বান্দরবান সীমান্তে এবার মিয়ানমারের গোলা: এ কীসের আলামত?

বান্দরবান সীমান্তে এবার মিয়ানমারের গোলা: এ কীসের আলামত?
উত্তরদক্ষিণ । ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:০০

মর্টার শেল ‘নিক্ষেপের’ পর এবার মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান ও দুটি ফাইটিং হেলিকপ্টার বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে বান্দরবানে গোলাবর্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অথচ, ক’দিন আগেই তারা এই বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশকে। কিন্তু সেই সতর্কতার তোয়াক্কা না করে আবারও সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টির পায়তারাই শুরু করলো প্রতিবেশী এই দেশ। এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলছে আবারও প্রতিবাদ জানাবে তারা। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় আবারও উত্তেজনার পারদ চরমে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মিয়ানমার থেকে টানা মর্টার শেল ও গোলা এসে বাংলাদেশের সীমান্তে পড়েছে। শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান ও দুটি ফাইটিং হেলিকপ্টার হানা দেয় বলে গণমাধ্যমকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন বান্দরবানের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। এতে বলা হয়, শনিবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ঘুমধুম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রেজু আমতলীর বিজিবির বিওপির (সীমান্ত চৌকি) আওতাধীন সীমান্ত পিলার ৪০ ও ৪১ নম্বর মাঝামাঝি এলাকায় ঢুকে পড়ে এসব যুদ্ধ বিমান। গত ২৮ অগাস্ট দুপুরে ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার থেকে দুটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল এসে পড়ার পর দেশটির রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল ঢাকা। কিন্তু তার পাঁচ দিনের মাথায় মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পড়ার তথ্য জানিয়ে এসপির বিবৃতিতে বলা হয়, এ সময় যুদ্ধবিমান থেকে আনুমানিক আট-থেকে ১০টি গোলা এবং হেলিকপ্টার থেকে ৩০ থেকে ৩৫টি ফায়ার করতে দেখা গেছে। যুদ্ধবিমান থেকে ফায়ার করা দুটি গোলা ৪০ নম্বর সীমান্ত পিলার ১২০ মিটার বরাবর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়ে।

ড. এ কে আবদুল মোমেন

কীসের উসকানি দিচ্ছে মিয়ানমার : মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে খবর এসেছে। সেই উত্তেজনার পারদ পৌঁছেছে বাংলাদেশেও। মর্টার শেল ‘নিক্ষেপের’ পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের সীমান্তে মিয়ানমারের গোলা এসে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে চরম আতঙ্কে সীমান্তের বাংলাদেশের অংশের বাসিন্দারা। যদিও স্থানীয় প্রশাসন এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছেন। তবে প্রশ্ন হলো প্রথম ঘটনার পর ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানোর পরও একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন ঘটল, কীসের বার্তা দিচ্ছে প্রতিবেশী এই দেশ? বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রদূতকে কারন দর্শানোর ব্যাখা দিতে বলা হোক। এই ধরণের ঘটনা উসকানিমূলক যা দেশের স্বাভাবিক অবস্থা অস্থিতিশীল করার নেপথ্যে কাজ করতে পারে।

সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা: স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্ত পিলার ৩৪ থেকে ৩৫-এর মাঝামাঝি মিয়ানমার অংশের একটি ক্যাম্প থেকে চার রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি করা হয়। শনিবার দুপুর পর্যন্ত মিয়ানমারের মুরিঙ্গাঝিরি ক্যাম্প ও তুমব্রু রাইট ক্যাম্প থেকে থেমে থেমে গোলাগুলি চলেছে। এ ঘটনায় আতঙ্কে আছেন স্থানীয়রা। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তমব্রু সীমান্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গত রবিবার দুটি এবং গত বৃহস্পতিবার একটি মর্টারশেল এসে পড়েছে। আজ (শনিবার) আবার গোলা এসে পড়ল। এতে সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে বিজিবি : এদিকে, এই ঘটনায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার পরপরই সীমান্তে পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানাবে বলে জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক কর্মকর্তা। শনিবার গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বিজিবির দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত ১০/১২ দিন ধরে সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি হচ্ছে। এই ঘটনায় প্রথমদিকে তমব্রু এলাকার বাংলাদেশ সীমান্তের অংশে থাকা রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা আতঙ্কে থাকলেও বর্তমানে তাদের আতঙ্ক কিছুটা কেটেছে। বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, গোলা পড়ার ঘটনায় বিজিবি সর্তক অবস্থানে আছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসনসহ সবাই সতর্ক অবস্থানে আছে।

