এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত, চরম গ্যাস সংকট: অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা

এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত, চরম গ্যাস সংকট: অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:৩০

দেশের শিল্প খাত, গৃহস্থালি ও বিদ্যুৎ খাতে তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ, মন্ত্রণালয় দিয়েছে ব্যাখ্যা। এ নিয়ে মো. শহীদ রানা’র প্রতিবেদন

গৃহস্থালি-শিল্পকারখানায় হাহাকার, উদ্বেগ: দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। রান্নার গ্যাস ছাড়াও সিএনজি, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অর্থনীতির জন্য ৫টি ঝুঁকির মধ্যে জ্বালানি স্বল্পতাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে নিজস্ব জ্বালানির উৎপাদন কমেছে আর আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে অতিরিক্ত আমদানি করাও সম্ভব হচ্ছে না। আগামীতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এবং আমদানি করে চাহিদা পূরণ করাই হবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর শীত এলেই দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়। শীতের তীব্রতায় পাইপ লাইনের ভেতরের জায়গা সংকীর্ণ হয়ে গ্যাস সংকট বাড়ে। তবে এবার আমদানি করা গ্যাসের একটি টার্মিনাল সংস্কারে থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। তাই বাসাবাড়ি ও শিল্পখাতে গ্যাসের সংকটও বেড়েছে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে জ¦ালানি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি সংস্কারের জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ কারণে শীতে চলমান গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। এলএনজি টার্মিনালটি সংস্কার শেষে দেশে না আসা পর্যন্ত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো পেট্রোবাংলার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানায়ও উৎপাদন যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি বাসা-বাড়িতেও মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। সিএনজিচালিত যানবাহনও অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। শীত এলেই মাসের পর মাস গ্যাস থাকে না কোন কোন এলাকায়। তবে শিগগিরই ওই সংকট দূর হবে বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।

চলতি অর্থবছরে সংকট কতটা: দেশে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার গৃহস্থলি, সিএনজিসহ সাতটি সেক্টরে মোট চাহিদা দাঁড়াবে ৩,৭১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। পেট্রোবাংলার হিসেবেই বর্তমানে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে বছরে এখন গ্যাসের চাহিদা এক টিসিএফ এর কাছাকাছি সেই হিসেবে এই গ্যাস দিয়ে দশ বছরের মতো চলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্যাসের ঘাটতি আরো বেশি যা দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।দেশে গ্যাস সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের চাহিদাই হবে এবার দেড় হাজার মিলিয়ন ঘটফুটের মতো। তবে উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক চাহিদা হলো ২২৪০ এমএমসিএফডি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে সাতশ-আটশ এমএমসিএফডি গ্যাস। অর্থাৎ গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে সেটির বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৪০ শতাংশের মতো। সরকারি হিসেবে এ বছর গরমে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা হতে পারে ১৭,৫০০ মেগাওয়াটের মতো। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও বিপুল পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিসহ জ্বালানির জন্য ব্যয় করতে হয়েছে ৬১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।

কমবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, হতে পারে লোডশেডিং: কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। শনিবার (২০ জানুয়ারি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সাময়িক এ সমস্যার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তারা বলেছে, সমস্যার দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে। এর আগে রক্ষণাবেক্ষণ শেষে আনা মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল সময়মতো চালু করতে না পারায় গত শুক্রবার দেশের পূর্বাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ ছয় জেলায় গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় ঘটে। জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) আওতাধীন চট্টগ্রাম, বাখরাবাদের কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর এবং তিতাসের নারায়ণগঞ্জ। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা এলএনজির বড় অংশ এসব জেলায় সরবরাহ করা হয়। প্রাথমিক জ্বালানির অভাবে ২০২২ সালে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি, কয়লার ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

শিল্পাঞ্চলগুলোর কী অবস্থা: সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গ্যাস সংকটে গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর, কাশিমপুর ও এর আশপাশের এলাকার বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকরা কারখানায় আসছেন ঠিকই কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে কাজ করতে পারছেন না। এতে কারখানা মালিকরা পড়েছেন মহাবিপদে। প্রতিদিন তাদের লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। গাজীপুর ও ফতুল্লায় কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমেছে। এতে পোশাক কারখানা, ডাইং কারখানা, স্পিনিং, টেক্সটাইল, রি-রোলিং মিলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা না হলে রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া এতে দেশের অর্থনীতিও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। শিল্পমালিকরা বলছেন, একদিকে ডলার ক্রাইসিস অন্যদিকে গ্যাস সংকট চলতে থাকলে এই সেক্টরে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। তারা বলেন, বেশ কিছুদিন হলো গ্যাসের সংকট তেমন ছিল না। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকে সংকট দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বেশিরভাগ এলাকায় দিনের বেলায় কল-কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একটি স্টিল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাস সংকটে তাদের জ্বালানি চাহিদার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে প্রতি টন রড উৎপাদন করতে খরচ বেড়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। সিরামিক শিল্পের অন্যতম প্রধান উপকরণই গ্যাস। ফলে চলমান সংকটে এই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতিও হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ফার সিরামিকস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কমপক্ষে ১০ পিএসআই (চাপের একক) থাকতে হয়। কিন্তু দিনের বেলা বেশিরভাগ সময়ই চাপ থাকে দুই থেকে চার পিএসআই। ফলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

সময় চেয়ে প্রতিমন্ত্রী যা বললেন: চলমান গ্যাস সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এর সমাধানে আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত সময় চেয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এই সময়ের মধ্যে গ্যাসের সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। আশার খবর তুলে ধরে তিনি বলেন, বিবিয়ানাতে আরও এক দশমিক ৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট) গ্যাসের নতুন মজুদ পাওয়া গেছে। সেটি আগামী কিছু দিনের মধ্যে নিশ্চিত হওয়া যাবে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এই আশার খবর জানান। চলমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি সংস্কারের জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ কারণে শীতে চলমান গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। এলএনজি টার্মিনালটি সংস্কার শেষে দেশে না আসা পর্যন্ত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো পেট্রোবাংলার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবছরই শীতে পাইপলাইনে পানি জমার কারণে গ্যাসের সংকট সৃষ্টি হয়। এছাড়া এই সময়ে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়। এবার সেই সংকটের সঙ্গে সরবরাহের অপ্রতুলতা যোগ হওয়ায় গ্যাস সংকট বেড়েছে। এই সংকট কাটতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

সংকট নিরসনে সরকারের পদক্ষেপ: বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, জ্বালানি সংকট সমাধানের জন্য সরকার বহুমূখী জ্বালানি ব্যবহার করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে জোর তৎপরতা আছে। এ বছরই সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। এছাড়া পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষা করে নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের জন্যেও পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আমাদের স্ট্রাকচার যেগুলো আছে সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করতেছি। আমাদের আরো ড্রিলিং করতে হবে। এবং তার জন্য অর্থযোগানও দিতে হবে। অর্থটাও কিন্তু একটা বড় বিষয়। এবার ৪৬টা কূপ খনন করবো দুই বছরে। আরো একশ কূপ খনন করবো পঁচিশ সালের মধ্যে। তাতে আমি আশাবাদী যে দুই বছরের মধ্যে আমরা আরো ৫শ মিলিয়ন যোগ করবো। কিন্তু ডিমান্ডতো আরো বেশি। দেড় হাজার এমএমসিএফ। নসরুল হামিদ জানান যে আগামী দুই বছরে গ্যাস আহরণ বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা অন্তত ১০০টি গ্যাসের কূপ খনন করবো। দুই বছরের মধ্যে আমরা অন্তত আরো ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিয়মিত সরবরাহ করতে পারবো বলে আমি আশাবাদী। তবে যোগান বাড়লেও গ্যাসের বাড়তি চাহিদা থেকেই যাবে বলে মনে করছেন তিনি। নসরুল হামিদ বলেন, আগামী ২০২৭ সাল নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদা আরও ৬ হাজার মেগাওয়াট বাড়বে। এই চাহিদা মোকাবিলায় এখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান ডিসিসিআই’র: প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে দেশের শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। শনিবার (২০ জানুয়ারি) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেন সংগঠনটির সভাপতি আশরাফ আহমেদ।

জ্বালানি স্বল্পতা বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না। এ অবস্থায় বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আশরাফ বলেন, বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি খাতও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে এবং চলতি বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতিধারা ফিরিয়ে আনতে বেসরকারি খাতকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ভবিষ্যৎ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিময় এবং ডিজিটাল কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি খুবই জরুরি। এই মুহুর্তে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উত্তোলন হচ্ছে কমবেশি দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। আর পাঁচশ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এলএনজি আমদানির সক্ষমতা অনুযায়ী দৈনিক সর্বোচ্চ ৮শ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি সম্ভব। এখনকার চাহিদা পূরণে আমদানি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই তবে দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের জন্য সাগরে এবং স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার হিসেবে বাংলাদেশের আবিস্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রমাণিত উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ আছে ৮.৬৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

শীতে গ্যাসের চাপ কমার নেপথ্যে: শীত এলেই কেন গ্যাসের চাপ কমে? বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির ভূতাত্ত্বিক বিভাগের প্রধান মো. আলমগীর হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, শীতে তাপমাত্রা কমে আসায় পাইপলাইনে গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের (গ্যাসের একটি উপজাত) মতো তরল পদার্থ চলে আসে। এতে পাইপলাইনের ভেতরে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে গ্যাসের চাপ কমে আসে। এ কারণে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হয়। তবে সঠিক চাপে গ্যাসের প্রবাহ ধরে রাখতে তাই নিয়মিত পাইপলাইন পরিষ্কারের কাজটি করে এ খাতের বিভিন্ন সংস্থা। শীতে পাইপলাইনে কনডেনসেট জমে গ্যাসের চাপ কমার কারণে সংকট হওয়ার কথা নয়। এটা সব সময়ই ছিল। এবারের শীতে গ্যাসের সংকট আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। এটা হচ্ছে মূলত দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে চাহিদা অনুসারে এলএনজি আমদানি হচ্ছে না। সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে নিয়মিত গ্যাস উৎপাদনের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলনের সময় গ্যাসের চাপ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে (পিএসআই) থাকে চার হাজারের মতো। এ চাপের ওপর নির্ভর করে গ্যাসের প্রবাহ। জাতীয় পাইপলাইনে শুরুতে এক হাজার চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে এটির চাপ আরও কমানো হয়। গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা বুঝে গ্যাসের চাপ বজায় রাখার কাজটি করে গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলো। এতে বড় শিল্পকারখানায় সাধারণত ১৫ থেকে ২০ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এখন অনেকেই এটি এক থেকে দুই পিএসআই পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন। এমন চাপে গ্যাসের প্রবাহ এলে তা দিয়ে কারখানা সচল রাখা যায় না। আবার আবাসিক খাতে সাধারণত পাঁচ পিএসআই রাখা হয়। এখন দিনের বেলা গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না রান্নার চুলা জ্বালাতে।

কিছু বিষয়ে ঘাটতি দেখছেন বিশেষজ্ঞগণ: জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ না থাকা এবং আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণেই এমন সংকট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম মনে করেন, সমস্যার পেছনে প্রধানত বাংলাদেশে স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান তৎপরতায় ঘাটতি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ভালোভাবে করলেও বাংলাদেশের সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলন হয়নি, অনুসন্ধানও হয়নি। গ্যাসের সংকট সহসা কাটবে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি আমরা ওইভাবে দেখছি না। বরং মনে হচ্ছে যে এটা যে কমতির দিকে যাচ্ছে সেটাকে উঠায় নিয়ে আসার পর্যাপ্ত অনুসন্ধান এবং কূপ খননের কাজগুলো যতটা দরকার ততটা হচ্ছে না।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় চলছে তাতে গ্যাস সংকট কাটবে না। এর সঙ্গে যুক্তরা আমদানির ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ, আমদানি করলে তাদের নানা সুবিধা। ব্যবসায়ীদের সুবিধা। আর আমদানির ওপর নির্ভর করা হলে সংকট হবেই। আজকে ইউক্রেন যুদ্ধ। কালকে আরেকটি সমস্যা হবেই। জ্বালানি খাতে সয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারা একটি দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের গ্যাস থাকার পরও তা উত্তোলনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আবার যে কুপগুলো আছে সেগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণও করা হচ্ছে না। তাহলেও উৎপাদন বাড়ত। গ্যাস না থাকলে বিদ্যুতেরও সংকট হয়। গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে থাকে। এই শীতে গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রচুর ক্ষতির মুখে পড়ছে অর্থনীতি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম গণমাধ্যমকে বলেছেন, দিনে দিনে আমাদের উৎপাদন কমে আসছে। উৎপাদন বাড়ানোর একটা চেষ্টা হয়েছিল তাতে কিছু জায়গায় উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু অন্য জায়গায় কমে গিয়ে নেট উৎপাদন কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমদানির ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা স্থবিরতা আছে। এই মুহূর্তে কোনো স্বল্পকালীন সমাধান নাই। এই জ্বালানি সংকট যেটা সেটা ডলারের সংকট না কাটলে স্বল্পকালীন কোনো সমাধান নাই। তিনি বলেন, গত বছর তেল-গ্যাস-কয়লা সব মিলিয়ে ১৩-১৫ বিলিয়ন ডলার লেগেছে। এবছর জ্বালানির দাম একই থাকলে প্রতি মাসে ১.২ বিলিয়ন ডলার লাগবে। অর্থাৎ এক বছরে ১৮ বিলিয়ন লাগতে পারে। এ বিষয়টি প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। অধ্যাপক তামিম বলছেন, বর্তমানে একহাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করতেই সরকার হিমশিম খাচ্ছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. কামরুজ্জামান খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের দুইটি ভাসামান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত এক মাস ধরে মেরামতের জন্য সিঙ্গাপুরে ছিল। সে কারণে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুট কম ছিল। মেরামতের পর সেটি চলে এসেছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই গ্রিডে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। এর ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে ৬০ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে৷ অন্যটির ক্যাপাসিটিও বাড়ানো হবে। আর কিছু কুপ পর্যাক্রমে রক্ষণাবেক্ষণে থাকে। মার্চে গ্যাস সংকট কেটে যাবে।

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading