গাজীপুর সিটি নির্বাচন: তাহলে মায়ের প্রার্থীতা হচ্ছে জাহাঙ্গীরের ট্রামকার্ড!

গাজীপুর সিটি নির্বাচন: তাহলে মায়ের প্রার্থীতা হচ্ছে জাহাঙ্গীরের ট্রামকার্ড!

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৭ মে ২০২৩ । আপডেট ১২:৫০

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর প্রার্থীতা ফেরত পাওয়ার আপিলও খারিজ হয় বহিষ্কৃত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার মা জায়েদা খাতুন অংশ নিচ্ছেন আসন্ন এই সিটি নির্বাচনে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ থেকে ক্ষমা পাওয়া জাহাঙ্গীর মূলত মা-কে সামনে রেখেই দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন বলে সব মহলে আলোচনা চলছে। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন

দল ও সরকারকে পাশ কাটিয়ে মাঠে জাহাঙ্গীরের নানান কৌশল

আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই নির্বাচনী উত্তাপ ছাড়চ্ছে গাজীপুরসহ সারাদেশে। এই সিটিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন আজমত উল্লা খান। কিন্তু সংগঠনের স্বার্থ পরিপন্থি কার্যক্রম ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে ক্ষমা পাওয়া বহিস্কৃত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া সবাইকে চমকে দেয়। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিন তার বক্তব্য নিয়েও ছিলো আলোচনা-সমালোচনা। তিনি বলেছিলেন, তার এমন সিদ্ধান্তে গুম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা নিঃসন্দেহে দলের ভাবমূতির্তে আঘাত হানে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ।
যদিও পরবর্তীতে ঋণখেলাপির দায়ে তার প্রার্থীতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশন, এরপর আপিলেও তা খারিজ হয়। কিন্তু এখানেই থেমে থাকছেন না জাহাঙ্গীর। প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে যাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে নির্বাচনে লড়তে কৌশলি পন্থা অবলম্বন করছেন জাহাঙ্গীর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। কেননা, এই সিটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন তার মা জায়েদা খাতুন। কোনো ধরণের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকায় তাকে নিয়ে কোনো প্রশ্নেরও অবকাশ নেই।
তবে মায়ের ছায়ায় মূলত আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্ব›দ্বীতা গড়ে তুলতে চান জাহাঙ্গীর বলে জোড় গুঞ্জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, আওয়ামী লীগ থেকে যে শর্তে তাকে ক্ষমা করা হয়েছে তা পুরোপুরি লঙ্ঘন করছেন তিনি। শুরুতেই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাওয়া এবং পরবর্তীতে নিজ দলের বিরুদ্ধে গিয়ে মা-কে নির্বাচনে প্রার্থী করা পুরোটাই দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধী হিসেবেই দেখছেন দলটির নেতৃস্থানীয়রা।

জনসমক্ষে জায়েদা: ছেলের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়বেন

প্রায় ৭০ বয়স্ক জায়েদা খাতুনের রাজনীতিতে তেমন কোন হাতেখড়ি না থাকলেও নেমেছেন নির্বাচনে। ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন বলে জানান তিনি। সরকারের বিরুদ্ধে নয়, ছেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ হিসেবে গাজীপুর সিটিতে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে থাকবেন জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন।জাহাঙ্গীরের মা নয়, সবার মা হিসেবে গাজীপুরবাসী তার সাথে থাকবে বলে আত্মবিশ্বাস স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মিথ্যা ও ভুয়া অভিযোগ তুলে গত ১৮ মাস ধরে আমার ছেলের ওপর অনেক অবিচার হয়েছে। তার সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাই আমি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারলে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আমার ছেলের অসমাপ্ত কাজ, রাস্তা-ঘাট যেগুলো অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে সেগুলোসহ সব ধরনের কাজ করে যাবো।

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড কঠোর

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আবার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। সম্প্রতি গাজীপুর সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের যৌথ কর্মীসভায় যোগ দিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

মির্জা আজম

আজম বলেন, জাহাঙ্গীর আলম দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার পরও শেখ হাসিনা তাকে একবার সাধারণ ক্ষমা করেছেন। ক্ষমা চেয়ে আবেদনে উল্লেখ করেছিলেন, বাকি জীবনে আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলা পরিপন্থি কোনো কাজ করবেন না। সেটির ব্যত্যয় ঘটিয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। ফের দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, এ অপরাধ জাহাঙ্গীর আলমকে শাস্তি পেতেই হবে। মির্জা আজম আরও জানান, জাহাঙ্গীরের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও গাজীপুরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সবাই একমত, নেত্রী দেশে এলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে অথবা প্রধানমন্ত্রী জানাবেন, তিনি কখন কী করবেন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে কারা কাজ করছেন না, সেটিও নজরদারিতে রাখার কথা বলেন দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।

নেপথ্যের মদদদাতা ‘গার্জিয়ান’ কারা?

জাহাঙ্গীর আলম প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে দলীয় ‘গার্জিয়ান’ তথা মুরুব্বীর প্রসঙ্গ তুলে আনেন। তাদের থেকে পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ারও কথা বলেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে আওয়ামী লীগে জাহাঙ্গীরের গার্জিয়ান কারা? তারা কি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ কোনো নেতা নাকি জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র পদধারী। কাদের মদদে জাহাঙ্গীর দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়, কিংবা নির্বাচনী মাঠে লড়তে চায় এমন প্রশ্ন এখন খোদ আওয়ামী লীগেই। কেননা ভোটের মাঠে বিভক্তি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জন্যই হুমকি তৈরি করছে। তাছাড়া দলীয় কোন্দলও বাড়াচ্ছে এ ধরণের কর্মকান্ডে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা প্রসঙ্গে জাগাঙ্গীর গণমাধ্যমকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে যা বলবেন আমি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেব। অন্য কারও সিদ্ধান্ত নয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে তারা শুধু হাই, হ্যালো করছেন, এ পর্যন্তই।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ও ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাহাঙ্গীরের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন কিছু নেতারা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা আছেন, যারা দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বিশেষ সম্পর্ক পছন্দ করেন না। সেই নেতারাও জাহাঙ্গীর যেন কোনো ছাড় না পান, সে ব্যাপারে অবস্থান নিয়েছেন। সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীর দলের ভেতরে আগের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।

আওয়ামী লীগের সবাই আমার সঙ্গে আছে, আজমত উল্লা’র দাবি

দলীয় প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সেখানে দলের বিভক্তিও ভোটের মাঠের পরিস্থিতিকে জটিল করছে। তবে ভোটের মাঠে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মাকে স্বাগত জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান। শনিবার (০৬ মে) আজমত উল্লাহর টঙ্গীর বাসভবনে সাংবাদিকদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। আজমত বলেন, আমি যে কোনো প্রার্থীকে স্বাগত জানাই। মিডিয়া ছাড়া জনগণের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, আমরা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবার। যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগ, তারা সবাই আমার সঙ্গে আছে। সবাই আমার পক্ষে আছে। এখানে জাহাঙ্গীর নিয়ে কোনো চাপ ফিল (অনুভব) করার কারণ নেই।

আজমত উল্লা খান


তিনি বলেন, যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের সবাইকে আমি প্রতিদ্ব›দ্বী মনে করি। আমি কাউকে ছোট করে দেখি না, বড় করেও দেখি না। মানুষ উন্নয়নের জন্য ভোট দেবে। মানুষ দুর্নীতি মুক্ত একটি সিটি করপোরেশন গড়তে ভোট দেবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে আজমত বলেন, নির্বাচন আচরণবিধি ২০১৬ এর দুটি ধারা উল্লেখ করে আমাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমার দ্বারা কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়নি। সর্বশেষ যে চিঠিটি দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমি পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমি আমার নির্বাচনী এলাকার বাইরে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবো কি না। উনারা আমাকে বলেছেন, নির্বাচনী এলাকার বাইরে এটা করা যাবে। আমি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আমার অবস্থান তুলে ধরবো। নির্বাচন কমিশনে হয়তো একটি ভুল তথ্য গেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৭ মে ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা


ভোটযুদ্ধে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খানের জন্য বড় একটা বাধা ছিলেন জাহাঙ্গীর। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও মা জায়েদা খাতুনকে নিয়ে জাহাঙ্গীর নির্বাচনের মাঠে থাকবেন এমন ঘোষণায় মোটেও ভীত নয় আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে জাহাঙ্গীরপন্থিদের অনেকেই নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছেন বলে জানান দলীয় নেতাকর্মীরা। বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ কিছুটা নির্ভার হলেও আজমত উল্লা খানের পথ এখনও নিষ্কণ্টক নয়।
জাহাঙ্গীরের মা জায়েদা খাতুন কিংবা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মামুন মন্ডল নৌকার জয়ে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে আজমত উল্লা খান কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকেই দুর্বল মনে করতে নারাজ।

ইউডি/এজেএস

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading