প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ অপরিহার্য
শরীফুল ইসলাম সরদার । রবিবার, ০৫ জুন ২০২২ । আপডেট ১৯:০৫
শিক্ষা ছাড়া মানুষ ও জাতি অচল। শিক্ষার প্রাথমিক এবং মৌলিক ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, যেখান থেকে মানুষের শিক্ষাজীবন শুরু। আর এই শুরুর ক্ষেত্রে যদি ভিত শক্ত না হয় তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় অন্ধকার নেমে আসবে, এটাই স্বাভাবিক এবং চিরন্তন। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা কী দেখছি? সম্প্রতি প্রাথমিক স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরও সে হারে শিক্ষার্থী বাড়ছে না, বরং দিনদিন কমে আসছে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার প্রারম্ভে এর ঘাটতির বিষয়গুলো আগে তুলে আনা প্রয়োজন। নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের এ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। তবে সে সমস্যা অনেকাংশেই সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, প্রান্তিক পর্যায়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অভিভাবকদের মাঝে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে শিক্ষকসংকট, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে শিক্ষার্থী সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে প্রাথমিক স্তরে ঝড়ে-পড়া অনেকটাই রোধ হয়েছে। কিন্তু এ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নানা সমস্যা।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমানে রয়েছে বিভিন্ন ধারা। এর মধ্যে অন্যতম হলো কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। আবার মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে বিভিন্ন ধাঁচের। সম্প্রতি করোনাকালে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক স্কুল থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের অনিহার কারণে প্রতিদিনই শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। কেন এভাবে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে, এদিকে সরকারের নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে সরকারকে। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ, যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও শিক্ষায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এদের মধ্যে অন্যতম। প্রচুর পরিমাণে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের পরও শিক্ষাব্যবস্থা মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি কেন?
প্রথমেই আসা যাক শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে। সরকার প্রতিনিয়তই শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হলে প্রয়োজন শিক্ষকদের একটি ভালো মানের বেতনব্যবস্থা। প্রশ্ন হলো, সেটি আমরা দিতে পারছি কিনা। ২০১৯ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, নিয়োগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিধিমালা অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিরূপণ করা হয়েছে স্নাতক বা সমমান এবং বেতন গ্রেড ১৩তম ( ১১০০০-২৬৫৯০) এবং প্রধান শিক্ষকরা একই শিক্ষাগত যোগ্যতা সাপেক্ষে (৬৫% পদোন্নতি ও ৩৫% সরাসরি) নিয়োগের মাধ্যমে ১০ (১৬০০০-৩৮৬৪০) গ্রেড প্রাপ্য হবেন। সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে (মহিলা ৬০%, পোষ্য ২০% ও অবশিষ্ট ২০% পুরুষ) কোটার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বেতন স্কেলে আদৌ ভালো মানের শিক্ষককে আমরা এ পেশায় আকৃষ্ট করতে পারবো কি? শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হলে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ব্যতীত শিক্ষার পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষকদের মানোন্নয়ন বলতে আমরা সাধারণত বুঝি আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মান বৃদ্ধি। কোনটাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্জিত হচ্ছে না।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক কম মেধাবীরাই কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করছেন। তারপরও মোটা অংকের ফি এবং বেতন দিয়ে কিন্ডারগার্টেনে পাঠাচ্ছি আমাদের সন্তানদের। তৃতীয়ত হচ্ছে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। এই কমিটি থেকে শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে কী পাচ্ছে তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। এসব কমিটি ব্যবস্থাপনা বাতিল নতুবা সময়োপোযোগী করা একান্ত অপরিহার্য। শুধু সমালোচনা নয়, এগিয়ে যেতে হবে সুন্দর ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নও এখানে রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের উচিত এসব অর্থ খরচ হিসেবে না ভেবে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। বর্তমানে আর অবকাঠামোর দিকে নজর দেওয়ার চেয়ে মানোন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া একান্ত অপরিহার্য। বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন না করে অন্যান্য দেশের সাথে তালমিলিয়ে আধুনিক একটি পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করাও একান্ত জরুরি।
লেখক: শিক্ষক।
ইউডি/সুস্মিত

