সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ডের পক্ষপাতহীন তদন্ত অপরিহার্য
মোবায়েদুর রহমান । বুধবার, ২৯ জুন ২০২২ । আপডেট ১৪:২০
সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বিএম কন্টেইনার ডিপোতে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং সেই অগ্নিকাণ্ডে সরকারি হিসাব মোতাবেক ৪৯ জন অসহায় মানুষের করুণ এবং ভয়াবহ মৃত্যু হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডে শুধুমাত্র ৪৯ জন মানুষই মৃত্যুর মুখে পতিত হন নাই, অন্তত ৪০০ মানুষ আহত হয়েছেন। একের পর এক কন্টেইনার ডিপোর বিষ্ফোরণে প্রায় ৪ মাইল রেডিয়াস জুড়ে এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। যারা আহত হয়েছেন তাদের অনেকে হারিয়েছেন তাদের পা, চোখ, হাত। বিষ্ফোরণের প্রকট শব্দে অনেকের শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। শ্বাস তন্ত্রের প্রদাহ, শ্বাস কষ্ট এবং অনেকের চর্ম রোগ দেখা দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রথমে যেটা বলেছিলেন এখন সেটা সকলেই বলছেন। তার বলছেন যে এই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাসায়নিক থাকার কারণে এত বড় বিষ্ফোরণ ঘটেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ মোতাবেক মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো বিষ্ফোরণের কারণে নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইড তাদের শরীরে প্রবেশ করে। এ কারণেই তাদের মৃত্যু ঘটে।
সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছে। এরমধ্যে কিছু বিশেষজ্ঞ এবং আইনজীবীও তাদের মতামত দিয়েছেন। এক শ্রেণির আইনজীবী বলেন যে, যেভাবে মামলাটি সাজানো হয়েছে তার ফলে মালিক পক্ষকে রক্ষা করার একটি সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা আইনের কতকগুলি ধারা উল্লেখ করেন। তারা বলেন যে, মামলাটি করা হয়েছে দন্ডবিধির ৩৩৭, ৩৩৮, ৩০৪(ক) এবং ৪২৭ ধারায়। যাদেরকে আসামী করা উচিৎ ছিল তাদেরকে আসামী না করে মামলাটি দুই দিক দিয়ে দুর্বল করা হয়েছে। যে চারটি ধারা ওপরে উল্লেখ করা হলো এই চারটি ধারাতেই রয়েছে অনিচ্ছাকৃত অপরাধ। কিন্তু মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কন্টেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ প্রকৃত তথ্য গোপন করায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মারা গেছেন। মালিকপক্ষকে দায়ী করে যদি মামলা করা হতো তাহলে সেই মামলা হতো ৩০২ ধারায়। সেটি না করে উল্লেখিত চারটি ধারায় করা হলো কেন? পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যাই বলুন না কেন, আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে ৩০২ ধারা এখানে আনা হয়নি।
৩০২ ধারায় মামলা হওয়ার দুইটি শর্ত আছে। একটি হলো জ্ঞাত সারে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে (নলেজ অ্যান্ড ইন্টেনশন)। এই দুটি শর্তের যে কোনো একটি শর্তের অধীনে মামলা করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতো। শুধু সরাসরি হত্যা করলেই হত্যাকাণ্ডের অপরাধ হয় না। মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এবং অতঃপর সেই পরিস্থিতির কারণে মৃত্যু হওয়াকেও হত্যাকাণ্ড বলা হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের প্রথম অপরাধ হলো দাহ্য পদার্থ রাখা। দ্বিতীয় অপরাধ হলো, সেটি কাউকে না জানানো এবং ঐ ধরণের বিষ্ফোরোন্মুখ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদেরকে কাজ করতে দেওয়া। তৃতীয় এবং বড় অপরাধ হলো ফায়ার ফাইটাররা যখন আগুন নেভাতে যান তখনও তাদের বলা হয়নি যে এখানে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড আছে। যদি সেটি ফাইটারদের বলা হতো তাহলে ৯ জন অগ্নি নির্বাপক কর্মীর প্রাণ যেত না।
সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড এবং তার ফলে ৪৯ ব্যক্তির প্রাণহানি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন রকম মতামত দিয়েছে। আমরা সেই সব মতামতের মধ্যে যাচ্ছি না। আমাদের মূল বিষয় হলো, মানুষের অমূল্য জীবন। কেন এতগুলো মানুষের জীবন হানি ঘটলো তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পর যারাই দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের আইন মোতাবেক সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এক্ষেত্রে তদন্তের আগেই এমন কিছু কথা বলা হচ্ছে, যার ফলে তদন্ত প্রভাবিত হয়। বলা হচ্ছে যে, এক্ষেত্রে কোনো নাশকতা হয়েছে কিনা সেটিও খুঁজে দেখতে হবে। এই যে তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সেটিকে যদি কেউ উদ্দেশ্যমূলক বলেন তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ ৫/৬টি তদন্ত টিম নাকি এখানে কাজ করছে। এতগুলো তদন্ত টিমের কারো না কারো তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসা উচিৎ। যদি নাশকতা থেকে থাকে তাহলে সেটাও বেরিয়ে আসার কথা।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

