ইন্ডিয়ার বংশোদ্ভুত ঋষি সুনাক দুই দফায় এগিয়ে: কে হচ্ছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:১৫
ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির পরবর্তী নেতা তথা দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী ৫ আগস্ট। কিন্তু এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে যারা লড়ছেন তাদের নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। ইতোমধ্যে দুবার ভোটাভুটিও সম্পন্ন হয়েছে যেখানে অনেকটাই এগিয়ে আছেন বরিস জনসন সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক। এই ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূতকে নিয়েও হচ্ছে সমালোচনা। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে গত ৭ জুলাই পদত্যাগ করেন বরিস জনসন। ওই সময়ে তিনি বলেছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখন থেকেই শুরু হওয়া উচিত। এরই ধারাবাহিকতায় প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দুবার ভোটাভুটিও সম্পন্ন হয়েছে গত বুধবার (১৩ জুলাই) ও গত বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) ওই ভোট হয়। দুবারই সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন বরিস জনসন সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক।
দুবারের ভোটেই এগিয়ে ঋষি সুনাক: গত বৃহস্পতিবার সেকেন্ড রাউন্ডের ভোটাভুটিতে ১০১ ভোট পান ঋষি। প্রথম রাউন্ডের মতো এদিনও কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ ভোট পান। ঋষির পরেই আছেন ব্রিটেনের জুনিয়র বাণিজ্য মন্ত্রী পেনি মর্ডান্ট। তিনি ৮৩টি ভোট পেয়েছেন। আর এরপরই ৬৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেলারেল সুয়েলা ব্রেভারম্যান ২৭টি ভোট পেয়ে এই নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েন। প্রথম রাউন্ডে তিনি পেয়েছিলেন ৩২ ভোট। প্রসঙ্গত, গত বুধবারও প্রথম রাউন্ডের ভোটাভুটিতে ঋষি সুনাক সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। সেদিন কনজারভেটিভ পার্টি থেকে ৮৮ টি ভোট পেয়ে শীর্ষে ছিলেন তিনি। এদিনও টিকে যাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে সুয়েলা সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছিলেন। বুধবার অনুষ্ঠিত প্রথম রাউন্ডের ভোটের ফলাফলে ঋষি সুনাক পেয়েছেন ৮৮ ভোট, পেনি মর্ডান্ট ৬৭ ভোট, লিজ ট্রাস ৫০ ভোট, কেমি ব্যাডেনোচ ৪০ ভোট, টম তুগেনধাত ৩৭ ভোট, সুয়েলা ব্রেভারম্যান ৩২ ভোট। এছাড়া ওইদিন পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড় থেকে ছিটকে যাওয়া নাদিম জাহাউই পেয়েছেন ২৫ ভোট এবং জেরেমি হান্ট ১৮ ভোট পেয়েছেন।

কে এই ঋষি সুনাক: ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত ঋষি সুনকের বয়স ৪২ বছর। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরিস জনসন তাকে প্রথম পূর্ণ মন্ত্রিসভা পদ অর্থাৎ অর্থমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করেছিলেন। ঋষি সুনকের দাদা-দাদী ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবের বাসিন্দা ছিলেন। আর ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণ মূর্তির কন্যা অক্ষতা মূর্তি হচ্ছেন ঋষির স্ত্রী। তাদের দুই কন্যাও রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়াতে পড়াশোনা করার সময় তাদের পরিচয় হয়। সেই ঋষি যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তা হলে তিনিই হবেন প্রথম ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। করোনা মহামারি চলাকালীন ব্যবসা এবং কর্মচারীদের সাহায্য করার জন্য কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিশাল প্যাকেজ তৈরির পর ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ঋষি। তবে স্ত্রীর নন-ডোমেস্টিক ট্যাক্স, নিজের ইউএস গ্রিন কার্ড এবং ব্রিটেনের জীবনযাত্রার খরচের সংকটে প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়ে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়েছেন ঋষি। কোভিড লকডাউন অমান্য করার জন্য এবং ডাউনিং স্ট্রিট সমাবেশে অংশ নেওয়ার জন্যও জরিমানা করা হয় ঋষির।
জরিপ বলছে জয়ী হবেন মর্ডান্ট: এদিকে, জরিপ বলছে ব্রিটেনের কনজারভেটিভ দলের নেতা এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবার পছন্দের প্রার্থী হয়ে উঠেছেন পেনি মর্ডান্ট। জরিপে অন্যদের পেছনে ফেলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে তাকে। টোরি (কনজারভেটিভ) দলের ৮৭৬ জন সদস্যদের ওপর ইউগভ পরিচালিত নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, ২৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন মর্ডান্ট। ১৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন কেমি বেডনক। আর ১৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন ঋষি সুনাক এবং লিজ ট্রাস। জরিপের পূর্বাভাস ঠিক হলে চূড়ান্ত পর্বের ভোটে মর্ডান্ট খুব সহজেই অন্য প্রার্থীদের ধরাশায়ী করে ফেলতে পারবেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে ওঠা দুই প্রার্থীর মধ্য থেকেই একজনকে নেতা নির্বাচন করবেন কনজারভেটিভ দলের ৮৭৬ সদস্য।

বরিস জনসনের পদত্যাগের নেপথ্যে কী
মূলত ‘পার্টিগেট’ থেকে শুরু হয়েছিল জনসন সরকারের ভাবমূর্তির পতন। ব্রিটেনে কঠোর কোভিড লকডাউন চলাকালে সরকারি বাসভবনে মদের পার্টি বসানো নিয়ে দলের মধ্যেই অনাস্থা প্রস্তাবের মুখোমুখি হয়েছিলেন বরিস। এরপর থেকে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছে জনসন সরকার। কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি চিফ হুইপ ক্রিস পিনচার-এর যৌন কেলেঙ্কারি কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেয়। মত্ত অবস্থায় এক ব্যক্তির পুরুষাঙ্গ চেপে ধরার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন পিনচার। প্রথম থেকে পুরোটা জেনেও, অস্বীকার করেছিলেন বরিস। পরে তার মিথ্যাচার ধরা পড়ে যায়। এরপরই জনসন সরকারের অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন ঋষি সুনাক। যার সূত্র ধরে একের পর এক সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা ইস্তফা দেন এবং বরিস জনসনও পদ ছাড়তে বাধ্য হন।

যেভাবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে:কীভাবে নিজেদের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বেছে নেবে ব্রিটিশরা? ব্রিটেনের সংবিধান ও শাসনতন্ত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। ব্রিটেনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে আগ্রহী প্রার্থীরা এখন এগিয়ে যাবেন। ক্ষমতাসীন দলের অন্তত দুই জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে এমন যে কোনো পার্লামেন্ট সদস্য বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে পারবেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীদের তারপর যেতে হবে বেশ কয়েক দফা ভোটে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট হাউস অব কমন্সের সরকারি দলের আইনপ্রণেতারা গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন। সেসব ভোটের ফলাফলের গড় হিসাব করে যে প্রার্থী সবচেয়ে কম ভোট পাবেন, তার প্রার্থিতা বাতিল হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রার্থীর সংখ্যা ২ জনে এসে না ঠেকছে ততক্ষণ চলতেই থাকবে এই ভোট। শীর্ষ দুই প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর তারা সমর্থন চাইবেন পার্লামেন্টের বাইরে সরকারি দলের যত সদস্য রয়েছেন তাদের। যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি সমর্থন লাভ করবেন, তিনিই হবেন ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও এভাবেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী ও দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে’র পদত্যাগের পর দলের এমপি ও সদস্যদের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন জনসন।
কত সময় লাগবে এ প্রক্রিয়ায়?
এ ব্যাপারটি নির্ভর করছে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কত জন নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করছেন তার ওপর। ২০১৬ সালে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হতে টেরিজা মে’র সময় লেগেছিল তিন সপ্তাহ। কিন্তু ২০১৯ সালে মে’র পদত্যাগের পর এ পদে আসতে জনসনের সময় লেগেছিল দুই মাস। ব্রিটেনের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী জেরেমি হান্টের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে হয়েছিল তাকে।

নতুন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা হতে পারে ৫ সেপ্টেম্বর: নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হতে পারে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন বরিস জনসন। কনজারভেটিভ বা টোরি পার্টির প্রভাবশালী ১৯২২ কমিটির সভাপতি স্যার গ্রাহাম ব্রেডি জানিয়েছেন, এমপিরা গ্রীষ্মকালীন বিরতি শেষ করে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে ফেরত গেলে ভোটের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে নতুন প্রধানমন্ত্রী। বরিস জনসনকে হটিয়ে আগামী অক্টোবরে দেশটির ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির সম্মেলনে নতুন নেতা নির্বাচনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী ঠিক করা হবে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রীষ্মেই কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত করা হবে এবং অক্টোবরেই দলীয় সম্মেলনে নতুন প্রধানমন্ত্রী ঠিক করা হবে। ব্রিটিশ সংসদে মোট ৩৫৮ জন কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য রয়েছেন। তারা প্রথমে ভোট দিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থীর তালিকাকে দুইয়ে নামিয়ে আনবেন। এরপরে কনজারভেটিভ দলের সদস্যরা ভোট দিয়ে তাদের নেতাকে নির্বাচিত করবেন। সেই কনজারভেটিভ দলের নেতা ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হবেন। এই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে প্রথম দফা ভোট হয়েছে।
ইউডি/সুস্মিত

