পাঁচ সিটি নির্বাচন-বিপাকে বিএনপি: মির্জার গর্জন ও ভোটের মাঠে ‘উকিল সাত্তার’ বাস্তবতা
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪০
আসন্ন পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে দাবি করা দলটির একাধিক প্রার্থী ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। যদিও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্য, কোনো কৌশলেও সিটি নির্বাচনে থাকবে না বিএনপি। শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনের সেই ‘উকিল সাত্তার’ মডেলে যদি কেউ প্রার্থী হয়ে যায় তা বিএনপি হাইকমান্ডকে কঠিন চাপে ফেলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
ফখরুলের বার্তা: কৌশল করেও ভোটে থাকবে না বিএনপি: যে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল হয়েছে, তার কোথাও ‘কৌশল করে’ বিএনপি অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির গতবারের প্রার্থীর ভাতিজার ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা এবং আরও কয়েকটিতে দলের নেতাদের অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিতের পর এমন প্রতিক্রিয়া দিলেন ফখরুল।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি যে, কোনো রকমের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি না। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, এখানে মেয়র নির্বাচনই বলেন বা কমিশনার নির্বাচনই বলেন, এখানে আমাদের দলের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না। শনিবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এর আগে একাধিকবার তিনি বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। দলীয় সূত্রের দাবি, সিটিগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে বিএনপি’র। মির্জা ফখরুল বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোয় জনগণ অংশগ্রহণ করছে না, ভোটাররা কেন্দ্রে যাচ্ছে না। সম্প্রতি যে ভোট হয়ে গেল (চট্টগ্রামে উপনির্বাচন), সেই ভোটে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে গেছে। সুতরাং জনগণ বোঝে, মানুষ বোঝে, গোটা বিশ্ব বোঝে, এ সরকার ক্ষমতায় থাকলে কোনো দিনই কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, জনগণ সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না। সে কারণেই আজ আওয়ামী লীগ এসব কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন, ১২ জুন খুলনা ও বরিশাল এবং ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রাখছেন সিলেটের আরিফুল: সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবারও প্রার্থী হবেন কী না তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটছে না। বরং আরিফের বিভিন্ন বক্তব্যে এ নিয়ে আরো রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যের দায়িত্বে রয়েছেন। বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটেন সফরে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার ইঙ্গিত দেন আরিফ। তবে সেখান থেকে ফিরে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া আরিফের বক্তব্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আভাস মিলেছে।বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আরিফুল হক নাগরিক কমিটির ব্যানারে প্রার্থী হতে পারেন বলে আরিফের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনও জানিয়েছেন। এমন আলোচনা-গুঞ্জনের মধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার একদিন আগে ১ এপ্রিল হঠাৎ করেই লন্ডন সফরে যান আরিফ। এ ব্যাপারে আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, দল নির্বাচনে না গেলেও সিলেটের জনগণ চাচ্ছেন আমি যেনো প্রার্থী হই। আবার ইভিএমে ভোট সুষ্ঠু হবে কী না এ নিয়েও তাদের শঙ্কা আছে। এসব বিষয়ে দল এবং সিলেটের নাগরিক সবার সাথে আলোচনা করে আমি দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেবো। আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে মনোনয়নপত্র দাখিল এর শেষ দিনের আগেই নগরবাসীকে নিয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করবেন বলে জানান।
তৃণমূল বিএনপি’র সমর্থন নিয়ে গাজীপুরে লড়বেন রনি: গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সরকার শাহ নূর ইসলাম রনি। তিনি কারান্তরীণ বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে এবং বিগত নির্বাচনে বিএনপিদলীয় মেয়র প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকারের ভাতিজা। যদিও রনি দলের কোনো পদে নেই। অবশ্য গাজীপুর সিটির ৫৭টির মধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই বিএনপির পদধারী নেতা ও সাবেক নেতারা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রনি গণমাধ্যমকে বলেন, দলীয়ভাবে নির্বাচনে না এলেও তার সঙ্গে ‘বিএনপির সমর্থন’ রয়েছে। তিনি বলেন, আমি যেহেতু বিএনপি পরিবারের সন্তান। আমার চাচা, বাবা সবাই বিএনপি করেন। আমি ইতোমধ্যে অনেকগুলো উঠোন বৈঠক করেছি। তৃণমূল কর্মীদের সমর্থন পেয়েছি। যার কারণে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করব’। রনি আরও বলেন, বিএনপি হয়তো নির্বাচনে আসছে না, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপির আমার প্রতি সমর্থন রয়েছে। আমি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বরিশালে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা দিতে চান রূপন: বরিশাল সিটি করপোরেশনে ভোট করার ঘোষণা দিয়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছেন সাবেক মেয়র আহসান হাবীব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রূপন। যদিও দলটির নেতারা বলছেন, তিনি দলের কেউ নন। রূপনের বাবা বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কামাল ২০১৩-১৮ মেয়াদে বিএনপির হয়ে মেয়র পদে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। বাবার অনুসারীদের ‘সহানুভূতি’ ছাড়াও দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন সাবেক ছাত্রদল নেতা রূপন। বরিশাল মহানগরীর রাজনীতিতে কামালের একটা প্রভাব রয়ে গেছে। বাবার হাত ধরে রাজনীতিতে আসা রূপন সেটাকেই ভিত্তি ধরে এগোচ্ছেন ভোটের মাঠে। আগামী ১২ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হতে চাইছেন তিনি। রূপন বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মানদø জনগণের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য সেই বিষয়টি প্রমাণের জন্যই তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। রূপন দাবি করেছেন, তিনি জীবনের পাঁচ ভাগের একভাগ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে থেকে কাটিয়েছেন। তবে আগামী নির্বাচন নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এখনও কোনো ইঙ্গিত বা নির্দেশ তিনি পাননি। নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছায়ই প্রার্থী হয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দল নির্বাচনে যাবে কি না, সেই বিষয়টি দলীয় হাই কমান্ডের উপর নির্ভর করছে। তারা যদি ভেবেচিন্তে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সিদ্ধান্তে আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে। বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সবাই যে নির্বাচনে যেতে ইচ্ছুক এমনটাও নয় বলে জানান রূপন। তবে সেই সঙ্গে বলেন, আবার অনেকে যেতে চায়। নির্বাচনে গেলে দলের আন্দোলনের ক্ষতি হবে কি না- এই প্রসঙ্গে রূপন বলেন, বিএনপির আগে ছিল ২৭ দফা আন্দোলন। এখন ১০ দফা আন্দোলন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া দল নির্বাচনের যাবে না। যদি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, তাহলে অংশ নেওয়া উচিৎ হবে। এরপর অন্যান্য দাবি আদায় করা যাবে।
খুলনায় লড়তে আগ্রহী মঞ্জু, রাজশাহীতে সময়ের অপেক্ষা: খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। গত নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নজরুল ইসলাম মঞ্জু গণমাধ্যমকে বলেন, তবে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি’র নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত। আওয়ামী লীগকে খালি মাঠ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন সাবেক মেয়র ছিলেন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। আগামী সিটি নির্বাচনে সম্পর্কে বুলবুল গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের প্রধান দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও খালেদা জিয়া ম্যাডামের মুক্তি। ম্যাডামকে মুক্ত না করে দলীয় সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়ে আমি স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচন করবো না। বিএনপি থেকে কেউ স্বতন্ত্রভাবে করবে কিনা সেটাও আমার জানা নেই। আমি মনে করি এ সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না। তবে বিভিন্ন সূত্র তেকে জানা যায় এ সিটিতেও বিএনপি’র দলীয় নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শেষপর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন রাজশাহী মহানগরীর আলোচনায় থাকা নেতাদের কেউ কেউ।

বিএনপি’র দশা: শ্যাম রাখি না কূল রাখি: এবার সিটি নির্বাচনে কৌশলী হতে পারে বিএনপি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, দলের একটি অংশ চায় জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচ সিটিতে স্বতন্ত্র দিয়ে সরকারকে চাপে রাখতে, যেখানে সরকার কারচুপি করে নির্বাচন করলেও তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচনের দাবি আরো জোরালো হবে, আর নির্বাচনে জিতলে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা হবে, তারা আন্দোলনে আরো সক্রিয় হবে। এছাড়াও নতুন নির্বাচন কমিশনের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে যাওয়া উচিত, কারণ ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন না করতে পারলে দেশে-বিদেশে সরকার আরো বেশি বিতর্কিত হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি দেশে-বিদেশে আরো জোরালো হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংস্থা ফেমার প্রধান মুনিরা খান গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি যদি সিটি নির্বাচনে অংশ না নেয় এবং এই নির্বাচন ভালো হয়, তা দলটিকে অস্বস্তিতে ফেলবে। কারণ, দেশের মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তখন সরকার দেখানোর চেষ্টা করবে যে এই সরকারের অধীনেই ভালো নির্বাচন হচ্ছে।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

