উদীয়মান অর্থনীতির উজ্জ্বল উদাহরণ এখন বাংলাদেশ
রেজাউল করিম খোকন । শুক্রবার, ১০ জুন ২০২২ । আপডেট ১০:৪০
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। বিদেশিদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশ ছিল এক তলাবিহীন ঝুড়ি। আর এখন সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন এক উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। পাকিস্তান এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত স্বাধীনতা অর্জনের ৭৪ বছরে যে সফলতা অর্জন করতে পারেনি, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে গত ৫০ বছরে। দিনে দিনে সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। এটা আরোপিতভাবে নয়, স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল এক সময়ে এ অঞ্চলে। কিন্তু সেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। এখন আর আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির একচ্ছত্র দাপট নেই আগের মতো। নানা চড়াই উত্রাই পথ পাড়ি দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু গড় আয় ও আয়ু, নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তি মিলিয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশ মাছ, সবজি, ফল, মুরগি, ডিম উৎপাদনে বিশ্ব পর্যায়ে পণ্য হচ্ছে। এর কোনো কোনোটিতে আমাদের অগ্রগতি বিশ্ব পর্যায়ে তৃতীয়-চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। আবার করোনার দুঃসময়ে আমাদের রফতানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হার বেড়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও বেড়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২২২৭ ডলার।
এই অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৮ শতাংশ হতে পারে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ইন্দো-প্রশান্ত মহসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত ভূগৌলিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নজরে রয়েছে বাংলাদেশ। এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্স ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল শুরু করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা খোঁজা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দক্ষতার জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানেরও প্রশংসা অর্জন করেছে।
দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলার ছুঁয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণে বিশ্বাস করে এবং যাদের সহযোগিতা প্রয়োজন তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকা এখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে গভীর সংহতকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু অন্যদের অবদমন করে নয়। বাংলাদেশ হলো এশিয়ার নতুন রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তারা সব জায়গায় একই ভাষায় কথা বলে এবং রয়েছে সুসংগঠিত প্রশাসন। বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করছে। একই সঙ্গে কয়েকটি আসিয়ান দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে চাইছে এবং কানেক্টিভিটি প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তান চেয়েও সূচকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০০৫ সালেও দেশে যেখানে অতি দরিদ্রের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, গত ১৬ বছরের ব্যবধানে তা বেশ কমে এসেছে। বিশ্বের খুব কম দেশই এ সাফল্য দেখাতে পেরেছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের উচিত কিভাবে দারিদ্র দূর করতে হয়, তা বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখা। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ দেশ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাছে অনুকরনীয় হতে পারে। বাংলাদেশের এই ‘উন্নয়ন বিষ্ময়’ নজরে এসেছে জাতিসংঘেরও। এটি আমাদের জন্য একটি অনন্য অর্জন বলা যায় নি:সন্দেহে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অতি দারিদ্র পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। দেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা কমেছে।
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে অতি দারিদ্র হার কমেছে। এই প্রবনতাকে বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন হিসেবে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গঁসমতা ও সফল পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী বাস্তবায়ন এ দেশের দারিদ্র বিমোচনে বড় ধরনের সহায়তা করেছে। কয়েক বছর ধরে সরকারের নেওয়া সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারনে এ সাফল্য এসেছে। সরকার গত ছয়বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রের আওতায় নেওয়া কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে সড়ক নেটওয়ার্কের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। গ্রাম-উপজেলা-জেলাসহ সব ক্ষেত্রে সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে সাধারণ জনগন। এখন গ্রামের সাধারণ কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য খুব সহজে শহরে আনতে পারছে। বাংলাদেশ কৌশলগত রফতানি থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারছে। এছাড়া, বেশ বড় অঙ্কের রেমিট্যান্সও আসে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ফরেক্স রিজার্ভ ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার হাজার কোটি ডলার। ২০১০ সালে যা ছিল ৯০০ কোটি ডলার।
এসব কারনে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র অনেকটাই কমে আসছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের দারিদ্র কমার প্রধান কারন, এদেশের মানুষের আয় সক্ষমতা বেড়েছে।আজ জাতির সামনে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাড়াও সম্ভবত স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্জন মাথা তুলে সবার সামনে দৃশ্যগোচর হয়েছে। সেটি পদ্মা সেতু, এটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রায় এক রূপকথার কাহিনী বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবন্ধক দূর করে বাংলাদেশ এত বড় কাজটি নিজের অর্থে সম্পন্ন করতে চলেছে। এ সেতু বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছে, আর এই দৃশ্যমান স্থাপনা দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাথা হেট করেছে। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব যে সত্যি সত্যিই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে এদেশের মানুষ সেটা টের পেয়েছে। এখন তারা নেত্রীর জন্য যেকোনো বিজয় ছিনিয়ে আনতে প্রস্তুত।
ইউডি/সুস্মিত