গভীর পর্যবেক্ষণ করছে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়: এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, আমরা অবজার্ভ করছি। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ওখানে কিছু ভায়োলেন্স হচ্ছে। আমরা আমাদের বর্ডার সিল করেছি। মিয়ানমার যত উস্কানিই দিক না কেন সীমান্ত দিয়ে সেদেশ থেকে আর কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। মিয়ানমারের লোক আমাদের দিকে যাতে না আসতে পারে সে জন্য বিজিবিকে সতর্ক করেছি। পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও নিয়মিত আলাপ করছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না। আমরা অবজার্ভ করছি।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ অং কিয়াউ মো

আজ আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাবে ঢাকা : এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সংবাদমাধ্যমকে জানান, মিয়ানমারের গোলা আবারও বাংলাদেশে এসে পড়ার ঘটনায় আজ রবিবার (৪ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে। এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোড়া দুটি মর্টারশেল বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে পড়ার প্রতিক্রিয়ার পর দেশটি সতর্ক থাকবে বলেছে বলে জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, মর্টারশেলগুলো হঠাৎ করে চলে এসেছে। তাদের আমরা জিজ্ঞেস করেছি, তারা আগামীতে সতর্ক থাকবে বলেছে। ওই ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। গত রবিবার বিকেল ৩টার দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু উত্তর মসজিদের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুটি মর্টারশেল এসে পড়ে। তবে সেগুলো বিস্ফোরিত হয়নি এবং কোনো হতাহতের ঘটনাও ঘটেনি।

উত্তরদক্ষিণ । ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

বাংলাদেশ সীমান্তে কী করছে মিয়ানমার: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বরাতে জানা যায়, মিয়ানমার সেনারা সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে হামলা চালাচ্ছে। আরকান রাজ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপরও শুরু হয়েছে নতুন করে নিপীড়ন। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ সীমান্তের নানাস্থানে জড়ো হচ্ছেন বলে জানিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে। মিয়ানমার থেকে ঘুমধুমে এসে পড়ল দুটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেলমিয়ানমার থেকে ঘুমধুমে এসে পড়ল দুটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল এছাড়া একাধিক সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারে শত শত রোহিঙ্গা ইন্ডিয়ার মিজোরাম রাজ্যের দিকে পালিয়ে গেছেন। সেখানে বাধাগ্রস্ত হয়ে তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আরাকানজুড়ে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে। তাঁরা বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি ও তুমরু সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
বার্তা সংস্থার খবরে জানা যায়, ঘুমধুমের তুমরু, রেজু আমতলী, বাইশফাঁড়ি, তুইঙ্গাঝিরি, গর্জনবুনিয়া ও রেজু পাড়াসহ ঘুমধুমের ১৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গত এক মাস ধরে মিয়ানমারের ভেতরে সীমান্ত এলাকায় গোলাবর্ষণ চলছে। সম্প্রতি হেলিকপ্টার থেকেও গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২০ থেকে ৩০টি মর্টার শেষ ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মর্টার শেল উত্তর তুমরু গ্রামের মসজিদের আঙিনা ও বসতবাড়িতে পড়ে। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সীমান্তের এ পয়েন্টে হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণের পাশাপাশি বিদ্রোহীদের আস্তানা শনাক্তে ড্রোন ব্যবহার করছে মিয়ানমার বাহিনী। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে আস্তানা শনাক্ত করতে না পেরে পুরো ১৬ কিলোমিটার এলাকায় এলোপাতাড়ি গোলাবর্ষণ ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে।

ইউডি/ সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading