৭৩ বছর বয়সী চার্লসের রাজত্ব শুরু: নতুন এক অধ্যায়ে ব্রিটেন
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:২০
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুতে তার ছেলে যুবরাজ চার্লস ব্রিটেনের রাজা হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তাকে কিং চার্লস তৃতীয় বলে সম্বোধন করা হবে। পরে তিনি তার নামের অংশ চার্লস, ফিলিপ, আর্থার বা জর্জ থেকে যেকোনো একটি নাম বেছে নেবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বগ্রহণের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। পরিবর্তন করা হবে ব্রিটেনের মুদ্রা এবং জাতীয় সংগীত সবমিলিয়ে ব্রিটেনে শুরু হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
৭৩ বছর বয়সী চার্লস সাত দশক ধরে ব্রিটিশ সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী। যুবরাজ হিসেবে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চার্লস ১৯৫২ সালে মা এলিজাবেথ রানি হওয়ার পরপরই যুবরাজ হন। দীর্ঘদিন তার উপাধি ছিল প্রিন্স অব ওয়ালেশ। তবে বর্তমানে এ উপাধি তার ছেলে প্রিন্স উইলিয়ামের মাথায়। যুবরাজ চার্লস ব্রিটেনের রাজা হওয়ায় তিনি ইংল্যান্ড এবং ১৫টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশেরও নিয়মতান্ত্রিক রাজা হলেন। চার্লসপত্নী ক্যামিলা হয়েছেন কুইন কনসর্ট। বাকিংহাম প্রাসাদ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় আজ শনিবার সকাল ১০টায় অ্যাসেশন কাউন্সিলের সঙ্গে বৈঠক করবেন রাজা তৃতীয় চার্লস। এই কাউন্সিল রাজকীয় উত্তরাধিকার মনোনয়নের বিষয়টি দেখভাল করে থাকে। বেলা ১১টার দিকে সেন্ট জেমস প্রাসাদের বারান্দা থেকে জনসম্মুখে শাসনভার হস্তান্তরের বিষয়টি ঘোষণা করবে কমিটি। গত বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) স্কটল্যান্ডের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় রানির মৃত্যুর পরপরই ক্রাউন কিং হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন চার্লস। তবে এখনই কোনো আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়নি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদ বাকিংহাম প্যালেস থেকে একটি বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করা হয়। ওই বিবৃতি রাজা চার্লসের নামে জারি হয়। রানি এলিজাবেথের মৃত্যুতে রাজপ্রাসাদের তরফ থেকে বিবৃতিতে রাজা চার্লস বলেছেন, আমরা একজন লালিত সার্বভৌম এবং একজন অত্যান্ত প্রিয় মায়ের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। আমি জানি তার অভাব সারা দেশ, রাজ্য, কমনওয়েলথ এবং গোটা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ গভীরভাবে অনুভব করবেন। চার্লস এখন ৫৬টি স্বাধীন রাষ্ট্র ও ২৪০ কোটি মানুষের সংগঠন কমনওয়েলথের প্রধান হয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যসহ ১৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাজা। এসব দেশগুলো হলো- অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টিগা ও বারবুডা, বাহামা, বেলিজ, কানাডা, গ্রেনাডা, জ্যামাইকা, পাপুয়া নিউ গিনি, সেন্ট ক্রিস্টোফার অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডাইনস, নিউজিল্যান্ড, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এবং টুভালু।
যেভাবে নতুন রাজাকে বরণ করবে ব্রিটেন: ১৮ শতকের প্রথম দিকের রেওয়াজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চার্লস স্কটল্যান্ডের চার্চকে রক্ষার শপথ করবেন। তিনি উচ্চারণ করবেন, ‘গড সেইভ দ্য কিং’ (ঈশ্বর রাজাকে রক্ষা করুন)। ১৯৫২ সালের পর প্রথম ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীতে ‘গড সেইভ দ্য কুইন’-এর বদলে বসবে এ শব্দগুলো। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সিংহাসন লাভ করেছেন তার বড় ছেলে চার্লস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়মানুযায়ী রাজার পদবি সাবেক প্রিন্স অফ ওয়েলস স্বয়ংক্রিয়ভাবে, তৎক্ষণাৎ ও কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই পেয়েছেন। তবে চার্লসকে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। রানির মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা ঘোষণা করা হবে। লন্ডনের সেইন্ট জেমসেস প্যালেসে অ্যাকসেশন কাউন্সিল এ ঘোষণা দেবে। এই কাউন্সিলে থাকবেন অতীত ও বর্তমান জ্যেষ্ঠ এমপিদের একটি দল, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বেসামরিক কর্মচারী, কমনওয়েলথের হাই কমিশনাররা এবং লন্ডনের লর্ড মেয়র। এ কাউন্সিলকে প্রিভি কাউন্সিলও বলা হয়ে থাকে, এর সদস্যসংখ্যা সাত শর বেশি। তবে এবার আনুষ্ঠানিকতার সময় বেশি না থাকায় রাজা ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করবেন হয়তো অনেক কম। ১৯৫২ সালের শেষ অ্যাকসেশন কাউন্সিলে হাজির ছিলেন দুই শ সদস্য। এ আনুষ্ঠানিকতায় নতুন রাজার অংশ নেয়ার রেওয়াজ নেই। সভায় প্রিভি কাউন্সিলের লর্ড প্রেসিডেন্ট (বর্তমানে এমপি পেনি মর্ডোন্ট) রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন। ঘোষণাটি উচ্চ স্বরে পাঠ করা হবে। ঘোষণায় সাধারণত প্রার্থনা, পূর্ববর্তী রাজার প্রশংসা ও নতুনের জন্য সমর্থনের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকে।

পরিবর্তন আসছে জাতীয় সংগীতেও: অ্যাকসেশন কাউন্সিল এক দিন পর আবারও সভায় বসবে। এ সভায় রাজা উপস্থিত থাকবেন। ব্রিটিশ রাজার রাজত্বের শুরুতে অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানের মতো কোনো ‘শপথ গ্রহণ’ নেই। তবে নতুন রাজার একটি ঘোষণা রয়েছে। ১৮ শতকের প্রথম দিকের রেওয়াজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চার্লস স্কটল্যান্ডের চার্চকে রক্ষা করার শপথ করবেন। তিনি উচ্চারণ করবেন, ‘গড সেইভ দ্য কিং’ (ঈশ্বর রাজাকে রক্ষা করুন)। ১৯৫২ সালের পর প্রথম ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীতে ‘গড সেইভ দ্য কুইন’-এর বদলে বসবে এ শব্দগুলো। হাইড পার্ক, লন্ডন টাওয়ার ও নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সশস্ত্র স্যালুট দেয়া হবে এবং এডিনবার্গ, কার্ডিফ ও বেলফাস্টে চার্লসের রাজা হওয়ার ঘোষণা পাঠ করা হবে।
মধ্যমণি সেই আলোচিত মুকুট: অভিষেক হলো রাজা হিসেবে চার্লসের দায়িত্ব গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ধাপ, যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুকুট পরবেন। তবে এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, তাই সম্ভবত খুব দ্রুত এই অভিষেক অনুষ্ঠান হবে না। রানি এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেছিলেন ১৯৫২ সালে, কিন্তু ১৯৫৩ সালের জুনের আগে তার অভিষেক হয়নি। গত নয়শো বছর ধরে অভিষেক অনুষ্ঠান হয় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে। উইলিয়াম দ্যা কনকোয়ারার ছিলেন প্রথম রাজা, যার অভিষেক হয়েছিল সেখানে। আর চার্লস হবেন ৪০তম। এটি অ্যাংলিকান ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা পরিচালনা করেন আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি। আনুষ্ঠানিকতার চুড়ান্ত পর্বে তিনি চার্লসের মাথায় সেন্ট এডওয়ার্ড মুকুট স্থাপন করবেন। এটি খাঁটি স্বর্ণের তৈরি, যা ১৬৬১ সাল থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। টাওয়ার অব লন্ডনে যেসব মণিমাণিক্য রাখা আছে, এটি তার মধ্যমণি। একমাত্র রাজা বা রানির অভিষেকের সময় এটি তারা পরেন (এই কারণে নয় যে এটির ওজন ২.২৩ কিলোগ্রাম)। রাজকীয় বিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান না হলেও অভিষেক একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। সরকার এই অনুষ্ঠানের খরচ বহন করে এবং সরকারই এর অতিথি তালিকা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয়। এই অনুষ্ঠানে গানবাজনা হয়, হয় পাঠ এবং রীতি পালন। ব্যবহার করা হয় কমলা, গোলাপ, দারুচিনি, কস্তুরি এবং অম্বর। পুরো দুনিয়ার সামনে নতুন রাজা অভিষেক শপথ গ্রহণ করবেন। এসব আনুষ্ঠানিকতার সময় তিনি নতুন দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে রাজদণ্ড গ্রহণ করবেন। আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি তার মাথায় খাঁটি সোনার মুকুট পরিয়ে দেবেন।

ব্রিটিশ মুদ্রা, ডাকটিকিটেও আসছে পরিবর্তন: ব্রিটেনের বাসিন্দাদের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় রানি এলিজাবেথের নাম। দৈনন্দিন ব্যবহারের মুদ্রা থেকে অনেক কিছুতেই ব্যবহৃত হয়েছে তার ছবি ও প্রতীক। রানির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেসব ক্ষেত্রে আসছে পরিবর্তন। রাজপরিবারের রীতি অনুযায়ী, এই জিনিসগুলোতে প্রতীকী হিসেবে থাকেন বর্তমান রাজা বা রানি। ৭০ বছর ধরে সিংহাসনে থাকা এলিজাবেথের মৃত্যুর পর এবার রাজা প্রিন্স চার্লসের নাম ও ছবি বসবে এসব জিনিসে। রানির মৃত্যুর পর এরই মধ্যে ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্য ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড দেশের ব্যাংক নোটে রানির ছবি বদলের ঘোষণা দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের ব্যাংকনোটে প্রথম সম্রাট হিসেবে রানির আইকনিক প্রতিকৃতিগুলো আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের সমার্থক। রানির চিত্র সমন্বিত বর্তমান ব্যাংকনোটগুলো এখন আইনি দরপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে জানানো হয় এতে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শোকের সময় শেষ হলে বিদ্যমান ব্যাংকনোট নিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় রানি এলিজাবেথের প্রতিকৃতিসহ ১ ডলারের নোটটি ১৯৬০ সালে প্রথম তৈরি করা হয়। কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও পূর্ব ক্যারিবিয়ান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাতেও এই প্রতিকৃতি রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে এই মুহূর্তেই মুদ্রায় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা নেই। নোটগুলো প্রতিস্থাপন করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে আর কয়েন পরিবর্তন করতে লাগবে আরও বেশি সময়। শুধু মুদ্রা নয়, বরং রানির মৃত্যুতে পরিবর্তন আসছে আরও বেশ কিছু বিষয়ে। এর মধ্যে আছে ডাকটিকিটও। এতদিন ধরে ডাকটিকিটে ব্যবহার হওয়া রানির ছবি বদলে এতে ব্যবহার করা হবে রাজা চার্লসের ছবি। যোগ হবে বিশেষ কোড।
ইউডি/সুপ্ত

