কিশোর অপরাধপ্রবণতার দ্রুত প্রতিকার হওয়া উচিত
মুনতাসির আহমেদ । মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
বর্তমানে শিশু, কিশোর, নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী সব শ্রেণির মধ্যে গ্রাম ও শহরে এতটাই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে যে, রীতিমতো উদ্বেগজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম-শহর সর্বত্রই যেন অপরাধের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিশোর অপরাধ রীতিমতো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে এসেছে। কিশোররা দলবদ্ধ হয়ে নানা কায়দা ও কৌশলে নানা রকমের অপরাধ করে চলেছে এবং নিজেদের কিশোর গ্যাং বলে পরিচয় দিয়ে নানা রকমের অপরাধ চক্র গড়ে তুলেছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে প্রায় এক বছর হলো শিশু-কিশোররা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। তাদের অনেকে এক ধরনের গৃহবন্দি জীবনযাপন করছে। এর মধ্যে কোনো কোনো কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এতটাই বেড়ে গেছে-মনে হয় আমরা যেন আদিম ও বর্বর যুগে চলে গেছি।
কিশোররা যেন স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়েছে পড়েছে। তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে এমন পর্যায়ে চলে গেছে। এর বিপরীতে পরিবার সমাজ যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু মানুষ সামাজিক জীব। জন্ম থেকেই একটি শিশু পরিবারের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠে প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় তার মন-মানসিকতা গড়ে ওঠে। প্রতিটি পরিবার শিশুর সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে কি না, সেটাও একটি শিশুর জীবন গড়ে ওঠার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। একটি শিশুর খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, নিরাপত্তা যথাযোগ্য পরামর্শ এবং পরিবরের আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা শিশুর মন অনেকখানিই প্রভাবিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা ও চিন্তাভাবনা পরিবারের অবস্থা ও পরিবেশের ওপরই নির্ভর করে। আমাদের দেশে সব পরিবারই শিশু-কিশোরদের মৌলিক ও ন্যায়সংগত চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ করতে পারছে, এমনটি বলা যাবে না। পরিবার ও প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও শিশু-কিশোরদের আরও কিছু চাহিদা আছে, যা পূরণ করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার বাইরেও আরও অনেক শিক্ষা রয়েছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নে সাহায্য করে। এর মধ্যে খেলাধুলা ও গল্পের বই পড়া উত্তম মাধ্যম। শহরাঞ্চলে খেলার মাঠের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
আজকাল প্রায় প্রত্যেক মানুষের হাতেই মোবাইল ফোন দেখা যায়। শিশু-কিশোরদের হাতেও মোবাইল ফোন দেখা যায়। তারা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অযথা মোবাইল ফোনে কথা বলে সময় নষ্ট করে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে গভীর রাত পর্যন্ত নানারকমের পর্নো ছবি দেখে থাকে। টিভি-সিনেমায়, খবরের কাগজেও মারদাঙ্গা নোংরা ও অশ্লীল ছবি দেখে থাকে। এ কারণে কিশোর মনে মদ্যপান, হত্যা, খুন, শিশু ও নারী নির্যাতনসহ নানারকমের অপরাধপ্রবণতা জেগে ওঠে এবং তারা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে ওঠে। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সব পরিবারের শিশু-কিশোরদের মধ্যেই এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা দেখা যায়।
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। বস্তি এলাকার নারী-পুরুষ অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নানারকম কাজ করে জীবিকানির্বাহ করে। এ সময় তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ঘরে থাকে। মা-বাবার অনুপস্থিতিতে এদের অনেকে পথেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। এ সুযোগে বাজে প্রকৃতির লোকেরা কিশোর-শিশুদের যৌন নির্যাতন করে থাকে। এ ধরনের ঘটনা আজকাল অহরহ ঘটছে। যেসব কিশোর অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়, তাদের কিশোর অপরাধ সংশোধনাগারে নিয়ে অভিজ্ঞ সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শক্রমে সংশোধনের ব্যবস্থা করা দরকার। বর্তমানে কিশোর গ্যাংগুলো ভয়ংকর অবস্থায় উপনীত হয়েছে; তাই কালক্ষেপণ না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। অনেক সময় কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালে দেহ ও আচরণে পরিবর্তন এসে যায়। তাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যায়। এদের অনেকেই উগ্র ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে থাকে। এ সমাজে মনোবিজ্ঞানীরা পত্রপত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে আলোচনার মাধ্যমে পরিবার ও অভিভাবকদের শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করতে হবে, তা বুঝিয়ে দিতে পারে।
লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

