পরিবেশ রক্ষায় বন্ধ করতে হবে তামাক চাষ

পরিবেশ রক্ষায় বন্ধ করতে হবে তামাক চাষ

ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার । শুক্রবার , ০৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৩০

জানেন কি বিশ্বে প্রতি বছর আট মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তামাক গ্রহণের কারণে মারা যায়। এর মধ্যে সাত মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা যায় সরাসরি তামাক গ্রহণের ফলে এবং প্রায় ১.২ মিলিয়ন অধূমপায়ীর করুণ মৃত্যু হয় ধূমপায়ীদের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসার কারণে। জেনে অবাক হবেন ১.৩ বিলিয়ন তামাক ব্যবহারকারীর মধ্যে ৮০ শতাংশ এরও বেশি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের অধিবাসী ।

মাদকসেবীদের যেমন নেশাগ্রস্ত হিসেবে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, ধূমপায়ী এবং তামাক ও গুল গ্রহণকারীদেরও তেমনি নেশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যানের ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে উন্মুক্ত স্থানে ধূমপায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে- এভাবেই তামাকের হাত থেকে মুক্তির সম্ভাব্য উপায় বাতলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তামাকের মাঠগুলো ভরে উঠবে সবুজ ফসলে। আর একটি শিশুও নিকোটিনের প্রভাবে অসুস্থ হবে না- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের চাষ বেশি হওয়ায় সেখানে পরিস্থিতি বেশি বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য প্রচারের পরিচালক ডা. রুডিগার ক্রেচ বলেছেন, আপনি প্রতিবার ধূমপানে আক্ষরিক অর্থে এমন সম্পদ পুড়িয়ে দিচ্ছেন যা ইতোধ্যে দুষ্প্রাপ্য, এমন সম্পদ পুড়িয়ে দিচ্ছেন যেখানে আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে’। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে তামাক চাষের জন্য ৩.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি ধ্বংস হয়।

তামাক উৎপাদনের জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বে বন উজাড় হচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অন্যান্য গাছের জন্য বা ফসলের জন্য মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে যেমন বন উজাড় হয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ক্ষরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যদিকে ফসলি জমি কমে যাওয়ায় খাদ্য শস্যের উৎপাদন হ্রাস হওয়ায় পৃথিবীতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। তামাকের পরিবেশগত প্রভাব এমন দেশগুলোর ওপর পড়ে যারা এটি মোকাবিলায় অক্ষম আর তামাক থেকে প্রাপ্ত মুনাফা নিয়ে যায় উচ্চ আয়ের দেশে অবস্থিত তামাক কোম্পানিগুলো।
তামাক যে শুধু পরিবেশ বিপর্যয়ে অবদান রাখছে তাই নয়। তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকিও ব্যাপক। ফুসফুস ক্যানসারের প্রায় ৮০ শতাংশ ধূমপানের কারণে হয়।
এছাড়া মুখ, স্বরতন্ত্র, গলা, খাদ্যনালী, কিডনি, সার্ভিক্স, যকৃত, মূত্রাশয়, অগ্নাশয়, পেট ও মলদ্বার ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া তীব্র লিউকোমিয়ার ঝুঁকিও বাড়ায় তামাকের ব্যবহার। এখন পর্যন্ত সিওপিডির প্রধান কারণ ধূমপান। সিওপিডিতে ফুসফুসের নালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়। এর কোনো নিরাময় নেই ওষুধে কিছুটা উপসম হয় মাত্র। সময়ের সাথে সাথে সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করে নিউমোনিয়া হতে পারে।

২০১৮ সালে তামাকজনিত রোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১২৬,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়, যা ছিল মোট মৃত্যুর১৩.৫ শতাংশ। প্রায় ১.৫ মিলিয়ন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাকের প্রভাবে সরাসরি অক্রান্ত হয়েছিল এবং প্রায় ৬১০০০ শিশু পরোক্ষ অক্রমণের শিকার হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা বাবদ দেশে ৩০৫.৬ বিলিয়ন টাকা খরচ হয়।

শুধু স্বাস্থ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে নয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তামাক সেবন হ্রাস করাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তামাকজাত দ্রব্যের বর্জ্যের পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য উৎপাদককে দায়ী করার বিদ্যমান স্কিমগুলো বাস্তবায়ন ও শক্তিশালী করাসহ আইন প্রণয়ন বাড়ানো উচিত।

মাদকসেবীদের যেমন নেশাগ্রস্ত হিসেবে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, ধূমপায়ী এবং তামাক ও গুল গ্রহণকারীদেরও তেমনি নেশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যানের ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে উন্মুক্ত স্থানে ধূমপায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে- এভাবেই তামাকের হাত থেকে মুক্তির সম্ভাব্য উপায় বাতলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তামাকের মাঠগুলো ভরে উঠবে সবুজ ফসলে। আর একটি শিশুও নিকোটিনের প্রভাবে অসুস্থ হবে না- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সিইও, এমিনেন্স এসোসিয়েট ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading