গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি: এভাবে আর কত দিন
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৪ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫
ঢাকা নগরীতে চলাচলে মানুষের অন্যতম বাহন গণপরিবহন। নারীরা এই গণপরিবহন চলতে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন হরহামেশাই। ঢাকা শহরে গত ছয়মাসে ৪৬.৫ নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। যা আগামীর জন্য ও নারীর সুরক্ষায় অশানি সংকেত। দ্রুতই রুখতে হবে এই ধরনের অপরাধ। গণপরিবহনে যৌন হয়রানি ও তার প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিলন গাজী।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণপরিবহনের নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলছে। বয়সে ছোট কিংবা বড়, প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেকেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় বাসের চালক, হেলপার বা তাদের সহযোগিরা সরাসরি জড়িত। প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় বলে গণপরিবহনে যাতায়াত বাংলাদেশের নারীদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়৷ চিমটি কাটা, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, চুল বা শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ গণপরিবহনে নিয়মিত ঘটনা।
যৌন হয়রানির শিকার ৪৬ শতাংশ
ঢাকা শহরে গত ছয়মাসে ৬৩.৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী গণপরিবহনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬.৫ নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। হয়রানকারীদের ৬১ শতাংশই মধ্যবয়স্ক পুরুষ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আঁচল’ পরিচালিত এক জরিপে এ সব তথ্য উঠে আসে। ঢাকা শহরের গণপরিবহনে নারীরা কোন ধরনের হয়রানির শিকার হয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব পর্যালোচনায় জরিপটি পরিচালনা করে আঁচল ফাউন্ডেশন। জরিপে ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৮০৫ জন নারী অংশগ্রহণ করেন। এতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, যা ৮৬.০৯ শতাংশ।
আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত জরিপের উপাত্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গত ছয় মাসে ৬৩.৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী গণপরিবহনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে ৪৬.৫ শতাংশ বলেছেন তাদেরকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ১৫.৩ শতাংশ বুলিং, ১৫.২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য, ১৪.৯ শতাংশ লিঙ্গ বৈষম্য এবং ৮.২ শতাংশ বডি শেমিং-এর মতো হয়রানির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। জরিপে গণপরিবহনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। এদের মধ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের ৭৫ শতাংশ নারী অন্যযাত্রীদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ২০.৪ শতাংশের ক্ষেত্রে হেল্পার কর্তৃক এ ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এছাড়াও ৩ শতাংশ হকারের মাধ্যমে এবং ১.৬ শতাংশ ড্রাইভারের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
হয়রানি বেশি মধ্যবয়সী পুরুষের হাতে
গণপরিবহনকে অনিরাপদ করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক সাধারণ যাত্রীরা। সমীক্ষা বলছে, এসব হয়রানির বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আছেন চল্লিশ থেকে ঊনষাট বছর বয়সী মধ্যবয়সী পুরুষ। সমীক্ষায় ‘কারা বেশি যৌন হয়রানি করছে’—এমন প্রশ্নের উত্তরে ৬১.৭ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী জানিয়েছেন, তারা চল্লিশ থেকে ঊনষাট বছর বয়সীদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, ৩৬.৩ শতাংশ জানিয়েছেন যে, তারা কিশোর ও যুবক অর্থাৎ তেরো থেকে ঊনচল্লিশ বছর বয়সীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যে
সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায়, ২১.২ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী গণপরিবহন ব্যবহারের সময় যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কারণে পরে ট্রমাটাইজড হয়েছেন। ২৯.৪ শতাংশের মনে গণপরিবহন ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৬.৪ শতাংশ ভুগছেন হীনম্মন্যতায় ও ১৩.৮ শতাংশ বিষণ্ণতায়।
গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. ইসমাইল হোসাইন বলেন, ‘আঁচল ফাউন্ডেশন এর এই জরিপের মধ্যে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এই সামাজিক সমস্যাকে পুরোপুরি মোকাবিলা করতে হলে আমদের নৈতিকতাকে ঠিক করতে হবে, আমাদেরকে সামাজিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং আইনের সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আজকের এই সমীক্ষার ফলাফল নারীদের প্রতি আমাদের সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এই সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে আমাদের মনোজাগতিক পরিবর্তন আনয়ন জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া নারীর সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’
নারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যাচ্ছে সেসব উদ্যোগ। এমতাবস্থায় ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ নামের সামাজিক ক্যাম্পেইন বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে বাসে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে পুনরায় হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবাদী নারীকেই ‘টার্গেট’ করার এই প্রবণতাকে ভয়াবহ হিসাবে বর্ণনা করেছেন নারী অধিকার কর্মী খুশী কবির। বিশ্বব্যাপী ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ ক্যাম্পেইনের এই সমন্বয়ক বলেন, ‘‘পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সকল নারীই হয়রানির শিকার হয়েছে। একশ ভাগ, আমি বলব। প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নিপীড়নের শিকার হতে হয় এবং ধর্ষণের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলোতে। সেটা কিন্তু ভয়াবহ অবস্থা।”
যৌন হয়রানির প্রতিকার
গণপরিবহনে যৌন হয়রানি বন্ধে প্রথমেই দরকার সচেতনতা ও ধর্মীয় সুশাসন। পারিবারিক শিক্ষা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা পালন করতে পারে। শিশু বয়সেই ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলকে এর ভয়াবহতা ও কুফল বোঝানো যেতে পারে। এছাড়া দেশের প্রচলিত আইনের যথাযথ বাস্তবায়নও জরুরি।
প্রতিরোধে তাৎক্ষনিক করণীয়
বাসে যৌন হয়রানির শিকার হলে তারা কী করেন এমন প্রশ্নের একটি অনলাইন সার্ভেতে জানা যায়, বাসে যৌন হয়রানির শিকার হলে ৮১% চুপ করে থাকেন অথবা নীরবে তা সহ্য করেন এবং ৭৯ শতাংশ বলেছেন তারা আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সরে যান। অথবা না দেখার বা বুঝার ভান করে থাকেন।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯
৯৯৯ জরুরি সেবা বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত একটি জরুরি কল সেন্টার। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘন্টা চালু রয়েছে এ সেবা। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো ব্যক্তি ৯৯৯-এ কল করার মাধ্যমে জরুরি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। চলন্ত গাড়িতে যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হলে সেই মুহূর্তেই ৯৯৯ নম্বরে কল করে অভিযোগ করতে পারবেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে সহায়তা প্রদান করা হয় টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯ থেকে। কেউ গণপরিবহন অথবা বাসে যাতায়াত কালে নির্যাতনের শিকার হলে এখানে জানাতে পারেন।
সুরক্ষা অ্যাপ ‘বাঁচাও’
‘বাঁচাও’ অ্যাপ মূলত স্মার্ট ফোনের একটি অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে একজন নারী তার বিপদের সময় ‘বাঁচাও’ অ্যাপস ব্যবহারকারী সবার সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। এক ক্লিকেই সাহায্য চাওয়া নারীর কাছাকাছি পরিবার, বন্ধু, স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশের কাছে চলে যাবে বার্তা। জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাহয্য চাওয়া নারীর অবস্থান নির্দেশ করবে। এক্ষেত্রে তার নম্বর গোপন রেখে টেক্সট বা অডিও কলেও করা যাবে যোগাযোগ।
ভ্রাম্যমাণ আদালত
আশপাশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি অবগত করা যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত যদি হাতেনাতে প্রমাণ পান, তাহলে ঘটনাস্থলেই শাস্তি আরোপ করতে পারবেন।

হয়রানি প্রতিরোধে ১০ দফা প্রস্তাব আঁচলের
গণপরিবহন নিরাপদ করতে আঁচল ফাউন্ডেশন কয়েকটি প্রস্তাব রেখেছে। গণপরিবহনে সিট সংখ্যার বেশি যেন যাত্রী না তোলার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে বাস স্টাফসহ যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা, প্রতিটি বাসে সিটের পাশে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক বিভিন্ন লিফলেট লাগানো, সময় ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাসে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা জরুরিভিত্তিতে বাড়ানো, নারীদের জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা করা, বাসের হেল্পার, সুপারভাইজার ও চালকদের পরিচয় উল্লেখপূর্বক নেমপ্লেট বাধ্যতামূলক করা, বাসে নিপীড়নের ঘটনায় সেই বাসের স্টাফদের দায়ভার নেওয়ার বিধান প্রণয়ন করা, নিপীড়িত নারীর প্রতিবাদে কেউ আক্রমণাত্মক হলে তাকে শক্তভাবে প্রতিহত করার ব্যবস্থা নেওয়া, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা; প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিচার নিশ্চিত করা, এবং বাসের হেলপার সুপারভাইজার ও চালকদের জন্য বিশেষ কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন বিরোধী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করে সংগঠনটি।
রাজধানীতে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হায়রানি প্রতিরোধ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের শিক্ষক ড. ফাহমিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগ নেই। পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকেই সচেতনতা শুরু করা প্রয়োজন। নারীদের সেলফ ডিফেন্সের শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। এতে মনোবল বাড়বে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের সমন্বয় করে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারেন। যারা এসব যৌন হয়রানিমূলক ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের কাউন্সেলিংয়ের আওতায় নিয়ে আসলে সুফল পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি।’
নারীরা যেখানে ঘর ও কর্মক্ষেত্রের বাইরে গণপরিবহনে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানে দিন দিন ক্রমবর্ধমান হারে গণপরিবহনে নারী হয়রানির ঘটনা এভাবে বাড়তে থাকলে একসময় নারী নিরাপত্তা সম্পূর্ণ হুমকির মুখে পড়বে, যা একটা দেশের সুশাসনের মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই গণপরিবহনে নারী নির্যাতনের এমন বিপজ্জনক পরিসংখ্যানকে দ্রুত অনুকূল বা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য এ বিষয়ে দেশের দায়িত্বশীল সবার এগিয়ে আসা সময়ের দাবি।
ইউডি/অনিক

