাবটির মতো আর্থিক পরিস্থিতি অতটা খারাপ না হলেও টানা ক্ষতির মধ্েযই আছে পিএসজি। খেলোয়াড় ও স্টাফদের বেতন বেশ চড়া। এরপরও কীভাবে তারা এমবাপেকে ধরে রাখতে পারল সেই অঙ্ক মেলাতে পারছে না লা লিগা। তাই পিএসজির বিরুদ্ধে উয়েফা, ফ্রান্সের প্রশাসনিক ও কর কর্তৃপক্ষ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে যাচ্ছে লা লিগা কর্তৃপক্ষ। চুক্তির ব্যাপারে কোনো ধরনের তথ্য এখনও দেয়নি পিএসজি। তবে গণমাধ্যমে আসছে অবিশ্বাস্য সব সংখ্যার কথা। তাই বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নেয়নি লা লিগা। তাদের দাবি, পিএসজির এই অর্থের ঝংকার পুরো ইউরোপের ফুটবলের জন্যই হুমকি। গত মৌসুমের শেষে পাকাপাকিভাবে পিএসজিকে ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন এমবাপে। কিন্তু পিএসজি তাকে ছাড়তে ছিল নারাজ। স্পেনের সফলতম দল রিয়াল রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিতে প্রস্তুত থাকলেও মন বদলায়নি পিএসজি কর্মকর্তাদের।

লিওনেল মেসি

মেসি-রোনালদোর থেকেও বেশি বেতন এমবাপের: পিএসজির সঙ্গে এমবাপের তিন বছরের নতুন চুক্তির নেপথ্যে কী। প্রশ্ন সবার মনে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে যখন যাওয়ার পথ একেবারে তৈরি, তখন কীভাবে বিশ্বকাপ জয়ী ফরোয়ার্ডকে নতুন চুক্তিতে সই করাতে রাজি করালো পিএসজি? বলা যায়, নিজের দাম আরো বাড়িয়ে পিএসজিতে থেকে গেলেন এমবাপে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী এখন তিনিই ক্লাবের সর্বোচ্চ বেতনভুক্ত খেলোয়াড়। ২৩ বছর বয়সী এই তারকা এখন থেকে লিওনেল মেসি ও নেইমারের চেয়েও অনেক বেশি বেতন পাবেন। এছাড়া সাইনিং বোনাস হিসেবে ১০ কোটি ইউরো পাচ্ছেন তিনি। ক্লাব প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি বোর্ডরুম ও স্কোয়াড লেভেলেও আমূল পরিবর্তন আনতে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এরই প্রভাব পড়েছে স্পোর্টিং ডিরেক্টর লিওনার্দোর ভাগ্যে। তাকে বরখাস্ত করে এমবাপ্পের মোনাকো অধ্যায়ের সাফল্যের সঙ্গী লুইস কাম্পোসকে আনা হচ্ছে। তাছাড়া উন্নত স্পোর্টিং প্রজেক্টের ব্যাপারেও আশ্বস্ত করা হয়েছে এমবাপ্পেকে। গত মৌসুমে মেসি, সার্জিও রামোস, জিয়ানলুইজি দোনারুম্মা ও আশরাফ হাকিমির মতো তারকাদের দলে ভেড়ানোর ব্যাপারে লাগাম টানতে যাচ্ছে পিএসজি।

নেইমার

এমবাপের প্যারিসেই থেকে যাওয়ার নেপথ্যে ম্যাক্রোঁ: এমবাপেকে প্যারিসে রাখার নেপথ্যে কাজ করেছেন আরেকজন- ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুলে ম্যাক্রোঁ। গত কয়েক মাস ধরে টেলিফোনে পিএসজি ফরোয়ার্ডের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তাকে বুঝিয়েছেন যে, তার প্যারিসেই থেকে যাওয়া ভালো কারণ তিনি এই শহরের আইকন। ২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান। ম্যাক্রোঁ এমবাপেকে আরো বুঝিয়েছেন যে তিনি পরের প্রজন্মের কাছে একজন রোল মডেল। নিজের মাতৃভূমিতে ক্যারিয়ার চালিয়ে গেলে অনেক সুযোগসুবিধা পাবেন। তাছাড়া ক্লাবটির প্রতি এমবাপ্পের ভালোবাসাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ক্লাবটির সর্বকালের সেরা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার। পিএসজির সর্বকালের রেকর্ড গোলদাতা এডিনসন কাভানির চেয়ে ২৯ গোল পেছনে ১৭১ গোলের মালিক।

সপ্তাহে ১১ কোটি টাকা পারিশ্রমিক পাবেন এমবাপে!: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তি অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে ১ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড (প্রায় ১১ কোটি টাকা) পারিশ্রমিক পাবেন এমবাপে। সপ্তাহে ১ মিলিয়ন পাউন্ড পারিশ্রমিক হলে, বছরে এমবাপের মোট পারিশ্রমিক দাঁড়াচ্ছে ৫২ মিলিয়ন পাউন্ড (৫৭২ কোটি টাকা)। যা এমবাপেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ফুটবলারে পরিণত করেছে। যদিও, এমবাপের সে সামর্থ্যও রয়েছে। নতুন চুক্তির দিনেই হ্যাটট্রিক করে পিএসজির প্রত্যাশা পূরণ করার পথে হাঁটতে শুরু করেছেন তিনি। শুধু পারিশ্রমিক আর সাইনিং বোনাসই নয়, পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তিতে এমবাপের আরও অর্থযোগ রয়েছে। এমবাপের ইমেজ রাইটস ছেড়ে দিয়েছে ক্লাবটি। সঙ্গে গোল করলে, ব্যালন ডি’অর পেলে বা সেরা তিনে নাম থাকলে এবং সর্বোপরি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারলেও উচ্চহারে বোনাসের ব্যবস্থা রয়েছে এমবাপের জন্য। প্রসঙ্গত, গত বছরই এমবাপেকে কিনতে চেয়েছিল রিয়াল। তখনও এক বছর চুক্তি বাকি থাকায় পিএসজিকে ট্রান্সফার ফি হিসেবে ২৩০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২ হাজার ১২৬ কোটি টাকা) দিতে চেয়েছিল রিয়াল। সে সঙ্গে এমবাপের সঙ্গে ট্যাক্স ফি ছাড়া বাৎসরিক ২০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২১৯ কোটি টাকা) পারিশ্রমিক দিতে চেয়েছিল তারা। চুক্তি সাক্ষরের সময় দিতে চেয়েছিল ১১০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা) বোনাস দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তখন ব্যাটে-বলে মিলেনি বলে এমবাপের আর পিএসজি ছেড়ে রিয়ালে আসা হয়নি।

২০২৫ সালের চুক্তির স্মারক জার্সিসহ ক্লাবকর্তার সঙ্গে এমবাপে

মেসির জন্যই কী থেকে গেলেন এমবাপে!: রিয়াল মাদ্রিদকে ফিরিয়ে দিয়ে কেন পিএসজিতে থেকে গেলেন কিলিয়ান এমবাপে? এই প্রশ্ন এখন কমবেশি সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। শুধুই কী অবিশ্বাস্য আর্থিক প্রণোদনার লোভেই ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের ডেরায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি! ফরাসি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমবাপে কিন্তু বলছেন ভিন্ন কথা। এমবাপে সরাসরি বলেছেন, বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। বরং লিওনেল মেসির সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগির বিষয়টিই নাকি তার নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। শীর্ষ ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে’কিপের সঙ্গে আলাপচারিতায় পিএসজির সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনে মেসি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এমবাপে বলেন, ‘মেসি? মেসির সঙ্গে খেলার সুযোগ তো আর প্রতিদিন ধরা দেয় না। সে ইতিহাসের সেরা (ফুটবলার) এবং আমার চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এটাও (মেসির সঙ্গে খেলার সুযোগ) একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ মে ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

চুক্তি সেরে মাঠে নেমেই হ্যাটট্রিক: পিএসজির সঙ্গেই আরও ৩ বছরের চুক্তি করার পরের ম্যাচি তেই ফরাসি ফরোয়ার্ড রাঙিয়েছেন হ্যাটট্রিক করে। লিগ শিরোপা আগেই নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় পিএসজির কাছে এই ম্যাচ ছিল শুধু নিয়মরক্ষার। কিন্তু প্রতিপক্ষ মেঁতের জন্য ছিল লিগে টিকে থাকার লড়াই। সেই লড়াইয়ে মেঁতে হেরেছে ৫-০ ব্যবধানে। সদ্য চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা এমবাপে করেছেন দারুণ এক হ্যাটট্রিক। একটি করে গোল করেছেন নেইমার জুনিয়র ও পিএসজির জার্সিতে বিদায়ী ম্যাচ খেলতে নামা আনহেল দি মারিয়া। আর তাতেই অবনমন হল মেঁতের। ম্যাচ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে ঘোষণা আসে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পিএসজিতেই থাকছেন এমবাপ্পে। নতুন করে তিন বছরের চুক্তি করেছে দুই পক্ষ। নতুন চুক্তির পর মাঠে যেন জ্বলে উঠলেন এমবাপে। ২৪, ২৮ ও ৫০ মিনিটে তিন গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করেন ২৩ বছর বয়সী এই ফুটবলার। মাঝে ৩১ মিনিটে একবার বল জালে পাঠান নেইমার এবং ৬৭ মিনিটে আনহেল দি মারিয়া। বিদায়ী ম্যাচটা গোল করেই রাঙালেন আর্জেন্টাইন প্লে-মেকার।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply