বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা বাড়বে, রাশিয়াকে সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান ইইউর

বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা বাড়বে, রাশিয়াকে সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান ইইউর

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ২০:১৫

বৈশ্বিক খাদ্য সংকট লাঘবে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত খাদ্যশস্য রপ্তানি চুক্তি থেকে রাশিয়ার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলে মস্কোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রবিবার (৩০ অক্টোবর) ইইউ এই আহ্বান জানালেও ইউক্রেন বলেছে, মস্কো পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে।

এর আগে, শনিবার (২৯ অক্টোবর) অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের বৃহত্তম বন্দরনগরী সেভাস্তোপলের কাছে কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার অভিযোগে খাদ্যশস্য চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয় মস্কো। এক বিবৃতিতে মস্কো বলেছে, ইউক্রেনের বন্দর থেকে কৃষি পণ্য রপ্তানির চুক্তি বাস্তবায়‌নে রাশিয়ার অংশগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক টুইট বার্তায় বলেছেন, কৃষ্ণ সাগর চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করার রুশ সিদ্ধান্ত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শস্য ও সারের প্রধান রপ্তানির পথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। রাশিয়াকে তার সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার শস্য চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপকে ‘একেবারে আপত্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা বৃদ্ধি করবে। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মস্কোর বিরুদ্ধে খাদ্যকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আমেরিকার বিরুদ্ধে পাল্টা তোপ দেগেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মস্কোর পদক্ষেপের ব্যাপারে ওয়াশিংটন মিথ্যাচার করেছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, শনিবার ভোররাতে ইউক্রেন ১৬টি ড্রোন দিয়ে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপলের কাছে কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবহরে হামলা চালিয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ‌বিশেষজ্ঞরা এই সন্ত্রাসী হামলা সমন্বয়ে সহায়তা করেছে।

রাশিয়া বলেছে, কৃষ্ণ সাগর বন্দর থেকে ইউক্রেনের শস্য করিডোর নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত জাহাজগুলোর একটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে রুশ সৈন্যরা ইউক্রেনীয় এই ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেছেন, শস্য করিডর থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরের বিস্ফোরণকে উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপের জন্য মিথ্যা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে মস্কো।

টুইটারে দেওয়া বার্তায় ইউক্রেনের এই মন্ত্রী বলেছেন, রাশিয়া আগেই এই পরিকল্পনা করেছিল। রাশিয়া অনেক আগেই পুনরায় ‘হাঙ্গার গেম’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এখন সেটিকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ আন্দ্রি ইয়ারমাক রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‌‘নিজেদের স্থাপনায় কাল্পনিক সন্ত্রাসী হামলার’ নাটক সাজানোর অভিযোগ করেছেন।

এছাড়া যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গত মাসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছে রাশিয়া। শনিবার ব্রিটেন বলেছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মস্কো এই ভুয়া অভিযোগ করেছে।

বিশ্বের অন্যতম দুই প্রধান খাদ্য ও জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে ৮ মাসের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক এই সংকটের সমাধানে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গত ২২ জুলাই কিয়েভ এবং মস্কোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনে আটকা আড়াই কোটি টন গম ও ভুট্টা বিশ্ববাজারে সরবরাহের লক্ষ্যে তুরস্কে ওই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

চুক্তির ফলে ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম কমবে বলে আশা করা হয়। চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির কাজ তদারকির জন্য তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যৌথ সমন্বয় কেন্দ্র (জেসিসি) চালু করা হয়।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনে আটকা শস্য বহনকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ যেন নিরাপদে কৃষ্ণসাগরে চলাচল করতে পারে, সেজন্য তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় একটি যৌথ সমন্বয় কেন্দ্র খোলা হয়। সেই কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে জাতিসংঘ, রাশিয়া ও তুরস্ক।

ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর বহুল আলোচিত এই চুক্তি থেকে রাশিয়ার বিদায় আট মাসের যুদ্ধে নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধে দখলকৃত কিছু এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন রুশ সৈন্যরা। রাশিয়ার অনবরত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশেরও বেশি ধ্বংস হয়েছে, বলছে রয়টার্স।

চলমান এই যুদ্ধে উভয়পক্ষ তেজস্ক্রিয় বোমা বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত বলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। জেলেনস্কি জাতিসংঘ এবং বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর জি২০ জোটকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় ব্যাপক মাত্রার দুর্ভিক্ষ ফিরিয়ে আনতে ‘একেবারে স্বচ্ছ প্রচেষ্টা’ চালাচ্ছে রাশিয়া। জি২০ জোট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন জেলেনস্কি।

এদিকে, মস্কো সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বৈঠকে বসে সেভাস্তোপল হামলার বিষয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার উপ-রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি পোলিয়ানস্কি এক টুইট বার্তায় এই আহ্বান জানিয়েছেন।

খাদ্যশস্য চুক্তির সমন্বয়ক জাতিসংঘ কর্মকর্তা আমির আব্দুল্লা বলেছেন, রোববার কৃষ্ণ সাগরের মানবিক করিডরে প্রবেশ এবং সেখান থেকে যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় আছে শস্যবাহী অন্তত ১০টি জাহাজ। তবে এখন পর্যন্ত এসব জাহাজ চলাচলের বিষয়ে কোনও চুক্তি হয়নি।

ইউডি/আতা

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading