ব্রিটেনে একের পর এক চিকিৎসক কেন আত্মহত্যা করছেন
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৪ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:০০
হ্যারো নামে লন্ডনের এক শহরতলীতে বেড়ে উঠেছিলেন জাগদিপ সিধু। তাঁর বাবা ছিলেন ইন্ডিয়ান সরকারি চাকরিজীবী। ছোটবেলা থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে মেডিকেলে পড়াশোনা করেছিলেন জাগদিপ। পরে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন পশ্চিম লন্ডনের ইয়ালিং হাসপাতালে। প্রায় ২৫ বছর চিকিৎসা পেশায় থেকে বেশ নামডাক হয়েছিল তাঁর।
সর্বশেষ ক্যান্টে অবস্থিত একটি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসকেরা প্রায়ই কমিশনের লোভে রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। তবে এ ক্ষেত্রে জাগদিপ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি সব রোগীকেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। এমন ভালো একজন চিকিৎসক হয়েও মাত্র ৪৭ বছর বয়সে জাগদিপ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাই আমানদিপ।
আলজাজিরায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, শুধু জাগদিপই নন। ব্রিটেনে চিকিৎসকদের মধ্যে এমন আত্মহত্যার ঘটনা আজকাল আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারী এবং অল্প বয়সী চিকিৎসকেরাই এই পথ বেছে নিচ্ছেন। অবস্থা এমন যে, চিকিৎসাক্ষেত্রের মানুষদের আত্মহত্যা করার বিষয়টি যেন একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গড়পড়তায় সাধারণ মানুষের তুলনায় ব্রিটেনের নারী চিকিৎসকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার চার গুণ বেশি।
ব্রিটেনের সাম্প্রতিক জাতীয় পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে ২০২০ সালে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত (চিকিৎসক, নার্স, থেরাপিস্ট, ডেন্টিস্ট ও মিডওয়াইফ) ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। সেই হিসেবে প্রতি সপ্তাহে একজন করে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট মানুষ আত্মহনন করেছে দেশটিতে। নার্সদের মধ্যে এই আত্মহত্যা প্রবণতা আরো বাড়ছে। ২০২২ সালে ব্রিটেনে ৩৬০ জনের বেশি নার্স আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত কাজের চাপ, বুলিং, হেনস্তা, টানা কাজ, ঘুম বঞ্চনা, অবকাঠামোর অভাব এবং অর্থস্বল্পতার মতো নানা কারণে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা আত্মহননের পথে হাঁটছেন।ব্রিটিশ সরকারের অর্থ সংকোচন নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাখাতে। রোগীর চাপ দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যা। ফলে বর্তমান কর্মীদের ওপরই বেশি চাপ পড়ছে
করোনাকালে সেই সঙ্কট ও মানসিক চাপ আরো বেড়েছে। সেই তুলনায় চিকিৎসাখাতে বরাদ্দ বাড়ায়নি ব্রিটিশ সরকার। মনোবিজ্ঞানী কেভিন টিও (যিনি ব্রিটিশ চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করেছে) বলেছেন, ‘যেখানে জরুরি সেবা দেয়া হয় এবং হাসপাতালের বিছানা ভর্তি রোগী, সেখানে আমরা চিকিৎসাকর্মীদের বেশি মানসিক অশান্তিতে ভুগতে দেখেছি।’
কেভিনের সহ লেখক গেইল কিনম্যান বলেছে, ‘সেখানে কয়েকজন মাত্র চিকিৎসক রয়েছে। চিকিৎসা উপকরণ ও জনশক্তিও কম। কিন্তু অসীম চাপের মধ্যেও তাদের প্রত্যাশামাফিক কাজটা করে যেতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাঁধে রোগীদের জন্য আত্মত্যাগ ও আপন জীবন উজাড় করার ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়।’ আর এই চাপই চিকিৎসাকর্মীদের খুব কম বয়সে বেশি শক্তি ব্যয়ের পথে ঠেলে দেয়। অথচ যা তাদের জীবনে অনেক পরে ঘটার কথা।
ইউডি/এ

