একসঙ্গে একাধিক প্রেমের বাসনা, আপনি পলিঅ্যামোরিতে ভুগছেন

একসঙ্গে একাধিক প্রেমের বাসনা, আপনি পলিঅ্যামোরিতে ভুগছেন
‘সমাজ এইসব সম্পর্ককে দেখে সামাজিক ও আর্থিক সুবিধা বুঝে। এই সব জটিলতা এড়াতেই সে নিজস্ব কিছু নিয়ম চালু করে ও সেখানে যৌনতাকেও জুড়ে দেয়। তবে মনে রাখা দরকার, সম্পর্ক কিন্তু মোটেও শরীরসর্বস্ব নয়। শরীরে একজনের হয়ে মনে মনে দুজনের হয়ে থাকাও যা, মন ও শরীর উভয়েই দুজনের হয়ে থাকায় কোনো ফারাক নেই।’

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০

এই ভুবনে মানুষ অহরহ প্রেমে পড়ে, কখনো জেনেশুনে, কখনো নিজের অজান্তে। প্রেম কিংবা ভালোবাসার অন্যন্য এই অনুভূতির জন্য মানুষ গড়েছে নানা কীর্তি।

কেউবা নিয়েছে জীবনের ঝুঁকি, কেউবা আবার সাধন করেছে দুঃসাধ্যকে। কেউবা আবার ভালোবেসে সমাজের চোখে হয়েছে কলঙ্কিত।

ভালোবাসার অনুভূতি ঠিক যতটাই সরল, ততটা আবার জটিলও। মানুষের মনের অলিগলির কিনারা খুঁজে পায়নি মানুষ নিজেই। কখন মন কার প্রেমে পড়ে সে নিজেও জানে না। কারো কারো ক্ষেত্রে তো একজনের সঙ্গে সম্পর্কে থাকার পরও ঝুঁকে পড়ে অন্যের দিকে।

অনেকের মনেই তাই প্রশ্ন, প্রেম মানেই কি মনের দুয়ারে একজনই দাঁড়িয়ে? আধিপত্যও কি তার একার?

একাধিক ব্যক্তি মনে ঠাঁই পেলেই সামাজের চোখরাঙানি, হাজারো জবাবদিহি, চরিত্র নিয়ে কাটাছেঁড়া। কিন্তু সত্যিই কি এটা অন্যায়?

দেশ-বিদেশের নানা গবেষণা বলছে, অনেকের মনেই ঘাপটি মেরে থাকে তৃতীয় আরেকজন বা একাধিক জনের প্রতি টান। সেই টানে কেউ কেউ সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ান, কেউ বা সমাজের ভয়ে ঢোঁক গেলেন সেখানেই। কিন্তু কেন এমন হয়? কী বলছে বিজ্ঞান?

যার সঙ্গে সম্পর্কে আছেন, তাকেও ভালোবাসছেন আবার অন্য কাউকেও ভালোলাগে, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিল মনোবৃত্তির নাম পলিঅ্যামোরি বা কনসেন্সুয়াল ননমোনোগ্যামি।

মনোবিদদের মতে, প্রত্যেকটি মানুষই বিভিন্ন পৃথক বৈশিষ্ট্যযুক্ত হন। একজন মানুষের মধ্যে সবটুকু পছন্দের বৈশিষ্ট্য যে মিলবেই, এমন নয়। তাই ভালো লাগার কোনো গুণ বা স্বভাব থেকে প্রেম বা ভালবাসার অনুভূতি একাধিক জনের প্রতি জন্মাতে পারে।

মনোবিদদের মতে, এ ধরনের মনোবৃত্তি অস্বাভাবিক কিছু নয়। পিটুইটারি গ্রন্থি ও ফিল গুড হরমোনরাই পলিঅ্যামোরির জন্য দায়ী।

তবে বিজ্ঞানের ভাষায় এটি অস্বাভাবিক না হলেও বাস্তব জীবনে এর পরিণতি ভয়বাহ। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ। অনেকেই মানসিকভাবে অনেক দৃঢ়চেতা হন, কষ্ট হলেও তারা এ ধরনের মনোবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

আবার অনেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জড়িয়ে পড়েন একাধিক সম্পর্কে। নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা কিংবা জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা, দু’ক্ষেত্রেই আপনি একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শের জন্য যেতে পারেন।

গবেষণা বলছে, পলিঅ্যামোরিতে যারা ভুগছেন তার বেশিরভাগই নিজের অজান্তেই ভুগছেন। অর্থাৎ, তারা এ সমস্যা সম্পর্কে জানেন না। তাই, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আরেকজনের প্রতি দুর্বলতা দেখা দিলে সেটি নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গেও খোলাখুলি আলোচনার পরামর্শ মনোবিদদের।

এ প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘জন্মের শুরু থেকেই একসঙ্গে দুজনকে অর্থাৎ মা-বাবাকে ভালোবাসে মানুষ। কাজেই একসঙ্গে দুজনকে ভালোবাসার ক্ষমতা তার জন্মগত। কিন্তু যখনই সম্পর্ক বা দাম্পত্যের কথা আসে, তখনই আমরা সতর্ক হয়ে যাই।

‘আসলে সমাজ এইসব সম্পর্ককে দেখে সামাজিক ও আর্থিক সুবিধা বুঝে। এই সব জটিলতা এড়াতেই সে নিজস্ব কিছু নিয়ম চালু করে ও সেখানে যৌনতাকেও জুড়ে দেয়। তবে মনে রাখা দরকার, সম্পর্ক কিন্তু মোটেও শরীরসর্বস্ব নয়। শরীরে একজনের হয়ে মনে মনে দুজনের হয়ে থাকাও যা, মন ও শরীর উভয়েই দুজনের হয়ে থাকায় কোনো ফারাক নেই।’

তিনি বলেন,‘কেউ দুজনকেই ভালোবাসি বললে, তাকে ‘‘মিথ্যে’’ বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আমাদের রয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সেখানে। কিন্তু অনেকেই দায়-দায়িত্ব দুজনের ক্ষেত্রেই পালন করেন। এখানে অবশ্যই সঙ্গের মানুষদের অভিমান বা কষ্টের বিষয়টি আলাদা প্রসঙ্গ। কিন্তু কেউ দুজনকে ভালোবাসার দাবি করলে তা মিথ্যে নয়।’

তার মতে, ‘এই জটিলতার অন্যতম কারণ আমাদের সমাজ এখনও ভালবাসা ও যৌনতাকে পৃথক ভাবার মতো সাবলীল হতে পারেনি। তাই দুজনকে ভালোবাসার কথায় আঁতকে ওঠে। প্রতিটি ভালোবাসাতেই যে যৌনতা থাকবে, তার কোনো মানে নেই। আবার ভালোবাসাহীন যৌনতার সম্পর্কও হতে পারে। আবার স্রেফ যৌন ইচ্ছে পূরণের জন্য ভালবাসা তৈরি করতে গিয়েই সমস্যার সূত্রপাত করেন অনেকে।’

তবে ভালবাসার মধ্যেও রকমফের হয়। কিছু ভালবাসা হয় ঘরের মতো, যেখানে নিজের মতো করে শ্বাস নেওয়া যায়, মুক্তির স্বাদ আসে। আবার কিছু ভালবাসা হয় সপ্তাহান্তে একবার দেখতে পাওয়ার উল্লাসের মতো।

আপনার প্রায়োরিটি লিস্টে কোনটা এগিয়ে, এবার সেটা আপনাকেই বিচার করতে হবে। কারণ দিন শেষে প্রয়োজন মেটানোর হাত এগিয়ে এলে সেটাকে আগলে নিলে জটিলতা এড়ানো যায় বলেই মত মনোবিদদের।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading