বব মার্লে: সুরের মূর্ছনায় ক্যারিবিয়ান দ্বীপ থেকে বিশ্বজয়ের নেপথ্যে
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৮ জুন ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
‘৭০-এর দশকে যিনি শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিলেন তার নান্দনিক সুরের মূর্ছনায়। একাধারে যিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী। যিনি গেয়েছেন এবং তৈরি করেছেন রেগি, স্কা, রক স্টেডি সহ নানা ধরনের মৌলিক এবং মিশ্র সঙ্গীত। জ্যামাইকান সঙ্গীতকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, করে তুলেছেন জনপ্রিয়। তিনি আর কেউ নন, বব মার্লে। তাকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত
ক্যারিবিয়ান দ্বীপে বেড়ে ওঠা: বব মার্লে ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ জ্যামাইকার নাইন মাইল নামক স্থানে জš§গ্রহন করেন। তার পিতা নর্ভাল মার্লে ছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ জ্যামাইকান এবং মা সেডেলা বুকার ছিলেন আফ্রো-জ্যামাইকান। ববের পারিবারিক নাম রবার্ট নেসটা মার্লে। ১৯৫৫ সালে ববের যখন মাত্র দশ বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। তার পিতার মৃত্যুতে তাদের পরিবারের উপর অসহনীয় অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসে।
সঙ্গীতে পদার্পণ শুরু যখন: ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে বব ‘জাজ নট’, ‘ওয়ান কাপ অব কফি’, ‘ডু ইউ স্টিল লাভ মি?’ এবং ‘টেরর’ শিরোনামে চারটি গান রেকর্ড করেন ফেডারেল স্টুডিওজে। এর মধ্যে ‘ওয়ান কাপ অব কফি’ নামের গানটি মার্লে ‘বব মার্টেল’ ছদ্মনামে প্রকাশ করেন। ১৯৬৩ সালে বব মার্লে, বানি ওয়েইলার, পিটার টস, জুনিয়র ব্রেইথওয়াইটে, বেভারলি কেলসো, আর চেরি স্মিথ মিলে তৈরি করেন ‘টিনেজারস’ নামক একটি গানের দল যা পরে তারা বদলে নাম দেন ‘ওয়েইলিং রুড বয়েজ’ এরপরে আবার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ওয়েইলিং ওয়ারিয়রস’। তাদের এই গানের যাত্রায় একসময় সঙ্গীত প্রযোজক কক্সন ডোড তাদের আবিষ্কার করেন এবং এই দলের একটি একক গান ‘স্লিমার ডাউন’ জ্যামাইকার ১৯৬৪ সালে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত রেকর্ডের তালিকায় স্থান পায়। এই গানের রেকর্ডটি প্রায় ৭০,০০০ কপি বিক্রি হয় জ্যামাইকা জুড়ে।
‘ক্যাচ অ্যা ফায়ার’ দিয়ে আগমনী বার্তা: ১৯৭২ সালে মার্লে সিবিএস রেকর্ডের সাথে যুক্ত হন এবং লন্ডনে জনি নাশ এর যাত্রা শুরু করেন। একই বছর ক্রিস ব্ল্যাকওয়েল ওয়েইলারসদেরকে তার আইসল্যান্ড রেকর্ডস এর সাথে কাজ করার প্রস্তাব দিলে মার্লেদের দল এতে রাজি হয় এবং প্রথম এ্যালবাম ‘ক্যাচ অ্যা ফায়ার’ ১৯৭৩ সালে বিশ্ব জুড়ে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালবামটি বব মার্লেকে স্টার বানাতে না পারলেও তার কাজের সীমাকে বিস্তৃত করে দেয়, কারণ তার কাজ নিয়ে তখন থেকে বিস্তর ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়।
জ্যামাইকা ছেড়ে লন্ডন গমন: ১৯৭৬ সালে মার্লের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হয় এবং এ ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে সে বছরের শেষভাগে বব জ্যামাইকা ছাড়েন এবং বাহামায় একমাসের যাত্রাবিরতির পর লন্ডনে এসে পৌঁছান। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি ‘এক্সোডাস’ ও ‘কায়া’ শিরোনামে দুইটি এ্যালবাম প্রকাশ করেন। এরমধ্যে ‘এক্সোডাস’ ব্রিটিশ অ্যালবাম লিস্টে ধারাবাহিকভাবে ছাপ্পান্ন সপ্তাহ প্রথম অবস্থান ধরে রাখে। এই অ্যালবামে চারটি ব্রিটিশ সিঙ্গেল হিট ছিল। ‘ওয়েইটিং ইন ভেইন’, ‘জ্যামিং’, ‘ওয়ান লাভ’ এবং ‘পিপলস গেট রেডি’ নামক এই চারটি একক গান তৎকালীন ইউএস হিট লিস্ট লিড দেয়।
বিয়ে এবং রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাস: ১৯৬৬ সালে বব মার্লে বিয়ে করেন রিটা অ্যান্ডারসনকে। মূলত তখন থেকেই বব রাস্তাফারি বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি আস্তে আস্তে আনুষ্ঠানিকভাবে রাস্তাফারিজমকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন, এসময় তিনি তার চুলে রাস্তাফারি বিশ্বাস অনুযায়ী লম্বা জটাযুক্ত ঝুঁটি (উৎবধফষড়পশং) করা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পুরোপুরি রাস্তাফারিয়ানে পরিণত হয়ে যান। তার প্যান আফ্রিকানিজম, রাজনৈতিক প্রগতিশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জীবনাচরণ সবই ছিল তার হƒদয়ের গভীরে ধারণ করা রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাসের থেকে উঠে আসা। মার্লে প্রচø রকম গাঁজায় আসক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যখন লোকজন গাঁজার ধোঁয়া টান দেয়। তখন তার মস্তিষ্ক কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “তুমি জানো? যখন আমরা ধূমপান করি, তখন সেটা আমাদের মাথা ঠাøা করে, শান্ত হয়ে বসে ধ্যান করতে সাহায্য করে। বোকা হয়ে বসে থাকার চেয়ে ধ্যান করে অন্য কেউ হয়ে যাও।
ক্যানসারে আক্রান্ত ও চির বিদায়: সালটা ছিল ১৯৭৭, তার পায়ের বুড়ো আঙুলের একটা ক্ষত কিছুতেই সারছিল না, তাই তিনি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেলে ধরা পড়ে- তিনি ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা অর্থাৎ সাধারণ ভাষায় চামড়ার ক্যান্সারে আক্রান্ত। ডাক্তাররা তাকে তার পায়ের আঙুল কেটে ফেলতে পরামর্শ দিলেও তিনি তা মেনে নেননি কারণ রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাসে তা করার অনুমোদন নেই। ১৯৮০ সালে সফলতার চূড়ায় থাকা ওই সময়ে তিনি আমেরিকা সফর শুরু করেন এবং ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি দু’টি শো করেন। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে জগিং করতে করতে পড়ে গেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার আগেই সনাক্ত হওয়া ক্যান্সার মস্তিষ্কসহ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি মিয়ামির একটি হাসপাতালে ১৯৮১ সালের ১১ই মে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ইউডি/সুস্মিত

