বালমোরাল দুর্গে বৃটিশ নয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহন
ড. আনোয়ারুল কবির । বুধবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:২০
বালমোরাল দুর্গে বৃটিশ নয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহন, এবং বৃটিশ রাজকীয় প্রাসাদ, রাজপরিবার, রাজনীতি, স্হাপত্য কলা, ও চৌর্যবৃত্তি নিয়ে কিছু কথা:
আজ রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন লিজ ট্রাস। স্কটল্যান্ডের বন্দরনগরী এবারডীন এর নিকট দুরত্বের বালমোরাল দুর্গে বৃটিশ মহামহিম রাণীর উপস্হিতিতে তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গ্রেট ব্রিটেনে গত ছয় বছরে চতুর্থবারের মত সরকার প্রধানের পদে পরিবর্তন এলো; বিবিধ ঘটনা-দুর্ঘটনার জের ধরে একে একে বিদায় নিলেন একই (টোরি) দলের ডেভিড ক্যামেরুন, টেরেসা মে, ও বরিস জনসন।
একদা বলা হতো, “বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্যাস্ত যায়না”। কালের থাবায় সে সাম্রাজ্য আজ ইংল্যান্ড, ওয়েলস, ও স্কটল্যান্ডে এসে ঠেকেছে। পুরো যুক্তরাজ্যকে বিবেচনায় নিলে বাকী রইলো উত্তর আয়ারল্যান্ড আর পশ্চিম গোলার্ধের ফকল্যান্ড দীপপুন্জ।
এ রাজ্যগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যের রাণী হলো স্কটল্যান্ড। পাহাড়, ঝর্ণা, লেক, সাগরের অপরূপ মেলবন্ধনে বিধাতা সাজিয়েছেন স্কটল্যান্ডকে। তাই এদেশকে দখলে আগ্রহী ছিলেন বিভিন্ন যুগের ক্ষমতাধর নৃপতিগণ। এদের ঠেকাতে প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে স্কটল্যান্ডের বড় শহরগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে দূর্ভেদ্য দূর্গ। এদের মধ্যে আমার এডিনবরা, সেন্ট এন্ড্রুজ ক্যাসেল দেখার সূযোগ হয়েছিলো।
আজ লিজ ট্রাস যে দূর্গে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহন করলেন, সে Balmoral Castle ঘিরে রয়েছে বিতর্কের ইতিহাস। ১৮৫২ সালে বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়ায় স্বামী (প্রিন্স আলবার্ট) ফার্গুহাসন পরিবার থেকে এ দূর্গটি খরিদ করেন। এর খরিদমূল্য ছিলো বত্রিশ হাজার বৃটিশ পাউন্ড। অপার সৌন্দর্য ছাড়াও তুলনামূলক কম তাপমাত্রার কারনে অবকাশ যাপনে রাজপরিবারের প্রথম পছন্দ ছিলো স্কটল্যান্ড। পশ্চিম এবারডীনের ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের দূর্গটি খরিদ করার পর আলবার্ট অনুধাবন করেন যে এর কক্ষসংখ্যা অপ্রতুল এবং এর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অপরিহার্য। এ কাজে তিনি নিয়োগ দিলেন সে সময়ের প্রখ্যাত (রাজ অনুগতও বটে) স্হপতি উইলিয়াম স্মিথকে। উইলিয়ামের বাবা স্হপতি জন (John Smith) ১৮৩০ সালে এ দূর্গের নকশা তৈরী করেন। দু:খের বিষয় উইলিয়াম স্মিথের নকশাটি প্রিন্স আলবার্টের পুরোপুরি মনমতো হলোনা।তিনি এর জানালাসহ কিছু কিছু এলাকায় পরিবর্তন আনলেন। ১৮৫৩ সালে এর নতুন করে নির্মান কাজ শুরু হয় এবং মূলত: গ্রানাইট ও শ্লেটে তৈরী এ দূর্গের নির্মানকাজ ১৮৫৬ সালে শেষ হয়। এ সময়ে প্রিন্স আলবার্ট স্হপতি উইলিয়ামকে এবারডীনের “সিটি আর্কিটেক্ট” এর পদটি তোফা হিসেবে দান করেন।
এতে সংক্ষুদ্ধ হন এবারডীন নগরীর আরেক বিশিষ্ঠ স্হপতি জন বার্নস (John Burns)। তিনি অভিযোগ করলেন, বালমোর দূর্গের নকশাটি মূলত: তাঁর । উইলিয়াম চৌর্যবৃত্তির (plagiarism) আশ্রয় নিয়ে নকশাটি তৈরী করেছেন । সেকালেতো বটেই একালেও রাজপরিবারের অনুকম্পা প্রার্থী শিল্পী, পেশাজীবিদের কমতি নেই। অভিযোগ প্রমান করে নগর স্হপতির পদটি বাগানোর দুরভিসন্ধি ছিলো তাঁর। রাণীপতি আলবার্ট সে অভিযোগকে আমলে নিলেন না। উইলিয়াম তাঁর পদে অধিষ্ঠিত রইলেন।
এ প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটি অনাহূত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি। ২০০৮ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার গবেষনা নির্দেশক প্রফেসর আ্যলিস বেলচার এর আনুকুল্যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের ছাত্রদের ফাইনাল টার্ম পরীক্ষার হল পর্যবেক্ষনের কাজ পাই। এ কাজ সাধারণত: শিক্ষক না করে উচ্চতর শ্রেণীর ছাত্ররাই করে থাকেন। এর জন্য ঘন্টাপ্রতি পারিশ্রমিক ছিলো সাড়ে সাত পাউন্ড। নবীন পর্যবেক্ষকদের হল পর্যবেক্ষনের আগে এক্সাম অফিসের ম্যানেজারের কাছে যেতে হলো। হল পর্যবেক্ষনের নিয়ম-নীতি তাঁর কাছ থেকে তালিম নিতে হবে। তিনি প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে আমাদের একের পর এক নিয়ম বর্ণনা করতে লাগলেন। এর একটি ছিলো, “কোন ছাত্র পরীক্ষাকালীন সময়ে ওয়াশরুমে গেলে পুরুষ পর্যবেক্ষক তাঁকে অনুসরন করবেন। ছাত্রীর ক্ষেত্রে নারী পর্যবেক্ষকের তাই কর্তব্য”
উত্তেজনাবশত: আমি দাঁড়িয়ে বললাম “এটি কি কোন সভ্য নিয়ম হলো?” তিনি তাঁর প্রশান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো। শুরুতে এ অদ্ভূত নিয়ম আমাদের নীতি সংহিতায় ছিলোনা। তবে অনিবার্য কারনে এটি আমাদের নীতি-সংহিতায় যোগ করতে হয়েছে।” তাঁর মুচকি হাসি বলে দিলো তাঁর কথার তীর এশিয়ানদের প্রতি। চাকুরী দাতার সাথে চাকুরী প্রার্থীর বচসা চলেনা। তাই কথা না বাড়িয়ে নিবিষ্ট মনে তাঁর বাকী কথা শুনলাম।
লিজ ট্রাসকে অভিনন্দন। চ্যালেন্জার ঋষি সোনাক এর জন্য রইলো গভীর সহানুভূতি। তাঁর টোরি পার্টির সাংসদদের ভোটে তিনি লিজকে ১৩৭-১১৩ ব্যাবধানে হারিয়েও দলের ডেলিগেটদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারলেননা। ডেলিগেটদের আশীর্বাদ পেলে তিনি হতেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। অতিধনী- অতি তামাটে (Too Rich Too Brown) বৃত্তবন্দী হওয়ায় এবার তাঁর ভাগ্যে শিকে ছিড়লোনা। তাঁর কোটিপতি স্ত্রী ইনফসিস এর বিলিনয়ার মালিক নারায়ণা মূর্তির কন্যা অক্সথা মূর্তি (Akshata Murti) এর অতিরিক্ত ধন সম্পদ তাঁর জন্য কাল হলো।
অক্সতা শব্দের মানে হলো অমর নারী। কোন সন্দেহ নেই যে স্বামীর প্রধানমন্ত্রী হবার পথে কাঁটা হওয়া এ নারীর নাম ইতিহাসে অমর-অক্ষয় হয়ে থাকবে।
বিদায় বরিস জনসন। ২০০৮ সালে যখন আপনি লন্ডনের মেয়র পদে দাঁড়ালেন, তখন জনগন আপনার অতিরিক্ত মদাসক্তি নিয়ে কথা তুলেছিলো। আপনি কথা দিয়েছিলেন, আপনি পরিমিত মদ্যপান করবেন। জনগন বিশ্বাস করে শুধু আপনাকে মেয়ব নয়, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রীর আবাস আপনাকে উপহার দিয়েছিলো। স্বয়ং ইশ্বর অতিমারী করোনার সময় আপনাকে দ্বিতীয়বার জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি বদলালেন না। এবার আর রাষ্ট্রীয় আচারের বাধা নেই। তবে পরমায়ু লাভ যদি আপনার এ মূহুর্তের লক্ষ্য হয়, তবে আপনাকে বদলাতে হবে।
লেখক: উপাচার্য, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
ইউডি/সুস্মিত

