বহু নাটকের পর প্রধানমন্ত্রী পেল পাকিস্তান: কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবেন তো শাহবাজ শরিফ!

বহু নাটকের পর প্রধানমন্ত্রী পেল পাকিস্তান: কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবেন তো শাহবাজ শরিফ!

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৪ মার্চ, ২০২৪, আপডেট ১০:০০

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন পিএমএল-এন প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ। টানা দ্বিতীয়বার মত তিনি পাকিস্তানের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন। তার সামনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন

ভোটাভুটিতে বিপুল ব্যবধানে জয়: ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে জাতীয় পরিষদে পিটিআই সমর্থিত এমপিদের স্লোগান এবং পূর্ব নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক বিলম্বে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ভোটাভুটিতে ২০১ ভোট পেয়ে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন পিএমএল-এন প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ। দেশটির ২৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন তিনি। টানা দ্বিতীয়বার মত তিনি পাকিস্তানের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয়। ভোটে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নওয়াজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পিপিপিসহ আট দল মিলে সরকার গঠনের লক্ষ্যে জোটভুক্ত হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পেয়েছেন ২০১ ভোট। তার মূল প্রতিদ্ব›দ্বী পিটিআইয়ের পক্ষে ওমর আইয়ুব খান পেয়েছেন ৯২ ভোট। জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এমন ঘোষণা দিয়েছেন। খবর দ্য ডন। এর আগে রবিবার (০৩ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে দেশটির ১৬তম সাধারণ নির্বাচনের প্রায় দু’মাস পর জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনের কেন্দ্রে ছিল ২৪তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে সরাসরি ভোটগ্রহণ পর্ব। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সদ্য নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক।

ওমর আইয়ুব খান

সাত দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী হলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত সুন্নি ইত্তেহাদ কাউন্সিলের (এসআইসি) প্রার্থী ওমর আইয়ুব খান। দেশটিতে সবশেষ নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেনি পিটিআই। ফলে নির্বাচনে জয়ী পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সুন্নি ইত্তেহাদ কাউন্সিলে যোগ দিয়ে ওই দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য প্রার্থী দিয়েছেন। আর সেই প্রার্থী হচ্ছেন পিটিআই নেতা ওমর আইয়ুব। এর আগে, গত ২ মার্চ শাহবাজ ও আইয়ুবের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন দুই দলের প্রতিনিধিরা। পরে তাদের মনোনয়নপত্র অনুমোদন দেয় দেশটির নির্বাচন কমিশন (ইসিপি)। এবারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পেছনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), মুতাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি), ইস্তেহকাম-ই-পাকিস্তান পার্টিসহ ৭টি দলের সমর্থন পেয়েছেন। দেশটির সংবিধানে বলা রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হতে হলে কোনো প্রার্থীকে জাতীয় পরিষদের ৩৩৬ সদস্যের মধ্যে ১৬৯ জনের ভোট পেতে হবে। যদি প্রধানমন্ত্রী পদে দুইয়ের অধিক প্রার্থী থাকেন এবং কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৬৯ ভোট) পেতে ব্যর্থ হন; তবে আবারও ভোট নেয়া হবে।

সামনের কাজ ‘কঠিন’কিন্তু ‘অসম্ভব’ নয়- শাহবাজ শরিফ: বিজয়ী ভাষণে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, সামনের কাজ ‘কঠিন’ কিন্তু ‘অসম্ভব’ নয়। প্রথম বক্তৃতায় শাহবাজ শরিফ সকল সমর্থক ও জোটকে ধন্যবাদ জানান। এই পদে মনোনীত করার জন্য পিএমএল-এন সুপ্রিমো নওয়াজ শরিফকেও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস তুলে ধরে পিপিপি প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘জুডিশিয়াল কিলিং’-এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শাহবাজ শরিফ। পাশাপাশি গণতন্ত্রের জন্য চূড়ান্ত মূল্য দেওয়ায় তার কন্যা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকেও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি। কারও নাম উচ্চারণ না করে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধীদের আক্রমণের নিন্দা করেন শাহবাজ শরিফ। এছাড়াও দেশের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি।

শাহবাজ বলেন, এটি দুই নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য। হাউজ সাক্ষী যে (পিএমএল-এন) কখনও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবেনি। বিরাজমান সঙ্কট থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য তার সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে শাহবাজ বলেন, দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে ও চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সর্বস্তরের মানুষকে এক হতে হবে। উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে টাকা আসবে কোথা থেকে? সশস্ত্র বাহিনীর সরকারি কর্মচারীদের বেতন কোথা থেকে দেওয়া হবে? এই সবই বছরের পর বছর ধরে ঋণের মাধ্যমে বহন করা হচ্ছে। এটি আজ দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও ভাবতে হবে: বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও ভাবতে হবে পাকিস্তান সরকারকে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির ফল কী হতে পারে তা দেখেছেন ইমরান খান। অন্যদিকে দেশটির দীর্ঘদিনের মিত্র চীন। দুই বিশ্ব পরাশক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করে চলবে, নাকি কোনো একটিকে বেছে নেবে পাকিস্তান; সেটিও ঠিক করতে হবে নির্বাচনের পরই। চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে যাচ্ছে ইন্ডিয়া। আর ভারী ম্যান্ডেট নিয়ে ইন্ডিয়ার হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের ক্ষমতায় ফিরে আসা পাকিস্তানের নতুন সরকারের জন্য চলমান সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়াও পাকিস্তানে ২০১৪ সালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অনেক ইসলামপন্থি দল প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানে বিতাড়িত হয়েছিলেন। তবে গত ১৮ মাস অর্থাৎ প্রায় দেড় বছর ধরে দেশে জঙ্গি হামলা বেড়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) পুনর্গঠিত হয়। দলটি ন্যাটো-নেতৃত্বাধীন বাহিনীগুলোর রেখে যাওয়া উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করছে বলেও জানা গেছে। পাকিস্তানে জঙ্গিরা একের পর এক হামলাও চালিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে থাকায় আরেকটি টেকসই সামরিক অভিযানে অর্থায়ন করার ক্ষমতাও নেই ইসলামাবাদের। আফগানিস্তান ছাড়া ইরানের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে পাকিস্তান। গত মাসে এক দেশ আরেক দেশের ওপর কথিত ‘জঙ্গি ঘাঁটিতে’ টিট-ফর-ট্যাট বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতি বেহাল, কতটা কঠিন সামলানো: অর্থনীতির বেহাল অবস্থা সামাল দেওয়া নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষশকগণ৷ অপ্রিয় সংস্কার, বাড়তি কর ও রাজস্ব আদায় জনরোষের কারণ হতে পারে৷ করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধসহ একাধিক সংকটের কারণে বিশ্বের অনেক প্রান্তে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে৷ ফলে সাধারণ মানুষের দুর্দশাও বেড়েছে৷ কিন্তু পাকিস্তানের মতো করুণ পরিস্থিতি খুব বেশি জায়গায় দেখা যাচ্ছে না৷ দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৩০ শতাংশেরও বেশি৷ সরকারি হিসাবেই প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে৷ রাষ্ট্রীয় ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৭২ শতাংশ ছুঁয়েছে৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কমার পর মার্কিন ডলারের সঙ্গে পাকিস্তানের মুদ্রার বিনিময় মূল্যের অস্বাভাবিক উঠানামার কারণে আমদানির সমস্যা রয়েছে৷ তার উপর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে৷ আপাতত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জরুরি ঋণ সম্বল করে পাকিস্তান কোনোরকমে টিকে রয়েছে৷ সাধারণ নির্বাচনের পর শেষ পর্যন্ত যে সরকারই পাকিস্তানের হাল ধরুক না কেন, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা সামাল দেওয়া তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অপেক্ষা করছে৷ তবে অন্যান্য যে কোনো নীতির মতো অর্থনীতির প্রশ্নেও সামরিক বাহিনীর সম্মতি ছাড়া নতুন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এক পা ফেলা সম্ভব হবে না৷ তার উপর একদিকে মরিয়া জনগণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলির সংস্কারের চাপ সামলে বাজারের আস্থা অর্জন করাও পাকিস্তানের নতুন সরকারের জন্য কঠিন কাজ হবে৷ প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে উত্তেজনা ও স্থিতিশীলতার অভাবের কারণে পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ এমনিতেই কমে চলেছে৷ শুধু চীনের কৌশলগত সহায়তার উপর নির্ভরতা আরও বেড়ে গেছে৷ গত বছরের জুন মাসে আইএমএফ পাকিস্তানকে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ দিলেও সে দেশকে বেশ কিছু অপ্রিয় সংস্কার চালাতে বাধ্য করেছিল৷ ১৯৫৮ সাল থেকে এই নিয়ে ২৩ বার পাকিস্তানকে এমন সহায়তা দিতে হয়েছে৷ সর্বশেষ সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে সরকারকে বিদ্যুতের উপর বাড়তি কর চাপাতে হয়েছে, ভর্তুকি কমাতে হয়েছে৷ বিপুল বিদ্যুৎ ঘাটতির মাঝে এমন পদক্ষেপ ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি করেছে৷ নতুন সরকার আরও ঋণ চাইলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অপ্রিয় সংস্কার চালাতে বাধ্য হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷ বিশেষ করে কর ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবকাঠামো শক্তিশালী করে দেশের মধ্যে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর জন্য চাপ বাড়ছে৷ বলা বাহুল্য, কঠিন পরিস্থিতিতে করের বাড়তি বোঝা পাকিস্তানের অনেক মানুষের জীবন আরও দুর্বিসহ করে তুলতে পারে৷ বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা এমন চাপ প্রতিরোধের চেষ্টা করতে পারেন৷ পাকিস্তানের একাধিক সরকার এতকাল এমন সব অপ্রিয় পদক্ষেপ এড়িয়ে গেছে৷ নতুন সরকারের পক্ষে সেটা আর সম্ভব নাও হতে পারে৷

রাজনৈতিক উত্তেজনা দমনে অগ্নিপরীক্ষা: সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে শাহবাজ শরিফকে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। আগের সরকার পরিচালনার সময় তাকে সত্যিকার অর্থে কোনো ধরনের বিরোধিতার মধ্যে পড়তে হয়নি। বিশ্লেণকদের মতে, এবারের পার্লামেন্ট যেনতেন পার্লামেন্ট হবে না। এবারের পার্লামেন্টে শাহবাজকে সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। এমনকি তার নেতৃত্বাধীন সরকারের বৈধতা প্রশ্নে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পড়তে হতে পারে। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্য দিয়েও যাচ্ছে পাকিস্তান। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে চলছে একের পর এক ক্র্যাকডাউন। গত আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন ইমরান খান। এমনকি নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি পিটিআই। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন দলের প্রার্থীরা। কারণ নির্বাচনের আগেই ইমরান খানের দলের ‘ব্যাট’ প্রতীক বাতিলসহ পিটিআইকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করেছে পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন (ইসিপি)।

জেনালের আসিম মুনির

জেনারেলদের মন রক্ষা করাই কী বড় চ্যালেঞ্জ!: পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য বিস্তার করে আসছে সামরিক বাহিনী। দেশটিতে গত ৭৬ বছরের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেননি। নির্বাচিত সরকার সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বারবার। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে এর ভ‚মিকা আরও ব্যাপক হয়েছে। এমনকি এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের বেলায়ও সামরিক বাহিনীর ভ‚মিকার হেরফের ঘটবে না।

জেনারেলদের মন রক্ষাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলছেন বিশ্লেষকগণ। নিজস্ব নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে দেশের যে কোনো সিদ্ধান্তে শক্তিশালী জেনারেলদের খুশি রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের প্রধান কাজ। রয়টার্স, আলজাজিরা। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নতুন সরকারের জন্য এই বর্ধিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও সংকটের বর্তমানে সংকটের মুখোমুখি পাকিস্তান। কারণ সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও ভ‚মিকা রাখবে সামরিক বাহিনী। স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল নামের একটি নতুন উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনী ভ‚মিকা রাখা শুরু করেছে। এছাড়া পাকিস্তানের আরও অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদ দখল করে আছেন অবসরপ্রাপ্ত অথবা বর্তমানে দায়িত্বরত অনেক জেনারেল। সেনাপ্রধান জেনালের আসিম মুনির নতুন সরকারেরও নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়বেন, সে বিষয়ে তেমন সন্দেহ নেই৷ পরমাণু শক্তিধর দেশটিতে এমন লাগাতার সংকট তাই বিশ্বের কাছে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকতে পারে৷

নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আমেরিকা-ব্রিটেন-ইইউ: নির্বাচনের ফলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পাকিস্তানের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, পাকিস্তানের নির্বাচনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর অযাচিত বিধিনিষেধ ছিল। আমরা নির্বাচনী সহিংসতা, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলাসহ ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার ওপর বিধিনিষেধের নিন্দা জানাই। পাকিস্তানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, অভিন্ন স্বার্থের জন্য আমেরিকা তাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। পাকিস্তানের নির্বাচন নিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন ব্রিটেন এবং ইইউ’র মুখপাত্ররাও।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তার বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তানের নির্বাচনে সুষ্ঠুতা এবং অন্তর্ভুক্তির অভাব নিয়ে আমাদের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। দেশটিতে বিভিন্ন দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং কিছু রাজনৈতিক নেতাকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে ও স্বীকৃত দলীয় প্রতীক ব্যবহার আটকাতে আইনের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন ইন্টারনেট সেবা সীমিত করা, ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব এবং গণনা প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের নতুন সরকারকে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি এবং দেশের সব নাগরিক ও স¤প্রদায়ের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে করবে। এটি অর্জনে এবং আমাদের অভিন্ন স্বার্থরক্ষায় আমরা পাকিস্তানের পরবর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে উন্মুখ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশি বিষয় ও নিরাপত্তা নীতির প্রধান মুখপাত্র পিটার স্ট্যানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, পাকিস্তানের নির্বাচনে পর্যাপ্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব থাকার কারণে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহŸান জানাই, নির্বাচনে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং আমরা দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে উন্মুখ।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৪ মার্চ ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

পাশে থাকবে আইএমএফ: পাকিস্তানের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের দাবিকে উপেক্ষা করে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আইএমএফের মুখপাত্র জুলি কোজ্যাক। খবর জিও নিউজের। সংবাদ সম্মেলনে জুলি কোজ্যাক বলেন, পাকিস্তানের সব নাগরিকের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত। পাকিস্তানে গত নির্বাচনে কারচুপির কারণে অর্থসহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়ে আইএমএফকে ইমরান খান চিঠি লিখবেন বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছিলেন পিটিআই নেতা আলী জাফর। সেদিনই আইএমএফকে ইমরান খানের চিঠি লেখার কথা ছিল।

রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের আলী জাফর বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও অন্যান্য সংস্থার সনদে বলা হয়েছে, সুশাসন থাকলেই তারা একটি দেশে কাজ করতে পারে বা ঋণ দিতে পারে। এসব সংস্থার সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, একটি দেশকে গণতান্ত্রিক হতে হবে। যদি গণতন্ত্র না থাকে, তা হলে এসব প্রতিষ্ঠান সেসব দেশে কাজ করতে পারে না, তাদের কাজ করা উচিতও নয়। আর গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হলো— একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সংবাদ সম্মেলনে জুলি কোজ্যাককে ইমরান খানের এবারের নির্বাচনি ফলের অডিটের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি চলমান রাজনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না’।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading