বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন: নতুন বছরে বিশ্বজুড়ে বড় মন্দার শঙ্কা

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন: নতুন বছরে বিশ্বজুড়ে বড় মন্দার শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:২৫

আগামী বছর বিশ্বে মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক। নতুন এক প্রতিবেদনে এমনই শঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে আর্থিক খাতের এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতি সামান্য ঝাঁকি খেলেও সেটা বিশ্ব মন্দার কারণ হতে পারে। দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর একই সময়ে সুদের হার বাড়ানোই বিশ্ব মন্দার নেপথ্যের কারণ বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক। বিস্তারিত জানাচ্ছেন খান সিফাত।

কোনো দেশে পরপর দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি তথা মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকুচিত হলে সেটাকে মন্দা বলা হয়। করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে তা এখনও কাটেনি। এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে সংকটে ফেলে দিয়েছে। সামরিক যুদ্ধের বিপরীতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো শুরু করেছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ। তারা এক-অন্যের বিরুদ্ধে দিচ্ছে নানা নিষেধাজ্ঞা। এতে কেবল রাশিয়া বা ইউক্রেন সংকটে পড়ছে তা নয়, প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি আগে থেকেই ছিল, এখন যুক্ত হচ্ছে নিম্ন প্রবৃদ্ধি। নতুন এক মন্দার মুখে সারা বিশ্ব।

এদিকে এরইমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়া মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল সরকারি অর্থব্যবস্থা এবং করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। এতে লঙ্কান সরকারের অন্যতম রাজস্ব আয়ের খাত পর্যটনশিল্প ধসে পড়েছে, বিদেশি রেমিট্যান্স পৌঁছেছে তলানিতে। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত আমেরিকাও করোনা সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনই এক সময়ে বিশ্ব মন্দার ঝুঁকির কথা শোনাল বিশ্ব ব্যাংক।

এবারই প্রথম দ্রুত গতি হারিয়েছে প্রবৃদ্ধির চাকা
নতুন এক প্রতিবেদনে আর্থিক খাতের আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিন অর্থনীতির অঞ্চল আমেরিকা, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটা স্লথ হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতি সামান্য ঝাঁকি খেলেও সেটা বিশ্ব মন্দার কারণ হতে পারে। তাদের দায়ের করা কারণ গুলোর মধ্যে, ১৯৭০ সালের পর মন্দার ধকল কাটিয়ে ওঠার পর এবারই প্রথম বিশ্ব প্রবৃদ্ধির চাকা এত দ্রুত গতি হারিয়েছে।

এর মধ্যে আমেরিকা, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতির চাকা সবচেয়ে বেশি স্লথ হয়েছে। এর আগের মন্দার আগে ভোক্তারা যেভাবে বাজারের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছিলেন, এবার তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বাজারে। দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেভাবে একসঙ্গে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে, শুধু সেই চেষ্টায় হয়ত মূল্যস্ফীতির হারকে মহামারীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

আগামী বছর মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ শতাংশ
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একইসঙ্গে যে মাত্রায় সুদের হার বাড়িয়েছে, গত পাঁচ দশকে তা দেখা যায়নি। এই প্রবণতা আগামী বছর পর্যন্ত চলতে পারে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মুদ্রানীতিতে সুদের হার প্রায় ৪ শতাংশে উন্নীত করবে, যা ২০২১ সালের গড় তুলনায় ২ শতাংশ পয়েন্টের বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, সরবরাহ ব্যাহত না হলে এবং শ্রম বাজারের চাপ কম না হলে সুদের হার ওই পরিমাণ বৃদ্ধিতে আগামী বছর বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা গড়ে মহামারী শুরুর আগের পাঁচ বছরের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেন, “বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ মন্দায় পড়ার কারণে তা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। আমার উদ্বেগ হল, এই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এর দীর্ঘস্থায়ী ফল উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতির নিম্ন হার, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য নীতিনির্ধারকদের ব্যয় কমানো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূলধন বরাদ্দের কৌশল নির্ধারণ করা উচিত, যা প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

বিশ্ব ব্যাংকের লোগো

মন্দার ঝুঁকি না বাড়িয়েই মূ্ল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, মূ্ল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত এবং বিশ্বব্যাপী মন্দার ঝুঁকি না বাড়িয়েই সেটা করা সম্ভব। সেজন্য বিভিন্ন নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আর উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। শ্রম-বাজারের সীমাবদ্ধতা কমানো, বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক সমন্বয় এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।

এর আগে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফও এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতির চাকা আরও স্লথ হয়ে যাওয়ার ইংগিত দিয়েছে। জুলাই মাসের প্রাক্কলনে আইএমএফ বলেছিল, ২০২২ সালে বিশ্বের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ২.৯ শতাংশ বাড়তে পারে। আগামী মাসে নতুন প্রতিবেদনে সংশোধিত হার প্রকাশ করবে তারা। তবে আইএমএফ এর মুখপাত্র গেরি রাইস বলেছেন, কিছু দেশ আগামী বছর মন্দার কবলে পড়লেও সেটা বিশ্ব মন্দার রূপ পাবে কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

সুদহার বাড়ানোর পক্ষে নন অর্থমন্ত্রী
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উপায় হিসেবে অনেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানোর কথা বললেও এর পক্ষে নন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে এবিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন মত দেন। তিনি বলেন, “আমাদের মতো দেশে সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ব্যাংক খাতে সুদের হার ৯ ও ৬ শতাংশ যেভাবে কার্যকর করেছি, তা ভালোভাবেই চলছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কাজে লাগানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই কাজটি করে থাকে।”

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ব্যাংক খাতে সুদের হার ঋণে সর্বোচ্চ ৯ ও আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ কার্যকর আছে। ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষের দাবির প্রেক্ষিতেই সুদহার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকার মধ্যে গত মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতিতে আরেক দফায় উল্লম্ফন ঘটে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়িয়ে বাজারে টাকার সরবরাহ কমানোর কথা বলছেন কেউ কেউ। অপর দিকে বর্তমানে যেভাবে ডলারের দাম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে ভবিষ্যতে তা না করে প্রধান এ বিদেশ মুদ্রার দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালু করার চিন্তা আছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো যেভাবে মুদ্রাবাজার নিয়ে কাজ করে, সেভাবেই চিন্তা করব। তারা যেভাবে ঠিক করে দেয়, সেভাবেই ঠিক করে দেব এবং আমরা ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক লেনদেনে যাব।”

‘মন্দার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে’
ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে নীতি সুদহার বাড়িয়েছে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। মূলত করোনা ভাইরাসজনিত বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী যে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয়, তার জেরে আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতির হার রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। এর আগে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ডুডলি সতর্ক করেছিলেন যে, একটি মন্দা এখন ‘কার্যত অনিবার্য’। মন্দার পূর্বাভাস বিষয়ে বিশেষঞ্জ ডিউক ইউনিভার্সিটির ফুকা স্কুল অফ বিজনেসের অধ্যাপক ক্যাম্পবেল আর হার্ভে বলেছেন, ‘আমরা একটি কঠিন সমস্যা পেয়েছি। মন্দার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।’

উত্তরদক্ষিণ । ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

কত দেশ মন্দার শঙ্কায়?
ছোট–বড় কিংবা উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে বিশ্বের বহু দেশ এখন প্রবল অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি আমেরিকার জিডিপি পরপর দুই প্রান্তিকে, আর ব্রিটেনের জিডিপি এক প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছে। এভাবে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বহু দেশ মন্দায় পড়তে পারে। জাপানের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নোমুরা বলেছে, আগামী এক বছরের মধ্যে বিশ্বের বড় বড় অনেক অর্থনীতি মন্দায় পড়বে।

এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা কঠোর করতে গিয়ে কিছু ভুল করে বসবে, যা কিনা সংকট-মন্দা ত্বরান্বিত করতে পারে। সংকট-মন্দার ঝুঁকিতে থাকা উল্লেখযোগ্য উন্নত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা। ঋণ সংকটের কারণে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে পারে আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, ইথিওপিয়া, ঘানা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, লেবানন, রাশিয়া, সুরিনাম ও জাম্বিয়া।

মন্দার ঝুঁকি কমার দাবি জেপি মর্গান ব্যাংকের
এদিকে, উলটো কথা বলছে আমেরিকাভিত্তিক বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গান অ্যান্ড চেজ। তাদের এক প্রতিবেদনে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার যে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল, ধীরে ধীরে তা কেটে যেতে পারে। এবারের মত মন্দার ঝুঁকি এড়াতে পারে বিশ্ব। জ্বালানী তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ধীরে ধীরে কমতে থাকায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠছে বলে জেপি মর্গানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর মূল্যস্ফীতি কমতে থাকায় কমে আসছে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি। এর আগে আগস্টের শেষ সপ্তাহে আমেরিকার অপর এক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের এক নোটে মন্দার ঝুঁকি কমে আসার আভাস দেওয়া হয়।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply