নতুন নামে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’: তবুও কী শঙ্কা রয়ে গেল

নতুন নামে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’: তবুও কী শঙ্কা রয়ে গেল

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৮ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:০০

বহুল আলোচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ পরিবর্তন ও সংশোধন করা হচ্ছে। আইনটি ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ নামে প্রতিস্থাপিত হবে বলে জানা গেছে। সোমবার (০৭ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন ও সংশোধন করে নতুন আইনে প্রতিস্থাপন করার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন নামে কী কী পরিবর্তন আসছে আর কতটাই বা শঙ্কা থাকছে তা নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন

সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩: নীতিগত অনুমোদন

সাইবার নিরাপত্তার বাস্তবতায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন করে সরকার ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ করছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন। সোমবার (০৭ আগস্ট) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে। এটি আজ (সোমবার) উপস্থাপিত হয়েছে মন্ত্রিসভায়। আলোচনার মাধ্যমে লেজিসলেটিভ (আইনপ্রণয়ন) বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে নীতিগত অনুমোদন করা হয়েছে। লেজিসলেটিভ বিভাগ ভেটিং করে তারপর তারা ফাইনাল করে দেবে। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে অনুমোদনের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়েছে। আমাদের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা হয়েছে। অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সারাবিশ্বে আইসিটি সংক্রান্ত বিষয় ছিল। সেটির কিন্তু অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আইসিটি সংক্রান্ত বিশ্বের যে ব্যাপ্তি কিংবা ধরন, বেশ পরিবর্তন এসেছে। সেসব কিছুকে বিবেচনায় রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইন কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত হয়ে যাবে।

মো. মাহবুব হোসেন আরও বলেন, একটা আইন করা হয়েছে। সেটা প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন সাইবার নিরাপত্তার যে বিষয়টি মানে দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেজন্য সরকার মনে করছে সাইবার নিরাপত্তার জন্য একটা আইন দরকার। সে আইন করতে গিয়ে আগের আইন থেকে কিছু ধারা, কিছু বিষয় এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে।

কতটা বদলাচ্ছে, কী আছে নতুন আইনে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধিকাংশ ধারা নতুন আইনে থাকছে। তবে বিতর্কিত বিভিন্ন ধারায় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যেসব ধারা নিয়ে বেশি বিতর্ক ছিল, কয়েকটি ক্ষেত্রে সেগুলোর সাজা কমিয়ে আনা হয়েছে। ‘জামিন অযোগ্য’ কয়েকটি ধারাকে করা হয়েছে ‘জামিন যোগ্য’। মানহানি মামলায় কারাদণ্ডের বিধান বাদ দিয়ে রাখা হচ্ছে শুধু জরিমানার বিধান। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে কমানো হচ্ছে সাজা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেকগুলো ধারায় দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে দ্বিগুণ সাজার বিধান ছিল, নতুন আইনে দ্বিতীয়বার সাজার বিষয়টি বাতিল করা হয়েছে। সব কাজ সেরে সংসদের আগামী সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে নতুন আইন পাস করা হবে বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ডিজিটাল অগ্রগতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে আইনটির নাম দেওয়া হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা আইন। এ আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তার জন্য যেসব ধারাগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল, সেগুলো এখানে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

আনিসুল হক

আনিসুল হক বলেন, নতুন আইনে গণমাধ্যমের জন্য আলাদা কোনো বিধান রাখা হয়নি। আর নতুন আইন কার্যকর হলে ‘সাংবাদিকদের হয়রানি ও আইনের অপব্যবহার’ বন্ধ হবে বলেই তিনি মনে করেন। সাজার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে জেলের উপরে ফোকাসটা বেশি ছিল। এখানে এসে জেলের সাজার পরিমাণটা কমানো হয়েছে, কিন্তু আর্থিক জরিমানার অংশ রাখা হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেসিক বিষয়গুলো এটাই।
মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের অপরাধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে থাকা কারদণ্ডের বিধান বাতিল করে নতুন আইনে শুধু জরিমানার বিধান করা হচ্ছে। এ ধারায় কী পরিবর্তন আসছে তা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ২৯ ধারা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। শুধু শাস্তি হবে জরিমানা, সেই জরিমানা অনাদায়ে ৩ থেকে ৬ মাসের কারাদণ্ড থাকবে। সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। কারাদø উঠিয়ে দিয়ে শুধু সাজা রাখা হয়েছে। দেওয়ানী আইনে যদি মানুষ ক্ষতিপূরণ চায় সেখানে কিন্তু ক্ষতিপূরণের কোনো লিমিট নেই।

পরিবর্তিত আইনে যে দুটি ধারা বাদ যাচ্ছে

খসড়া আইনে আগের দুটি ধারা বাদ যাচ্ছে। সেগুলো হলো- ৩৩ ও ৫৭ ধারা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই ধারায় যে অপরাধ সেটা অন্য ধারায় ব্যাখ্যা করা আছে, সেজন্য ৩৩ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা আরেকটা ধারা বাদ দিয়েছি, সেটি হলো ৫৭ ধারা। এটা অন্য আইনে দেওয়া আছে, সেজন্য এখানে রাখা হয়নি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) যদি কোনো ব্যক্তি কম্পিউটার বা ডিজিটাল সিস্টেমে বে-আইনি প্রবেশ করিয়া সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক সংস্থার কোনো তথ্য-উপাত্তের কোনোরূপ সংযোজন বা বিয়োজন, স্থানান্তর বা স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদøে বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

‘দমনমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো যেন ফিরিয়ে আনা না হয়’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ব্রিটেনভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ সরকারকে এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে যে সাইবার নিরাপত্তা আইন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে যেন ওই আইনের দমনমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো ফিরিয়ে আনা না হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও বলেছে, নতুন আইনটি পাস হওয়ার আগে সব অংশীদার যেন প্রস্তাবিত এই আইন খুঁটিয়ে দেখা এবং এটা নিয়ে মতামত প্রদানের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়। এর বিধানগুলো যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারচর্চার কারণে যাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় আনা হয়েছে, তাদেরকে অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে মুক্তি প্রদান এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি)

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাতিলে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে সতর্ক সাধুবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি)। তবে ডিএসএ-এর পরিবর্তে নতুন যে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, তা যেন কোনোভাবেই স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে নতুন আইনটি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করার তাগিদ দিয়েছে টিআইবি। সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানিয়েছে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

বিতর্কের অবসান হবে কী?

দেশের সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি ও উদ্বেগের মধ্যে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ব্যাপক সমালোচিত ৫৭সহ কয়েকটি ধারা বাতিল করে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হলেও পুরনো আইনের বাতিল হওয়া ধারাগুলো নতুন আইনে রেখে দেওয়ায় এর অপপ্রয়োগের শঙ্কা ছিল উদ্বেগের কেন্দ্রে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালে কারাগারে মারা যাওয়ার পর ওই আইন বাতিলের দাবিতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল। এরপর আইনের ‘অপব্যবহার’ বন্ধে আইনমন্ত্রীর আশ্বাসের মধ্যেও সংবাদকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার থেমে থাকেনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, যেগুলো ‘ট্যাকটিক্যাল’ অপরাধ, সাইবার সিকিউরিটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে আইনে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদø, অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদø বা উভয় দøের বিধান ছিল। নতুন আইনেও তা থাকছে। আইনমন্ত্রী বলেন, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সবসময়ই জনগণের কথা শোনার সরকার ছিল। এখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু অপব্যবহার কিংবা মিসইউজ রোধ করতে আমরা নাম পরিবর্তন করেছি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকলে একটা মানসিক চাপ থেকে যায়। স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনে একটি মানসিক চাপ থাকে। সেটাকেও আমরা ধর্তব্যের মধ্যে নিয়েছি। যে কারণে আমরা আইন পরিবর্তন করেছি।আইনমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনটা এতটাই করা হয়েছে, যেখানে এটাকে কনফিউশন যাতে ক্রিয়েট না হয়, সেজন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নাম রহিত করে তার পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৮ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

চলমান মামলাগুলো কি বাতিল হবে?

নতুন আইন করার সিদ্ধান্ত নিলেও এই আইনে চলমান মামলাগুলো বাতিল হবে না। মামলাগুলোর বিচার আগের আইনেই চলবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, যখন কোনো আইন বাতিল বা পরিবর্তন করা হয় সেখানে একটা সেভিং ক্লোজ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, যে মামলাগুলো চলমান আছে সেই মামলাগুলোর ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে এই আইনটা বিলুপ্ত হয়নি। এখন পর্যন্ত যত আইন বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছে সবগুলোর ক্ষেত্রে একই অবস্থা হয়েছে। আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading