তিস্তা নদীতে বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ: চীন তৎপর, ইন্ডিয়ার আপত্তির কারণে ঝুলে আছে প্রকল্প
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:৩৫
তিস্তায় বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ইন্ডিয়া ও চীন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। এ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন
তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করায় তিস্তায় বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছেন ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের পর তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হবার বিষয়ে তিনি আশাবাদী। নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করার বিষয়ে তৈরি আছে চীন। প্রকল্পের প্রস্তাব পেলে চীন সহযোগিতা দেবে। কিন্তু তিস্তা নদীর উপর এ প্রকল্প নিয়ে ইন্ডিয়া ও চীন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অনেককেই ধারণা করেন, ইন্ডিয়ার আপত্তির কারণেই চীনের সঙ্গে এ প্রকল্প নিয়ে এগোতে পারছে না বাংলাদেশ। মোদ্দা কথা হচ্ছে- তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প ভ‚-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কারণে এতো আগ্রহী চীন: পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, তিস্তা নিয়ে চীনের আগ্রহ মূলত কৌশলগত। প্রকল্পটিকে চীন ভ‚-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে। হিমালয়ে উৎপত্তির পর তিস্তা নদী ভারতের সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুই দেশের অর্থনীতির জন্যই এ নদী বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহী হয়ে ওঠার বড় কারণ হচ্ছে তাদের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রজেক্ট।
বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশকে একই সুতোয় গাঁথতে চাইছে। চীনের বিআরআই প্রকল্পের আওতাধীন বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর।প্রস্তাবিত এই করিডোরের মাধ্যমে চীন তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। এজন্য তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পকে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
২০২২ সালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত যখন তিস্তা নদীতে সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন, তখন বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক হয়েছিল ইন্ডিয়া। ব্যাপরটিকে তারা ভালো নজরে দেখেনি। এনিয়ে তখন ইন্ডিয়ার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের রিপোর্ট ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল। তখন ইন্ডিয়ার দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা লিখেছিল, শেখ হাসিনা যদিও বলেছেন যে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী, তারপরও পানি সমস্যার সমাধান করার জন্য তিনি বিকল্প উপায়ও চিন্তা করছেন।ইন্ডিয়ার গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক অনুসূয়া বসু রায়চৌধুরী বলেন, চীন প্রথম যেভাবে ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ করতে চেয়েছিল সেখানে থেকে পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে।
বিগত বছরগুলোতে ভারত ও চীনের সস্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। অন্য কোনভাবে এই করিডোরগুলো বা এই ধরনের কানেক্টিভিটি প্ল্যানগুলো চরিতার্থ করা যায় কি না সেটা অবশ্যই চীনের উদ্দেশ্য তো থাকবেই।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ
পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ায় বিকল্পের খোঁজে ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ভারতের সিকিম হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত তিস্তার অববাহিকা ঘুরে দেখেছেন। তিনি মনে করেন, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহ এখানে গৌণ এবং তাদের কোন ভ‚-রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত নেই। কারণ তিস্তা নদীতে এটি বাংলাদেশের প্রকল্প, এটি চীনের কোন প্রকল্প নয়। চীন শুধু এখানে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে। কারণ অন্যরা সে অর্থ দিতে পারছে না। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ইন্ডিয়া যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারছে না, সেজন্য এর বিকল্প একটি সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ। এজন্য তিস্তা প্রকল্প সামনে এনেছিল বাংলাদেশ, এ প্রকল্প চীনের ভাবনা থেকে আসেনি। এটা বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের চিন্তা থেকে এসেছিল। বাংলাদেশের অংশ তিস্তা নদীর অববাহিকায় উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের কৃষি ও মৎস্যসহ নানা ধরনের কর্মকাÐ জড়িত। তিস্তা প্রকল্পের সঙ্গে চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সম্পর্কের বিষয়টি পরিষ্কার নয় অধ্যাপক আহমেদের কাছে। তিনি বলেন, কলকাতার সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে সংযোগ কীভাবে হবে? তিনি মনে করেন, যারা প্রবলভাবে ইন্ডিয়া কিংবা চীন বিরোধী তারা এসব কথা বলছে। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এরকম একটা প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখা ভালো। সেক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের উপর চাপ বজায় রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, তিস্তা ইস্যু সমাধান হয়ে গেলে বাংলাদেশের উপর ভারতের যে প্রভাব, সেটা আর থাকবে না। অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তখন আর ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীর দুই পাশে শহর গড়ে উঠবে, নদী শাসন হবে এবং নদীর নাব্য থাকবে। ফলে পুরো এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং দুই কোটি মানুষের জীবনও বদলে যাবে। ফলে সেখানে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরির পাশাপাশি ইন্ডিয়াবিরোধী মনোভাব আরো প্রবল হবে।
ইন্ডিয়ার বাধ সাধার নেপথ্যে: তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহকে বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে ইন্ডিয়া। দেশটি মনে করে, চীন তাদের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে ইন্ডিয়াকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চায়। ইন্ডিয়ার গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অনুসূয়া বসু রায়চৌধুরী বলেন, তিস্তা প্রকল্পের যে ভ‚-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে সেটি অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বলেন, ভ‚-কৌশলগতভাবে গুরুত্ব বহন করে এমন সব প্রকল্প নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীন ‘অতিরিক্ত আগ্রহ’ প্রকাশ করে। চীন চায় তাদের উপস্থিতি জোরালো করতে। তাছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিস্তা নদীর পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা প্রকল্পের আওতায় আছে- নদী খনন করে গভীরতা বাড়ানো, সারা বছর নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করা, নদীর দুই তীরে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ। এ প্রকল্প নিয়ে ইন্ডিয়ার আপত্তির বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। ইন্ডিয়া যদি এই প্রকল্পকে স্বাগত জানায়, তাহলে এখানে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে এবং সেক্ষত্রে তাদের বিনিয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারে।
বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়বে কি?: শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে ইন্ডিয়ার সম্পর্ক বেশ ভালো থাকলেও বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে ভারত মনে করেন। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিও আছে। এর আগে ২০২২ সালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত যখন তিস্তা নদীতে সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন, তখন বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক হয়েছিল ইন্ডিয়া। ব্যাপরটিকে তারা ভালো নজরে দেখেনি।
এনিয়ে তখন ইন্ডিয়ার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের রিপোর্ট ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল।
তখন দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা লিখেছিল, শেখ হাসিনা যদিও বলেছেন যে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী, তারপরও পানি সমস্যার সমাধান করার জন্য তিনি বিকল্প উপায়ও চিন্তা করছেন। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইন্ডিয়ার কৌশলগত উদ্বেগও রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে চীনের জোরালো উপস্থিতি থাকবে।
কারণ এর কাছাকাছি ইন্ডিয়ার উত্তরবঙ্গে ‘চিকেন নেক’ বা কম প্রশস্তের জায়গা রয়েছে। এর মাধ্যমে ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে বাকি দেশের সংযোগ রয়েছে। এতো কাছাকাছি চীনের অবস্থান থাকলে সেটি ইন্ডিয়ার নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
গবেষক অনুসূয়া বসু রায় চৌধুরী বলেন, যে জায়গাটিতে চীন তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইছে, সেটি ইন্ডিয়ার স্পর্শকাতর এলাকার খুব কাছাকাছি। এটা সীমান্তের কাছাকাছি শুধু তাই নয়। শিলিগুড়ি করিডোর ইন্ডিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের সাথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সংযোগ স্থাপন করেছে এই শিলিগুড়ি করিডোর। সেজন্য এই জায়গা খুবই সংবেদনশীল।ইন্ডিয়ার সাবেক ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরন স¤প্রতি এক নিবন্ধে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।‘বাংলাদেশ ইলেকশনস অ্যান্ড ইট্স আফটারমাথ’ শিরোনামে সে নিবন্ধে পঙ্কজ সরন উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রæতা নয়’ নীতি অনুসরণ করেছেন। যদিও চীনের দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে যাওয়া এবং আমেরিকার সাথে শীতল সম্পর্ক তৈরি হবার বিষয়টিতে সে নীতি ফুঁটে ওঠেনি। পঙ্কজ সরন আরো লিখেছেন, শেখ হাসিনার এবারের মেয়াদে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিমের সাথে দুরত্ব কমিয়ে সে সম্পর্ককে উল্টোভাবে চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইন্ডিয়ার আপত্তির মুখে তিস্তা প্রকল্প চীনের সাথে এগিয়ে নেয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। এমনটাই মনে করেছেন অনেকে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে গুরুত্ব পাবে তিস্তা: আগামী ৭ ফেব্রæয়ারি প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে নয়া দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। মন্ত্রীর ওই সফরে দেশটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার (১ ফেব্রæয়ারি ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান মুখপাত্র সেহেলী সাবরীন।
মুখপাত্র বলেন, দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হবে। যার মধ্যে থাকবে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স¤প্রসারণ, কানেকটিভিটি, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়। এসব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা হবে।সেহেলী সাবরীন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় থাকবে। এর মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে বলে আমরা আশা করা হচ্ছে। তিস্তায় চীনের প্রকল্প প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, তিস্তা নিয়ে চীনের প্রকল্পের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে কি না তা এখন বলা যাচ্ছে না। কারণ, এজেন্ডাগুলো নিয়ে এখনো কাজ হচ্ছে। যদি ভারত এ বিষয়ে আমাদের কাছে কিছু জানতে চায় তখন আমরা বিষয়টি ভেবে দেখব। বাংলাদেশ কি বিনা ফিতে ভারতকে বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভারত যাতে চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর ব্যবহার করতে পারে সেজন্য ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল একটি স্থায়ী আদেশ জারি করে, যার ফলে ইন্ডিয়া এখন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর ব্যবহার করতে পারবে। এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব শর্ত প্রযোজ্য হয়, সেসব বিষয় বিবেচনা করেই এই চুক্তি করা হয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
মমতার আপত্তিই তিস্তা চুক্তির বাধা: বরাবর ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বহুবার চেষ্টা করেছেন এ চুক্তি করার জন্য। কিন্তু সব সময়ই বাধা দিয়েছেন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, তিস্তার পানি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এ পানি শুধুই পশ্চিমবঙ্গের। এটা কাউকে ছিনিয়ে নিতে দেব না। ২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল তিনি এ কথা বলেছিলেন। বাংলাদেশকে তিস্তা নদীর পানি দেয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে পানির সমস্যা মেটাতে তিস্তা নয়, বিকল্প প্রস্তাব দেন মমতা। সেসময় তোর্সা, জলঢাকাসহ ৪টি নদীর পানি বণ্টনের প্রস্তাব দেন তিনি। মমতা বলেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের আমলেই তিস্তা চুক্তির বিষয়টি সমাধান হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আমার মনে যেই অনুভ‚তি, আমি মনে করি একই উষ্ণ অনুভ‚তি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে। তিস্তাচুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ, পানি ব্যবস্থা সমস্যা সমাধানে দ্রæত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হবে। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠক দু’দেশের সম্পর্ককে আরো নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অত্যাধুনিক নগর করার পরিকল্পনা: প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। ২০১৪ সাল থেকে ইন্ডিয়া একতরফা তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজাহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তা পাড় হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী।
চীনের হোয়াংহো নদীকে একসময় বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতিবছর ওই নদীর পানি ভাসিয়ে দিতো শত শত মাইল জনপদ। ভেঙে নিয়ে যেত বহু গ্রাম-পথ-ঘাট জনপদ। সেই সর্বনাশা নদীশাসন করায় (পরিকল্পিত ড্রেজিং) চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে। হোয়াংহো এখন হয়ে গেছে চীনের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। হোয়াংহোর মতোই এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ‘পাগলা নদী’ খ্যাত তিস্তা ড্রেজিং করে কোটি মানুষের দুঃখ ঘোচানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়নার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। মহাপরিকল্পনায় পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার চীনের সেই প্রস্তাবনার আলোকেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
৫ জেলার মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে: চীনের প্রস্তাবিত এই ‘তিস্তা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্যের চাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভারত থেকে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত পানি আর প্রয়োজন পড়বে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বাড়বে। বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে ভাসাবে না গ্রামগঞ্জের জনপদ। সারা বছর নৌ চলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। এতে আছে- ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দুপাড়ে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষি জমি উদ্ধার ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। নৌবন্দর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই পাড়ে থানা, কোস্টগার্ড ও সেনাবাহিনীর জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে প্রকল্পে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা সম্পর্কে চীনের তৈরি প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দু’পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর, নদী খনন ও শাসন, ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থা, মাছ চাষ প্রকল্প, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। চায়না পাওয়ার কোম্পানি ইতোমধ্যে তিস্তাপাড়ে নির্মিতব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। তিস্তা নদীরপাড়ের জেলাগুলো নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধায় চায়নার তিনটি প্রতিনিধি দল কাজ করছেন।
জানা গেছে, পানি সংকটে শুষ্ক মৌসুমে কৃষির প্রয়োজনীয় সেচে বিপাকে পড়েন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার কৃষক। পানির অভাবে ফসলের ক্ষেত ফেটে হয় চৌচির। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পাহাড়ি ঢলের তোপের মুখে ভারত তার ব্যারাজগুলোর মুখ খুলে দেওয়ায় সেখান থেকে নেমে আসা পানিতে প্রতিবছরই বন্যায় প্লাবিত হয় এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। খরা মৌসুমে পানি না পাওয়া এবং বর্ষা মৌসুমে অতি প্রবাহের কারণে তিস্তা নদী গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। এ পরিস্থিতিতে তিস্তাকে ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনাসহ নদীকে ঘিরে নানা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিশ্রæতি দিয়েছে চীন। চীনের এ আগ্রহে হঠাৎ নতুন করে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তিস্তা নদী।
ইউডি/সিরাজ/এজেএস

