দেশের উন্নয়নের ভিত মজবুত করবে শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত

দেশের উন্নয়নের ভিত মজবুত করবে শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত

মোহম্মদ মোমিন । বৃহস্পতিবার, ১৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০

জনসংখ্যাকে একটি দেশের জন্য আশীর্বাদ মনে করা হয়। কারণ একটি দেশে জনসংখ্যা যত বেশি সেদেশে শ্রমের জোগানও তত বেশি হয়। এতে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে। শক্তিশালী হয় অর্থনীতি। তবে এর জন্য আগে ঐ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। আমাদের ছোট্ট দেশে বিপুল জনসংখ্যা রয়েছে। এদেরকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে এদেশের অর্থনীতি কতো বড় আর শক্তিশালী হবে তা স্বয়ং আজকের উন্নত দেশগুলোও ভাবতে পারবে না। আর জনসম্পদে পরিণত করতে নাগরিকদের যেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয় তার মধ্যে স্বাস্থ্যই অন্যতম। আমাদের মৌলিক অধিকারের অন্যতম একটি এই স্বাস্থ্য খাত। আবার আমাদের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ছয়টি অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল- মানবস্বাস্থ্য। এমন বাস্তবতায় এদেশে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে।

এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। আর করোনাসহ নানান জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দিয়েছে। যদিও গত অর্থবছরের বাজেটে আপৎকালীন বা থোক বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বাজেট ছিল ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি। সে হিসেবে গত বছরের তুলনায় এবার মূল বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। বাজেটে চার হাজার কোটির বর্ধিত অঙ্ক দেখে যেকেউ ভাবতেই পারেন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু এটি আসলে শুভংকরের ফাঁকি। প্রতিবছর আগের অর্থবছরের তুলনায় টাকার অঙ্ক কিছুটা বাড়িয়ে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাই এবারও নিয়মিত বরাদ্দ বেড়েছে। এই বর্ধিত বরাদ্দ মূলত ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির ব্যবস্থা মেটাতেই চলে যাবে। বর্তমান বরাদ্দের মাধ্যমে বড়জোর স্বল্পমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলো মেটানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য বাজেটের এই দুরবস্থা এবারই এমন না। অতীতেও খারাপ ছিলো। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস (বিএনএইচএ) এর ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। মাথাপিছু এই বরাদ্দ পড়ে মাত্র ৪৫ ডলার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণায় গবেষকেরা বলছেন, খরচের কথা মাথায় রেখে দেশের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার, অর্থাৎ তিন কোটির বেশি মানুষ হাসপাতাল, ক্লিনিক বা কোনো চিকিৎসকের কাছে যান না। প্রয়োজন থাকলেও তারা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এমন বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে এবারের বাজেটে নতুনত্ব লক্ষ্য করা যায়নি। আগামী দিনে করোনাভাইরাসসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই বিনিয়োগ এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় কোন মেগা পরিকল্পনা এই বাজেটে গুরুত্ব পায়নি। আমরা দেখলাম গত বাজেটের মাত্র ৪১ শতাংশ ব্যয় করে বাকিটা ফেরত দিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বাজেট; সেটাও যদি পুরোটা ব্যয় না করা যায় তবে মানুষের চিকিৎসা সেবার কোয়ালিটি নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়। প্রশ্ন থেকে যায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সক্ষমতা নিয়েও।

বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশের মতো। যেখানে বিশেষজ্ঞদের মতে করোনা মহামারীর মতো সংকট মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্য খাত জিডিপির ৫ শতাংশ হওয়া জরুরি। এবার গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক বাজেট ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বাজেট ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ মূল বাজেটের চেয়ে স্বাস্থ্য বাজেটের বৃদ্ধির হার কম। এদিকে গত বছর স্বাস্থ্যের বাজেট ৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এই বাজেটে ভালো দিকের মধ্যে একটি হলো কোভিডকালে অটিস্টিক শিশুদের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

এছাড়া দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার অবকাঠামো তৈরি ও গবেষণা কার্যক্রম প্রবর্তন করা, গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, অনুজীব বিদ্যা, রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির সার্বিক উন্নয়নে ও স্বাস্থ্য খাতের নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে চলতি বিগত অর্থবছরের মত এবারও ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকছে। তামাক দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি স্বাস্থ্যখাতে আরেকটি ভালো দিক। কেননা তামাক থেকে যা আয় হয় তার থেকে চিকিৎসায় এর বেশি খরচ হয়। শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করবে। তাই এ খাতে সার্বিক মনোযোগ বাড়াতে হবে। করোনা নানা রূপে ফিরছে। তাই আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসাবে করোনার জন্য পৃথক বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে এখন মাঙ্কিপক্স নিয়ে আলোচনা ও সতর্কতা বাড়ছে। এছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার প্রতি আরো মনোযোগী হতে হবে। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকে বাজেট বাড়িয়ে দিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক সেবার পরিমাণ ও মান বাড়াতে হবে। যে বরাদ্দই দেওয়া হয়, সেটি ব্যবহারে অপচয় ও দুর্নীতি হয় রোধ করতে হবে। বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির সাথে সেই অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে জোর দিতে হবে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading