বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচক ৯০ শতাংশ দেশেই অবনমন: ৩০ বছরে যা ঘটেনি তাই দেখছে বিশ্ব

বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচক ৯০ শতাংশ দেশেই অবনমন: ৩০ বছরে যা ঘটেনি তাই দেখছে বিশ্ব

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৪০

বৈশ্বিক মহামরি করোনা ভাইরাসের প্রকোট স্থবির করে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। অর্থনৈতিক ভাবে করোনার ধাক্কা বয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বের প্রায় সিংহভাগ দেশই। এছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ফুটে উঠলো জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সদ্য প্রকাশিত এক জরিপে। বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববাসীকে আজ কতটা বিপর্যস্ত। বিশ্বের প্রতি ১০টি দেশের মধ্যে অন্তত ৯টি দেশের এই সূচকে অবনমন ঘটেছে যা নতুন এক সংকটই বলছে বিশেষজ্ঞগণ। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে মূলত একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার সামগ্রিক অবস্থা পরিমাপ করা হয়। এই সমন্বিত পদ্ধতি থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের কল্যাণের উপর ভিত্তি করে মানব উন্নয়নকে চিন্তা করলে সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। যেমন ২০২০ সাল থেকে ৫০টিরও বেশি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অধিক নির্ভরশীলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে র‌্যাংকিং এর শীর্ষস্থান থেকে ছিটকে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে মানব সম্পদ উন্নয়নকে অন্তত পাঁচ বছর পিছিয়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস মহামারি। এ সময়টাতে মানুষের গড় আয়ু, আয়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকেও পেছনে টেনে নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কয়েক দশকের উন্নতির পর মানুষের আয়ু, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি করোনা ভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে পিছু হাঁটতে শুরু করেছে। গত ২০২০ এবং ২০২১ সালে বিশ্বের প্রতি ১০টি দেশের মধ্যে অন্তত ৯টি দেশই জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে পিছিয়েছে।

৩০ বছরে যা ঘটেনি তাই দেখছে বিশ্ব: করোনাভাইরাস মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই মূলত বৈশ্বিক মানব উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী। জাতিসংঘের এই সূচক চালু হওয়ার পর থেকে বছরের পর বছর ধরে অনেক দেশ নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং তাদের সূচকেরও অবনতি ঘটেছে। কিন্তু মানব উন্নয়ন সূচকের বৈশ্বিক প্রবণতা মোটাদাগে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল। কিন্তু গত বছর প্রথমবারের মতো সূচকের সব মাপকাঠিতেই অবনতি ঘটেছে এবং এই বছরেও সেই ধারা অব্যাহত আছে। ৩০ বছর আগে মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ শুরুর পর থেকে এবারই প্রথম ইউএনডিপি এই সূচকের উল্টো পথে যাত্রা দেখেছে বলে জানিয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউএনডিপির প্রধান আচিম স্টেইনার বলেছেন, এর অর্থ আমরা আগেই মারা যাচ্ছি। আমরা কম শিক্ষা পাচ্ছি। আমাদের উপার্জনও কমছে। তিনি বলেন, মাত্র তিনটি মাপকাঠি দিয়ে আপনি বুঝতে পারবেন এত বেশি মানুষ কেন মরিয়া, হতাশ এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। বিশ্বের ১৯১টি দেশের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সূচকে অবনতি ঘটেছে, বিশেষ করে মানুষের গড় আয়ু কমে গেছে। এর ফলে গত ৩০ বছর ধরে উন্নয়নের যে প্রবণতা চলে আসছিল তা বিপরীতমুখী হয়েছে; যা অনেকটা ২০১৬ সালের মানব উন্নয়ন সূচকের মতো। ইউএনডিপি মানুষের আয়ু কমে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবে আমেরিকার কথা উল্লেখ করে বলেছে, ২০১৯ সাল থেকে দেশটিতে শিশুর জন্মের সময়ই আয়ু দুই বছরের বেশি কমে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যা আরও বেশি।

গড় আয়ুর শীর্ষে সুইজারল্যান্ড, শেষে দক্ষিণ সুদান: গত কয়েক দশক ধরেই জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে শক্তিশালী উন্নতি দেখা গেলেও ২০২০ সালে এই সূচকের অবনতি ঘটতে শুরু করে; যা চলে তার পরের বছরও। আর এর মধ্য দিয়ে গত পাঁচ বছরের মানুষের অগ্রগতি মুছে গেছে। চলতি বছর মানব উন্নয়ন সূচকের শীর্ষে আছে সুইজারল্যান্ড। দেশটিতে মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর। সুইস নাগরিকদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয় গড়ে সাড়ে ১৬ বছর এবং দেশটির মানুষের গড় বেতনের পরিমাণও প্রায় ৬৬ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, এই সূচকের একেবারে তলানিতে রয়েছে দক্ষিণ সুদান, যেখানে মানুষের গড় আয়ু মাত্র ৫৫ বছর। এছাড়া দেশটির নাগরিকদের শিক্ষার পেছনে গড়ে ব্যয় হয় মাত্র সাড়ে ৫ বছর। দেশটিতে মানুষের বার্ষিক গড় আয়ের পরিমাণ মাত্র ৭৬৮ ডলার।

ভয়াবহ সংকটের মুখে ৮০টিরও বেশি দেশ: বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন ধরনের সংকটের এখনও কোনও সমাধান হয়নি। সূচকে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ ধনী দেশ গত বছর সূচকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও বেশিরভাগ দেশে তা নিম্নমুখী রয়েছে। চলতি বছরের এই সূচক ২০২১ সালের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনডিপি। আচিম স্টেইনার বলেছেন, ২০২২ সালের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ এই মুহূর্তে তাদের জাতীয় ঋণ পরিশোধে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ৮০টিরও বেশি দেশ এমন এক সংকট থেকে একধাপ দূরে রয়েছে; যা অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। আমরা গভীর প্রতিবন্ধকতা দেখছি, যার শেষ হতে আগামী কয়েক বছর লেগে যাবে।

লিঙ্গ বৈষম্য সম্পূর্ণ দূর হতে
লাগবে ৩০০ বছর

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে গতিতে লিঙ্গ বৈষম্য দূর হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ দূরিভূত হয়ে পুরোপুরি লিঙ্গ সমতার জন্য মানব সভ্যতাকে আরও প্রায় ৩০০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সম্পর্কিত এক প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য। গত বুধবার জাতিসংঘের নারী অধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউএন ওম্যান প্রকাশ করেছে প্রতিবেদনটি। সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমান অগ্রগতির যে হার, তা অব্যাহত থাকলে বিশ্বের সব দেশ থেকে নারীর ওপর পুরুষের মালিকানা ও বৈষম্য বিষয়ক যাবতীয় আইনের বিলোপ ঘটতে সময় নেবে অন্তত ২৮৬ বছর, ১৪০ বছর লাগবে কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সমমর্যাদা, বেতন, ক্ষমতা ও নেতৃত্বে আসতে এবং রাজনীতি ও পার্লামেন্টে পুরুষ জনপ্রতিনিধিদের সমকক্ষ হতে সময় লাগবে কমপক্ষে আরও ৪০ বছর। জাতিসংঘের দৃষ্টি অবশ্য এই চিত্র বেশ হতাশাজনক। কারণ চলতি শতকের গোড়ার দিকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্য সম্পূর্ণ দূর করার লক্ষ্য নিয়েছিল জাতিসংঘ। ইউএন ওম্যানের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও চলমান বিভিন্ন ইস্যু বারবার সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ‘বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, যেমন কোভিড মহামারি ও তার পরবর্তী অবস্থা, হিংসাত্মক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও এ বিষয়ক বিভিন্ন অধিকারের চরম অবমনানা দিন দিন লিঙ্গ বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বর্তমানে নারী ও পুরুষ্যের মধ্যকার বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট করতে একটি পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্রের শিকার হতে যাচ্ছেন ৩৮ কোটি ৩০ লাখ নারী, যাদের দৈনিক উপার্জন হবে ১ দশমিক ৯ ডলারের চেয়েও কম। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৩৬ কোটি ৮০ লাখ। এছাড়া ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন ৪ কোটি ৪০ লাখ নারী ও মেয়ে এবং ১২ লাখেরও বেশি মেয়ে বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। ইউএন ওম্যানের নির্বাহী পরিচালক সিমা বাহাউস এক বিবৃতিতে বলেন, পরিসংখ্যানের তথ্য বলছেÍ উপার্জন, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই নারীদের পিছিয়ে থাকা বৈশ্বিক প্রথায় পরিণত হচ্ছে। এই প্রথাকে দ্রুত পাল্টানো প্রয়োজন। এবং পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে যত বেশি সময় ব্যয় হবে, ততই বাড়তি মূল্য দিতে হবে আমাদের।’

উত্তরদক্ষিণ । ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ: মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। ১৯৯০ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত, মানব উন্নয়ন সূচক শতকরা ৬০ দশমিক ৪ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সূচকের মান মাধ্যম সারির দেশগুলোর গড় মানের চেয়ে বেশি ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪ বছর, গড় শিক্ষাকাল বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ বছর এবং প্রত্যাশিত শিক্ষাকাল বেড়েছে ৬ বছর। এছাড়া এসময়ে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় শতকরা ২২০ দশমিক ১ ভাগ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এর আগে প্রকাশিত (২০২০ সাল) সমীক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৩তম। সেবার দুই ধাপ অগ্রগতি হয়েছিল বাংলাদেশের। আর ৮টি দক্ষিণ এশীয় দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে পঞ্চম। তবে পরিবেশের প্রভাবজনিত সমন্বিত মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী আরো ৯ ধাপ এগিয়েছিল বাংলাদেশ।এবার দেশভিত্তিক অবস্থান ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। কভিড-১৯ অতিমারী সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হলেও, পরিবেশের উপর মানুষের ক্রমাগত অভিঘাত বন্ধ না হলে, ভবিষ্যতেও মানব জাতিকে এরূপ সংকটের মুখমুখি হতে হবে- জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) কর্তৃক প্রকাশিত মানব উন্নয়ন সমীক্ষা ২০২০ এ সতর্কবাণী প্রকাশ করা হয়েছে। আর ওই সতর্কবাণীই সত্য হওয়ার পথে বলছে বর্তমান প্রতিবেদন।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading