অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে দেশ
জুলহাস হায়দার । রবিবার, ০৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৫:১৫
দেশের বহুল প্রত্যাশিত চার মেগা প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে শুরু করেছিল বর্তমান সরকার। একটির কাজ শেষ। বাকি তিনটির কাজ প্রায় শেষের দিকে। ২৫ জুন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু। এরপর পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত হবে মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও কর্ণফুলী টানেল। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন হবে আগামী অক্টোবরে। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে চালু হবে ঢাকাবাসীর কাঙ্ক্ষিত মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যেই জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে এই তিন মেগা প্রকল্প। চার মেগা প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্পে নতুন এডিপিতে বরাদ্দের চাপ কমছে, তবে বাড়ছে অন্য দুটিতে।
পদ্মা সেতু একটি স্বপ্ন, এটি অপার সম্ভাবনার নাম। একটি দেশের মর্যাদার ও অহঙ্কারের প্রতীক, অর্থনীতির নতুন সোপান। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এই পদ্মা সেতু। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে আগামী ২৫ জুন যানবাহন চলাচলের জন্য পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। ওইদিন সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধন করবেন। তবে পদ্মা সেতুর নাম পদ্মা নদীর নামে হয়েছে এবং ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগামী ২৫ জুন যান চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হবে.
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ জানে, ফেরি পাড়ি দিয়ে পদ্মা পার হওয়া ভয়ংকর এক অস্বস্তিকর ও দীর্ঘ ভোগান্তির কাজ। এর মধ্যে যথেষ্ট বিড়ম্বনা ও ঝুঁকিও রয়েছে। এর ফলে ৭-৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা লেগে যায়। প্রতিদিনই এই ধরনের অমানবিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। আর এটা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ যেভাবে যাতায়াত সুবিধা ভোগ করতে পারছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সেভাবে পারছে না। এবার তাদের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো হবে এ পদ্মা সেতু। যা অত্যাধুনিক স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর কাজ শেষ করেছে। সরকারের এই উদ্যোগ আজ সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের স্বাবলম্বিতার প্রতীক। এটি আমাদের ঐক্য ও অটল মনোবলের স্মারক। আমরাও নিজের প্রচেষ্টায় বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিতে পারি, এটা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এখানে উলেস্নখ করা দরকার, চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ রূপে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার কর্ণফুলী টানেলের মতো চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পটি গ্রহণ করে। সরকারের গৃহীত ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং। কেননা, নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে এ টানেল। আশা-নিরাশার দোলাচল থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দূরদর্শিতা ও সাহসিকতায় শুধু দেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম নির্মিত হতে যাচ্ছে এ টানেল, যার নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। দেশের জন্য এটি প্রথমত গর্বের। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি মাইলফলক। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে এ টানেল প্রকল্পের সমীক্ষা হয় ২০১৩ সালে।
অন্যদিকে রাজধানীতে যত সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে যানজট সমস্যা অন্যতম। এর ফলে নগরবাসীর কেবল কর্মঘণ্টাই নষ্ট হয় না, তাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। পবিত্র রমজানেও যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটিয়ে দিতে হয় নগরবাসীকে। যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীতে নির্মাণ করা হয়েছে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে প্রকল্প ও মেট্রোরেলের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। যানজট নিরসনে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে ও মেট্রোরেল। মেট্রোরেল উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। মেট্রোরেল পুরোপুরি বিদ্যুৎচালিত রেল। বাংলাদেশে এই প্রথম বিদ্যুৎচালিত কোনো রেল চালু হতে যাচ্ছে। মেট্রোরেলের কাজ ৮৬ ভাগ শেষ হয়েছে।
হযাত্রাবাড়ী পর্যন্ত চার লেনের এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের মূল লেনের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত দৈর্ঘ্য সাড়ে ১১ কিলোমিটার। এ অংশটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে খুলে দেয়া হবে। এছাড়াও সরকার পাতাল রেল করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগ কমাতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চার মেগা প্রকল্প দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের মাইলফলক। দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে আনবে বলে আমাদের বিশ্বাস। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব যে সত্যি সত্যিই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে, পদ্মা সেতুসহ অন্য তিন বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক তার আপন মহিমা নিয়ে।
ইউডি/সুস্মিত

